মেহরিমার সাথে কথা শেষ হলো। রাতে মেহরিমা আমায় বাড়ি দিয়ে আসল । কোলবালিসকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে রইলাম। আর রাতভর মেহরিমাকে ভাবতে লাগলাম। মনে হয় যেন তাকে নিয়ে যুগযুগ ভাবলেও শেষ হবেনা।
-
ভেবেছিলাম সবকিছু ভালোভাবেই কাটবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার পরিবার আমার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ালো। পরের দিন দেখলাম সেই ভন্ড কবিরাজ আর তার সাথে লম্বা চুল ওয়ালা একজন। দেখলেই কেমন ভয় ভয় করে। লোকটার নাম “শেরালি গাজী”। অনেক নামকরা জ্বীন সাধক। গতরাতে মা আমার রুমে গিয়েছিল। আর তারপর আমাকে দেখতে পায়নি। অনেক খোঁজাখুঁজি করেছিল নাকি। তাই এমন ব্যবস্থা। আর তারপর আমাকে বলা হয় আজ নাকি উনার সাথে আমাকে যেতে হবে। এ কেমন কথা! আমি কেন উনার সাথে যাব।চিনিনা জানিনা কী সব আবল তাবল কথা।
-
আমি তাদের কথায় রাজি হলাম না। কিন্তু তাতে আর কাজ হলোনা। ওই শেরালি গাজী নামের লোকটা কী এক পানির ছিটা দিল আমার গায়ে। সাথে সাথে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। তারপর আর কিছু মনে নেই। আমার যখন জ্ঞান ফিরে আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম একটা ছোট্ট কুটিরে। আমার হাত বাঁধা। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখা যাচ্ছে সমূদ্রের পানি টলটল করছে। যেন এক দ্বিপের মাঝখানে ছোট্ট একটা কুড়ে ঘর।
-
ঘরটার ভেতরে কঙ্কাল, মাথার খুলি, হাড্ডি, বিভিন্ন পুরোনো ডাল আরো কি সব অদ্ভূত জিনিস। এখানে আর কেউ আছে বলে মনে হচ্ছেনা। মনে হচ্ছে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। শেরালি গাজী ঘরের ভেতর আসল। গলায় কেমন অদ্ভূত সব মালা । আরো কত বৈচিত্রতা তার মাঝে। লম্বা গোফ, আর লম্বা দাড়ি। তার সাথে ওই ভন্ডটা নেই। হয়তো ওই ভন্ডটা তার খোঁজ দিয়েছিল আমার পরিবারকে। শেরালি গাজী আমার কাছে আসল। তারপর তার হাতের লাঠিটা নিয়ে আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত কিভাবে যেন ইশারা করল। আমার হাতের বাঁধন খুলে দিল। তারপর প্রশ্ন করল-
-
- গত রাতে কোথায় ছিলে তুমি? (শেরালি গাজী)
= একটু বাহিরে গিয়েছিলাম হিশু দিতে। (আমি)
- হুমমমমম।
= .......
- আচ্ছা কতক্ষণ ছিলে বাইরে?
= তা তো খেয়াল নেই।
- তোমার কী মনে হয়, যে তোমার শরীরে অন্য কেউ জোর খাটাচ্ছে? তুমি না চাইতেও তোমার দ্বারা কিছু হয়ে যাচ্ছে?
