ক্ষুদ্রঋণ উদ্যোগ বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচন ও নারী ক্ষমতায়নে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছে, যার অন্যতম পথিকৃৎ ড. মুহাম্মদ ইউনুস। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের প্রভাব ও এর বিভিন্ন দিক নিয়ে বিতর্ক উঠে এসেছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে। এই প্রেক্ষাপটে, ড. ইউনুসের অবদান, সরকারের নীতিমালা ও অর্থনৈতিক কাঠামোর উপর ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার প্রভাব নিয়ে একটি বিশ্লেষণ জরুরি। বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থার আলোকে এই লেখায় উঠে আসবে ক্ষুদ্রঋণ উদ্যোগের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো এবং তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা।
১। ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের প্রাথমিক সূচনা
১৯৭৬ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনুস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক থাকাকালীন গরীব মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ক্ষুদ্রঋণের ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেন। তিনি প্রথমে চট্টগ্রামের জোড়া গ্রামের একটি ছোট দলের মধ্যে এই ঋণ কার্যক্রম চালু করেন, যা থেকে তিনি বুঝতে পারেন যে, দরিদ্র মানুষও ঋণ পরিশোধে প্রতিশ্রুতিশীল হতে পারে। এই প্রাথমিক উদ্যোগটি পরবর্তীতে ক্ষুদ্রঋণ আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে তোলে।
২। গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা এবং সাফল্য
**প্রতিষ্ঠা: ১৯৮৩ সালে ড. ইউনুস সরকারী সহযোগিতায় গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। এটি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে সহজ শর্তে ঋণ পৌঁছে দেয়, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের মাঝে।
**সাফল্য: গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে ৯০% এরও বেশি ঋণগ্রহীতা নারী, এবং এই উদ্যোগটি বাংলাদেশের দারিদ্র্য নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ২০০৬ সালের বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা যায়, গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রম বাংলাদেশের দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেছে (World Bank, 2006)।
৩। বিশ্বব্যাপী প্রভাব ও আন্তর্জাতিক সম্মান
**নোবেল পুরস্কার: ২০০৬ সালে, ড. ইউনুস এবং গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এটি ছিল প্রথমবারের মতো ক্ষুদ্রঋণকে বিশ্বমঞ্চে উচ্চ মর্যাদায় তুলে ধরার একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
**আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা: ড. ইউনুসের মাইক্রোফাইন্যান্স মডেল ভারত, কেনিয়া, ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে অনুসরণ করা হয়, যা সেসব দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে (Yunus Centre, 2010)।
৪। ড. ইউনুসের বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের রোষানল :
**বিরোধ ও ষড়যন্ত্র: ২০১০ সালের দিকে বাংলাদেশ সরকার ও ড. ইউনুসের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সরকার গ্রামীণ ব্যাংক থেকে তাঁকে অপসারণের জন্য চাপ প্রয়োগ করে, এবং ২০১১ সালে হাসিনা সরকার তাঁকে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা থেকে সরিয়ে দেয়।
**রাজনৈতিক উদ্দেশ্য: বিশ্লেষকরা মনে করেন, ড. ইউনুসের আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও ব্যক্তিত্ব ক্ষমতাসীনদের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ফলে এ চাপ বৃদ্ধি পায় (Human Rights Watch, 2011)।
৫। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান
**বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন: ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বৈষম্যের বিরুদ্ধে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন এবং গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়। এ আন্দোলনে ড. ইউনুসের মত নেতাদের সমর্থন রয়েছে বলে মনে করা হয়।
**গণঅভ্যুত্থানের ঘটনা: ২০২৪ সালের ২৪ জুলাইয়ের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান সরাসরি ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে। ছাত্রদের নেতৃত্বে পরিচালিত এ আন্দোলন জনগণকে আরো সাহস যোগায় এবং সরকারের পতনের দিকে নিয়ে যায়।
৬। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন :
**ফলাফল: জনগণের বিরোধিতা, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক চাপে অবশেষে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে সরকারের পতন ঘটে, যা বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রয়াস হিসেবে বিবেচিত হয়।
**পরবর্তী সময়: এ ঘটনাকে অনেকেই দেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা হিসেবে উল্লেখ করে, যেখানে ড. ইউনুসের মতন সমাজসেবক ও অর্থনীতিবিদরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
৭। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ইউনুসের দায়িত্ব গ্রহণ :
**সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে ভূমিকা: সরকার পরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তিনি দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর নেতৃত্বে দেশের রেমিটেন্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পাশাপাশি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তিনি নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।
**অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতা: ড. ইউনুসের দূরদর্শী নেতৃত্বে ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক ব্যবসার বিস্তার ঘটেছে, যা দেশের অর্থনীতিকে নতুন মাত্রায় উন্নীত করেছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন খাতে উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনে।
৮। বর্তমান পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের নতুন দায়িত্ব
**রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন কাঠামো: নতুন সরকার একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাঠামো প্রণয়ন করে, যেখানে বৈষম্যবিরোধী নীতি এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
**ড. ইউনুসের পরামর্শ: প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ইউনুসের দিকনির্দেশনায় ক্ষুদ্রঋণ এবং সামাজিক ব্যবসার কার্যক্রম আরো বিস্তৃত হয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সহায়ক।
উপসংহার: ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক ব্যবসার কার্যক্রমের বিস্তার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। তাঁর প্রবর্তিত মডেল দেশের দরিদ্র জনগণের মধ্যে উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করেছে, যা সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করছে। ইউনুসের প্রশাসনিক দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন দেশের নতুন সরকারের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করছে, বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী নীতির বাস্তবায়নে। ভবিষ্যতে, তাঁর নীতিগুলি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং সমাজের সকল স্তরের মানুষের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে সাহায্য করবে (World Bank, 2006; Yunus Centre, 2010)।
No comments