আমজাদ মিয়া। ছোট খাটো একটা চাকরি করে। গত মাসে বড় মেয়ে নাবিলা কে বিয়ে দিয়েছে প্রায় ৬ লাখ টাকা খরচ করে। আজ ইফতারি দিয়েছে মেয়ের জামাইয়ের বাড়িতে, প্রায় ১৫,০০০/- টাকা খরচ করে।
একটু আগে মেয়ে নাবিলার ফোন।
- হ্যাঁ, মা ভালো। তুই ভালো আছিস তো?
- (একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে) আছি.... বাবা!
- এইভাবে বলছিস কেনো? তোর শ্বশুরগোষ্ঠী খুশি হয়েছে তো?
- ওরা কিছু বলেনি। ফুফু (জামাইয়ের ফুফু) বলেছে ইফতারি একটু কম হয়েছে।
- (তখন আমজাদ মিয়ার চোখের পানি টলটল করছে) আচ্ছা মা বলিস, পরের বার থেকে আরো বাড়িয়ে দিবো।
- বাবা শুনো। তুমি আমার শশুরবাড়িতে ঈদে কাপড় দিবে না?
- তুমি কাপড় দিওনা। খালা (জামাইয়ের খালা) বলেছে, কাপড় দিলে সবার পছন্দ হবে না, কাপড় না দিয়ে টাকা দিয়ে দিতে। ৩০,০০০/- টাকা দিলে নাকি সবার হয়ে যাবে।
- আচ্ছা মা, তুই চিন্তা করিস না। আমি এখনও বেঁচে আছি।
(আমজাদ মিয়ার বুঝতে দেরী হলো না, এতক্ষণে মেয়ের চোখের জল অনেক গড়িয়ে গেছে।)
রাতে ছোট ছেলে টিউশনি থেকে আসলো।
হ্যাঁ, ঈদের পর ২য় সপ্তাহে সেমিস্টার ফাইনাল। বেতন, ফর্ম ফিলাপ ও অন্যান্য খরচ সহ ৩০ হাজার টাকা লাগবে। আমার টিউশনির কিছু টাকা আছে, তুমি ২০ হাজার দিলে হবে।
- আচ্ছা দেখি, খেয়ে ঘুমিয়ে পড়।
- না বাবা, লেট হলে এক্সাম দিতে পারবো না।
- আচ্ছা ঠিক আছে চিন্তা করিস না।
আমজাদ মিয়ার চোখে ঘুম নেই।
নতুন জামাই! বাড়িতে মৌসুমী ফলমূল দিতে হবে। তাতে ১০-১৫ হাজার টাকা দরকার। ঈদের পরে আবার কোরবানি, মেয়ের বাড়িতে গরু দিতে হবে। গরুর যে দাম, কমপক্ষে ৫০,০০০/- টাকা তো লাগবে। আবার নিজের জন্যেও একটা লাগবে।
এখানেই শেষ নয়, আরো আছে।
মেয়ের বাড়িতে দেয়ার জন্য বিভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন আয়োজন।
এসব চিন্তা করতে করতে না খেয়েই শুয়ে পড়েছে আমজাদ মিয়া। নাবিলার মা অনেক কিছু জিজ্ঞেস করেছে, তাকেও কিছু বলল না।
মাথায় শুধু একটা বিষয়ই ঘুরপাক খাচ্ছে।
টাকা! টাকা! টাকা! আর মেয়ের সুখ।
এভাবে রাত ১২ টা। হঠাৎ করেই বুকের ব্যথাটা বেড়ে যায় আমজাদ মিয়ার। ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। হাত-পা গুলো অবস হয়ে যাচ্ছে। অথচ আমজাদ মিয়ার সারা জীবনের অনেক স্বপ্ন অসমাপ্ত রয়ে গেছে। ছেলে মেয়েকে সুখী করতে চায় আমজাদ মিয়া।
সেই চিন্তা গুলো তার পিছু ছাড়ছে না। পরদিন সকাল বেলা। সবাই কান্নাকাটি করছে। তার ছোট মেয়ে আর প্রিয়তমা স্ত্রী সব চেয়ে বেশি কাঁদছে। বড় মেয়ে নাবিলা শশুর বাড়ি থেকে এরই মধ্যে এসে গেছে। চারদিক থেকে আত্মীয় স্বজনেরা ছুটে আসছে। সবার চোখে অঝোর ধারায় কান্নার জল। আশে পাশের বাতাসটা ভারী হয়ে উঠছে। আমজাদ মিয়ার কোনো সাড়া শব্দ নেই।
হ্যাঁ, সে আর কোনোদিন শব্দ করবেনা। সে আর উঠেবেনা। কারন সে ইতিমধ্যেই নাফেরার দেশে চলে গেছে।
এভাবেই এদেশে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক বাবা। আর বাবার স্নেহ- মমতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শত শত সন্তান। হয়তো এখনো অনেকে জানে না, তাদের বাবার মৃত্যুর রহস্য।
এই ভাবে প্রতিনিয়ত প্রতিদিন আমরা হারাচ্ছি আমাদের প্রিয় বাবাদের।
অথচ আমাদের সমাজের এই কু-প্রথা, কু-প্রচলন আর অপসংস্কৃতি গুলো এখনো পরিবর্তন হচ্ছে না।
কিন্তু কেন? কেন হচ্ছে না? কেন কেউ এর প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করছে না?
শহরে কিছুটা পরিবর্তন হলেও গ্রামে ৯০% লোক এই কু-প্রচলন থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি এখনো। শহরেও এদের সংখ্যা কম নয়।
চলুন আমরা জেগে উঠি-আমরা প্রতিরোধ করি এবং ধ্বংস করি এই সব কু-প্রথা, কু-প্রচলন আর অপসংস্কৃতি।
আসুন, আমরা প্রতিবাদ করি এসব প্রথাগত অন্যায় আর অবিচারের বিরুদ্ধে।
সোচ্চার হই এসব গতানুগতিক কৃষ্টি-কালচার এবং সামাজিক পাশবিকতার বিরুদ্ধে।
সচেতন হই সামাজিক অপসংস্কৃতি আর অপ-লৌকিকতার বিরুদ্ধে।
No comments