= কই নাতো তেমন কিছু মনে হয়না।
- হুমমমমমমমম।
= দেখুন আপনারা যা ভাবছেন তেমন কিছুই নয়। আমাকে কোন জ্বীন ভূতে ধরেনি। আমি ঠিক আছি। শুধু আমার একটা বদ অভ্যাস হলো রাতে একটু বাইরে হাঁটি।
- ও আচ্ছা।
= জ্বি। আমাকে বাসায় দিয়ে আসুন। এখানে আমি থাকতে পারবনা। আমার ভয় ভয় করছে।
- ভয়ের কিছু নেই বাছা। সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি শুধু সত্যি করে বলো যে- কোন কোন সময় তোমার নিজেকে অস্বাভাবিক লাগে? আর কী ঘটে তোমার সাথে? ভয় নেই । তোমার কোন ক্ষতি হবেনা। আমি সব ঠিক করে দেব।
= আরে আঙ্কেল কেন বুঝতে চাচ্ছেন না। আমার কিছু হয়নি। আমার কোন সমস্যাও হয়নি। আপনারা শুধু শুধুই ভুল ভাবছেন।
- আচ্ছা ঠিকাছে। আমি দেখছি কী করা যায়। তুমি এক কাজ করো। এখানে কিছু হালুয়া আছে। এটা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। আমি রাতে আবার আসব।
= আজব আমি এখানে কেন ঘুমাব? আমাকে বাড়িতে দিয়ে আসুন।
- .............
= আরে শুনেন.....আরে এটা কী ধরনের কথা?... আজব আমার কিছু হয়নি বললামতো...
-
নাহ কোন কাজ হলোনা। বেটা চলেই গেল। জানালাগুলো খোলা । দরজা বন্ধ। আমি জায়গা খুঁজতে লাগলাম কোথা দিয়ে পালানো যায় ।কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় আমি কোন ভাবেই রুম থেকে বের হতে পারছিনা। সাধারণ একটা ঘর । চাইলেই এর দেয়াল ভেঙ্গে বের হওয়া যায় কিন্তু যতই আমি এর জড়াজির্ণ ছনের বেড়া ভাংতে যাই আমায় কেমন চুম্বকের মত ফিরিয়ে দেয়। জানালা দিয়ে বাইরের সব দেখছি কিন্তু জানালা দিয়ে মাথা বের করতে চাইলে বা হাত বের করতে চাইলে চুম্বকের মত আমাকে ফিরিয়ে দেয়।
-
আমার আর বুঝতে বাকি নেই যে এ এক বিশাল কোন তন্ত্র মন্ত্র সাধক। এর আসলেই অনেক ক্ষমতা। আর তার আচরণ ও কেমন গুরুগম্ভির্যপূর্ণ। হাবভাব খুব গম্ভীর। এ কোন মছিবতে পড়লাম। এখন কোথায় আছি আমি তাও জানিনা। কবে নাগাদ আমায় বাড়ি দিয়ে আসবে তাও জানিনা। আর এখানে থেকে আমি যত চিল্লাচিল্লিই করিনা কেন আমার মনে হয়না কোন লাভ হবে। কারণ এটা নির্ঘাৎ কোন সাগরের মধ্যখানে কোন দ্বীপ। তার হালুয়ার কাথায় আগুন। মেজাজ গরম করে বসে পড়লাম। আমার রিতিমত কান্না পাচ্ছে। এ কেমন কথা! আমার কী স্বাধীনতা বলতে কিছু নেই ? আমার জন্য কারো মায়া নেই? কিছু না বুঝেই এমন একটা লোকের সাথে এমন একটা জায়গায় আমায় পাঠিয়ে দিল? এখানে আমায় মেরে ফেললেও তো কেউ টের পাবেনা।
-
রাতে শেরালি গাজী আবার আসল। তার হাতে কিছু উপঢৌকন দেখা যাচ্ছে যার বর্ণনা আমি দিতে পারবনা। তবে জাদু মন্ত্রের কিছু হবে। আমার কেমন যেন ভয় ভয় করছে। যদি আবার সেদিনের মত কিছু হয়? শেরালি গাজী আমার সামনে বসল। তারপর কিছু তন্ত্র মন্ত্র পড়ে আমার গায়ে ফুঁ দিল। আমি কেমন যেন দূর্বল হয়ে গেলাম। চাইলেও নড়াচড়া করতে পারছিনা। শেরালি গাজি ধূয়া আর আগুন জ্বালিয়ে বিরবির করে কী যেন পড়লেন। তারপর কার সাথে যেন কথা বলছে মনে হলো। কিন্তু অন্য কারো শব্দ আমি পাচ্ছিনা কিংবা তার কথাও ঠিকভাবে বুঝতে পারছিনা।
-
খানিক বাদে শেরালি গাজী তার সাধনা বন্ধ করলেন। তারপর আমায় প্রশ্ন করলেন-
-
- তোমার সাথে যে মেয়ে জ্বীনটার পরিচয় হয়েছে সে বেপারে কী কিছু জানো?
= মানে কী? কি বলছেন এসব?
- দেখো মিথ্যে কথা বলোনা। আমি কিন্তু সব জেনে গেছি। ওই জ্বীনটা কিন্তু অনেক শক্তিশালী আর ভালো বংশের জ্বীন। তার সাথে যদি এভাবে তোমার সম্পর্ক থাকে তবে তোমার অনেক ক্ষতি হবে। ওদের রাজ্যে এটা জানাজানি হলে তোমার ক্ষতি করবে ওরা।
= নাহ কেউ আমার ক্ষতি করবেনা। আর সে অনেক ভালো।
- হুমমম সে ভালো । কিন্তু তার রাজ্যে যদি জানতে পারে তোমার কথা তবে তোমার অনেক ক্ষতি করতে পারে। তাই উচিৎ হবে তার সাথে যেন আর তোমার যোগাযোগ না হয়। আমি তোমাকে চারটা গিট দিয়ে দেব শরীরে। দুই হাতে আর দুই পায়ে। এটা থাকলে সে আর তোমার কাছে আসতে পারবেনা।
= নাহ এমন করবেন না দয়া করে। তার কোন দোষ নেই । আমিই তাকে বলেছি আমার কাছে আসতে।
- হুমমম তুমি বুঝোনা তাই বলেছো। কিন্তু মানুষ আর জ্বীন কখনো এভাবে একসাথে চলাফেরা করতে পারেনা। এটা জ্বীন জাতি কখনোই মেনে নিবেনা। তোমার নিজের ভালোর জন্য বেপারটা এখানেই সমাপ্ত করতে হবে।
= নাহ আমি এত কিছু জানিনা। দয়া করে আমার সাথে এসব করবেন না। বিপদ হয় আমার হবে।
-
শেরালি গাজী আমার কথার কোন তোয়াক্কা না করে বেরিয়ে গেলেন। তারপর ঘরের চারপাশে ঘুরে ঘুরে কী যেন করলেন। তারপর আর উনার শব্দ পাইনি। রাত গভীর হয়ে গেল। আমার ভয় করছে। এই পিশাচ লোকটা মেহরিমার কাছ থেকে আমাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু মেহরিমার তো কোন দোষ নেই। আমিই তো চেয়েছিলাম।
-
গভীর রাতে এসব যখন ভাবছি তখন টের পেলাম বিকট শব্দ হলো। মনে হলো ঘরের চালে কোন প্রাণি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে কাঁতরাচ্ছে। ওদিকে শেরালি গাজীর উপস্থিতি টের পেলাম। সে হাতে কী সব লাঠি সোটা আর আগুন নিয়ে মন্ত্র পড়ছে। আর ঘরে ঢুকছে। ঘরে ঢুকে সে তার মন্ত্র আরো দ্রুত আর জোড়ে পাঠ করতে লাগল।
-
ধপ করে আমার সামনে কেউ একজন পরল। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। একটা বোরকা পড়া মেয়ের মতই লাগছে। কোথা থেকে ছিটকে এসে পরল জানিনা। তার মাথা উঠাবার পর আর আমার চিনতে বাকি নেই যে এটা মেহরিমা। সে এখানে কীভাবে? আর তার এই অবস্থাই বা কেন? শেরালি গাজী তার চারপাশে ঘুরে ঘুরে কী যেন ছিটিয়ে দিচ্ছে। তার চারপাশে চারটা আগুনের প্রদিপ জ্বালিয়ে রাখল । মেহরিমা বসা থেকে দাড়াতে পারছেনা। সে ছটফট করছে। চোখ গুলো আগুনের মত হয়ে গেছে তার।
-
এবার শেরালি গাজী মুখ খুলল:
- কী নাম তোর? আর একে কেন বিরক্ত করিস? (শেরালি গাজী)
= আমি তাকে কেন বিরক্ত করব। আমাকে ছাড় । নাহয় খুব খারাপ হবে বলে দিলাম। (মেহরিমা)
- ভালো খারাপ পরে দেখা যাবে। তুই আর তার কাছে আসবিনা। যেখানে ছিলি সেখানেই থাকবি। তুই তোর মত আর ও ওর মত। নাহয় তোকে এমন জায়গায় পুতে রাখব যে সারাজীবনেও আর দুনিয়ার মুখ দেখবিনা।
= আমার যা খুশি আমি তাই করব। আর হ্যা তুই কাজটা ভালো করিসনি। এর ফল ভালো হবেনা দেখে নিস।
- হুমমমমম । শোন আজ তোকে আমি ছেড়ে দিচ্ছি। কিন্তু এর পর যদি ওর সাথে আর কোন দিন দেখি তবে কিন্তু আর ছাড় পাবিনা।
-
কথাগুলো বলেই শেরালি গাজী মেহরিমার গায়ে কিসের যেন পানির মত ছিটিয়ে দিল। মেহরিমা চিৎকার করে উঠল। তার এমন অবস্থা দেখে আমি আর পারছিনা নিজেকে সামলে রাখতে। ইচ্ছে করছে ওই শেরালি গাজীকে মেরে ফেলতে। আমার সামনে থাকা একটা কৌটাতে এক লাথি মারলাম। কিন্তু বেশি দূর নিতে পারলামনা। আমিও এই গন্ডি থেকে বের হতে ছটফট করছি কিন্তু পারছিনা। মেহরিমা আমার দিকে তাকাচ্ছে। তার চোখ গুলো পানিতে টলটল করছে। এদিকে শেরালি গাজী হঠাৎ মেহরিমার দিকে কীসব পড়ে যেন একটা ফুঁ দিল । সাথে সাথে তার পাশের আগুনোর প্রদিপগুলো নিভে গেল আর মেহরিমা উধাও হয়ে গেল।
-
এই বার শেরালি গাজী আমার কাছে আসল। আমার দুই পায়ে আর দুই হাতে চারটা তাবিজ বেঁধে দিল। আর আমায় নিষেধ করল যেন এসব কখনো না খুলি। এবং এও হুমকি দিল যে আমি যদি এই তাবিজগুলো খুলি তবে মেহরিমাকে সে বোতলে আটকে মাটিতে পুতে রাখবে। যেখান থেকে আর কখনো মেহরিমা ফিরতে পারবেনা। এমন অনেক জ্বীনকেই নাকি তিনি বন্দি করেছেন। রাতে কখন ঘুমিয়েছি জানিনা। তবে যতক্ষণ সজাগ ছিলাম ততক্ষণ চেষ্টা করেই গেছি এই বদ্ধশালা থেকে মুক্ত হতে।
-
পরেরদিন সকালে আমি নিজেকে আমার বাড়িতে আবিষ্কার করি। চোখ খুলে দেখি আমি খাটে শুয়ে আছি। আমার সামনে পরিবারের মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে আছি। যদিও তাদেরকে দেখে আমার বড্ড ঘৃণা হচ্ছে এখন। এক মুহুর্তের জন্য তাদের কে আপন ভাবতে পারছিনা। আমার দুই হাত আর দুই পায়ে চারটা তাবিজ বাঁধা। ইচ্ছে করছে সব ছিঁড়ে ফেলে দেই। কিন্তু আবার ভয় হচ্ছে মেহরিমার জন্য। এই মানুষ গুলো তো বড্ড পিশাচসুলভ। যদি সত্যি সত্যি মেহরিমাকে বন্দি করে ফেলে? নাহ আমি সেটা কোনভাবেই মানতে পারবনা।
-
একদিন যায় দুদিন যায় আর মেহরিমাকে বেশি বেশি মনে পড়তে থাকে। সর্বশেষ তার ভেজা চোখ আর অসহায়ের মত করুন দৃষ্টি যেন এখনো আমার চোখে লেগে আছে। আমার এ পর্যন্ত কত কষ্টই পেতে হয়েছে কিন্তু তার চেয়ে বেশি কষ্ট লাগছে মেহরিমার জন্য। এবার তো আমার দোষেই তার এমন পরিণাম হলো। কিন্তু মেহরিমাকে আমি কিছুতেই ভুলতে পারছিনা। দিন দিন তাকে বেশি মনে পড়ছে। খেতে পারিনা, ঘুমাতে পারিনা কিচ্ছু না। আর আমার এটা ভালো মতই বোঝা হয়ে গেছে যে এখানে থাকলে আমার মরন ছাড়া কিছুই হবেনা। এই মানুষগুলো আমার মরন না দেখে শান্তি হবেনা।
-
মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমি বাসা থেকে পালিয়ে যাব। কিন্তু আমি যদি পালিয়ে যাই তাহলে তো আবারো এই শেরালি গাজীকে খবর দেয়া হবে। আর সে যদি মেহরিমাকে আটকে ফেলে? নাহ এটা করা যাবেনা। সবার সাথে ভালো থাকার অভিনয় করতে হবে তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে। মনে মনে বুদ্ধি বের করলাম কীভাবে এই পরিবার থেকে দূরে যাওয়া যায়। মামাতো ভাই সানিকে ফোন দিলাম। সে ঢাকা থাকে। সেখানে ভালো চাকরি করে। বয়সে আমার থেকে একটু বড় কিন্তু আমরা দুজন দুজনকে তুই করেই বলি। তাকে ফোন দিয়ে বললাম আমি শহরে আসতে চাই। কিন্তু এখন কি বলে শহরে যাব? বাসায় জানালাম যে আমি চাকরি করতে চাই। সানি একটা চাকরির কথা বলেছে এমনটাই বাসায় জানালাম। আর তাদের বললাম কোন চিন্তা না করতে। আমি আর কখনো ওই পরীর চিন্তা মাথায় আনবনা। তাবিজও খুলবনা।
-
অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে শহরে আসলাম সানির কাছে। সানিকে আমি সব খুলে বললাম। সে তেমন ভাবে বিশ্বাস না করলেও আমাকে কিছুটা বুঝল। সানিকে বললাম আমি কিছুদিন এখানে থাকতে চাই। আর পারলে ও যেন আমায় কোন কাজের ব্যবস্থা করে দেয়। সানি আমায় শান্তনা দিল। আর বলল আমি যেন কোন চিন্তা না করি। এখানে যতদিন খুশি থাকতে পারব। ওদিকে বাড়ি থেকে বারবার সানিকে ফোন দিয়ে বলা হচ্ছে আমার যেন খেয়াল রাখে। আর এদিক সেদিক দেখলে যেন জানায়। কিন্তু সানির সাথে সম্পর্কটা আমার অনেক গভীর। বন্ধুর মত। সে কখনো আমার মতের বিপরীতে কিছু করবেনা। রাতে সানি যখন শুয়ে আছে আমি বেলকনিতে এসে সব তাবিজ খুলে ফেলি।
-
তাবিজগুলো খুলতে না খুলতেই কয়েক মিনিটের মধ্যে আমি সেই ঘূর্ণিপাকে পড়ে যাই। শাই শাই করে কোথায় যেন চলে এলাম। অপরিচিত একটা জায়গা । চারিদিকে গাছ আর গাছ। আমি মেহরিমাকে খুঁজছি। এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখি আমার পেছনে মেহরিমা দাড়িয়ে আছে। চোখগুলো মলিন। মনে হয় নাওয়া খাওয়া কিছু নেই। আর কিসের চিন্তায় মগ্ন সে। আমি আর চুপ থাকতে পারলাম না। হাঁপিয়ে উঠেছি একেবারে। তাকে বললাম-
-
= এসেছেন আপনি। জানেন কতটা কষ্টে কাটছিল আমার দিনগুলো? আর কত চিন্তায় ছিলাম? (আমি)
- হুমমম আমারো কম হয়নি। (মেহরিমা)
= কীভাবে পেলেন আমাকে ? আমি যে এখানে এসেছি তা জানলেন কীভাবে?
- আপনাকে সেদিনের পর থেকে কোন ভাবেই খুঁজে পাচ্ছিলামনা। যতই আপনাকে খুঁজতে যাই ততই ব্যর্থ হই। আজ এই মাত্র আমার কাছে আপনার উপস্থিতি সংকেত আসে। তাই সাথে সাথে চলে আসলাম।
= আমার গায়ে ওই শেরালি গাজী কিসের যেন তাবিজ লাগিয়ে দিয়েছিল। তাই হয়তো আমায় খুঁজে পাননি। কিন্তু আপনি আমার উপস্থিতি কীভাবে টের পেলেন? আমি কোথায় আছি আপনি কী বুঝতে পারেন?
- হুমমম।
= তাহলে প্রথম যেদিন কাগজ চুরি করেছিলাম সেদিন আমার বাসায় গিয়ে নিয়ে আসলেই পারতেন। কেন দুদিন ধরে রাস্তায় অপেক্ষা করেছিলেন?
- আমি চাইনি আমার রহস্যটা আপনি বুঝে ফেলেন। আর তখনকার বিষয়টা এখন থেকে আলাদা। আপনার উপর আমি এক অদৃশ্য নজর রেখে দিয়েছি যা আপনার প্রতি মুহুর্তের বার্তা আমার কাছে পৌঁছে দেয়। এটা আগে করিনি। তাছাড়া আমি চুরি করিনা কখনো।
= ওহ এখন যে আপনি আমার কাছে এসেছেন এটা যদি শেরালি গাজী জানতে পারে তোহলে তো বিপদ হবে।
- নাহ সে জানবেনা যদিনা তালাস করে। শুনেন আমার হাতে সময় কম। আমার মনে হয় আমার আর আপনার কাছে আসা ঠিক হবেনা। এতে দুজনেরই বিপদ। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি আর আসবনা। আমাকে ক্ষমা করবেন।
= আমি কখনোই চাইনা আমার জন্য আপনি বিপদে পরেন। কিন্তু বিশ্বাস করেন আমি পারবনা আপনাকে ছাড়া থাকতে। এ কয়েকদিনে তা হারে হারে টের পেয়েছি।
- মানে কী?
= মানে জানিনা। আমার প্রতিটা মিনিটা আপনার কথা মনে পড়ে। আমি আপনাকে ভুলে থাকতে পারবনা।
- আপনি কী পাগল হয়ে গেছেন?
= হুমম হয়তো। আচ্ছা সত্যি করে বলুন তো, আমার থেকে দূরে গিয়ে আপনি ভালো থাকবেন? আমাকে একবারো মনে পড়বেনা?
- কিজানি।
= কিজানি নয়। সত্যি করে বলুন।
- না পড়বেনা।
= আচ্ছা ঠিকাছে তাহলে আমাকে মেরেই ফেলুন।
- মানে কি? কিসব আবল তাবল বলছেন?
= আবল তাবল নয়। আমি জানিনা আমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে কী করত। আর এত তাড়াতাড়ি কাউকে এতটা আপন ভাবা যায় কিনা তাও জানিনা। কিন্তু আমার টা আমি জানি। আপনাকে যে কতটা মনে পরে আমার বলে বোঝাতে পারবনা। ইচ্ছে করে প্রতিটা সেকেন্ড আপনার সাথে থাকি।
- আপনি কী বুঝতে পারছেন আপনি কি বলছেন? এটা কী বেশি বারাবারি হয়ে যাচ্ছেনা?
= হুমম হয়তো।
- এসব আপনার আবেগ। অতিরিক্ত কোন কিছু ঠিকনা। আমাদের মধ্যে এমন কিছু হয়ে যায়নি যে আপনি এতটা পাগলামি করবেন। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো আমাদের জাত ভীন্ন। জ্বীন আর মানুষে কখনো সম্পর্ক হবার নয়।
= আবেগ বলেন আর জাত বলেন যাই বলেন। আমি পারবনা আপনাকে ছাড়া থাকতে । আপনি রোজ আমার সাথে দেখা করবেন ।
- আজকের পর আমি আর আসবনা। এসব যদি আমার রাজ্যে জানে তবে তারা আমায় মেরেই ফেলবে। আর আমি চাইনা আপনিও কোন বিপদে পরুন। তার চেয়ে ভালো কাজে মনোযোগ দিন। বাবা মায়ের স্বপ্ন পূরণ করুন। খোদা হাফেজ।
-
আর কিছু না বলেই মেহরিমা আমায় যথাস্থানে দিয়ে চলে গেল। আমার মাথাটা কেমন ভনভন করছে। মেহরিমা কে আজ পাগলের মতই যা তা বলে ফেলেছি। জানিনা এভাবে বলা উচিৎ হয়েছে কিনা। আর এও জানিনা কিভাবে বলা উচিৎ ছিল। কিন্তু আমি যে সত্যিই তাকে ছাড়া থাকতে পারবনা। তার প্রতি আমার আসক্তি তীব্র মাত্রায় বেড়ে গেছে। কী এক অদৃশ্য মায়া এসে গেছে। তার কী একটুও আমার জন্য মায়া জন্মায়নি? সে কী আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে?
-
এখানেও আমার একই দশা হয়ে গেল। খেতে পারিনা ঘুমাতে পারিনা। সারাক্ষণ মেহরিমার কথা মনে পরে । সে আর আমার কাছে আর আসেনা। তাকে ডাকার কোন মাধ্যমও আমার কাছে নেই। ওদিকে সানি আমার জন্য একটা টিউশনির ব্যবস্থা করেছে। ক্লাস এইটের ছাত্রী। যদিও আমি এর আগে এইটের ছাত্র/ছাত্রী কখনো পড়াইনি তবে চেষ্টা করলে পারব। বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছেটা আর নেই। এখানে থেকে সানির টাকা হজম করব তাও তো হয়না। তাই টিউশনিটা আমি নিলাম।
-
টিউশনিতে গেলাম। মেয়েটা এইটে পড়লেও যথেষ্ট পেকে গেছে। এমন ভাবে কথা বার্তা বলে যেন সে কোন বিবাহযোগ্য কন্যা। নাইকাদের মত ঢং করে কথা বলে। কিন্তু মেয়েটা হয়তো আমাকে শিক্ষক হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। আমাকে বিভিন্নভাবে বিদ্রুপ করে। আমি খুব হেংলা, চেহারা ভালো না আরো কত কি!
আজ যখন পড়াতে আসলাম তখন বলেই ফেলল-
(ভৌতিক রহস্যময়ী ভূতের গল্প ফেসবুক আইডি থেকে সংগৃহীত)
৮ম পর্ব পড়তে
👉 👉 [এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রায় সকল পোস্ট-ই ফেসবুক থেকে সংগৃহীত। উক্ত লেখার বক্তব্য ও দায়-দায়িত্ব লেখকের একান্ত নিজস্ব। তাই প্রকাশিত লেখার বিষয়ে কোনো মতামতের জন্য এডমিন দায়ী নয়।]
No comments