মেহরিমা চলে গেল। যাক বাবা। মেয়েটাকে একটু হাসাতে চেয়েছিলাম। একদম ১০০% কাজ করেছে। ইনশাআল্লাহ যদি আল্লাহ ওকে আমার করে দেয়, সারাটা জীবন এভাবে হাসিয়ে যাব। এক মুহুর্তও মন খারাপ করে থাকতে দেবনা।
-
পরীস্থানের বৈঠক খানায় আলোচনা সভা চলছে। জানিনা আমার বাবা সবকিছু কীভাবে নিচ্ছে। হয়তো অনেক ভয় পাচ্ছে। সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত আলোচনা হয় । জানিনা সেখানে কী কথা হয়েছে । কী সমাধান বের করেছে তারা সবাই আলোচনা করে। কিন্তু আমি শুধু একটা কথাই জানি । আর সেটা হলো সমাধান হোক বা না হোক। মেহরিমাকে ছাড়া আমার চলবেইনা। ওইযে কথায় আছেনা? বিচার মানি কিন্তু তালগাছ আমার।
-
কখন ঘুম হলো জানিনা। ভোরে জেগে গেলাম আজানের সুরে। সেখানেও মসজিদ আছে বাহ। ওহ থাকবেনা কেন? ধুর আমিওযে কী ভাবি। অবাক করা বিষয় হলো আমার শরীর একদম সুস্থ লাগছে। জ্বীনদের চিকিৎসা এত কার্যকর জানতামনা তো। কিন্তু আমি এখন এই ভাসমান অট্টালিকা থেকে কিভাবে নিচে নামব? ভাবতে ভাবতে দাদুজি চলে আসল। তারপর আমায় নিয়ে গেল মসজিদে। আহা সে কি মসজিদ। এটা কী দুনিয়া নাকি জান্নাত জানিনা। অজু করে নামাজ আদায় করে নিলাম। জানতে পারলাম যে গতকাল রাতেই আমার বাবা আর ওস্তাদজি কে দিয়ে আসা হয়ে হয়েছে। কিন্তু কী সমাধান হলো তা জানতে পারিনি।
-
আমি মেহরিমার দেখা আর পাইনি। আমাকে সোজা আমাদের গ্রামে দিয়ে আসা হলো। বুঝলামনা এমন কেন করল। বাসায় আসলাম। পুরো বাড়ি থমকে আছে। কারো মধ্যে তেমন কোন শব্দ নেই।সবাই চুপচাপ। বাবা একটা ঘরে অন্ধকার রুমে একা একা শুয়ে আছে। আমি দাদির রুমে গিয়ে বসে পড়লাম। দাদি আমার কাছে এসে গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বলল-
- কিরে দাদা ভাই তর শরীলডা কেরম?
= আমার শরীরের খবর নিচ্ছ কেন? মেরে ফেলতেই তো চাও তোমরা। ওই পিশাচের কাছে না পাঠিয়ে তোমরাই মেরে ফেলতে পারতে? তো কই আজ খবর দাওনাই ওই পিশাচকে?
- দেখ ভাই, আমরা তোর ভালাই ছাই। হোন, আমার যহন মাত্র বিয়া অইছিল- অইসময় আমাগো বাড়ির শাবেকুলরে জ্বীনে ধরছিল। পোলাডায় বিয়ার নাম লইলেই খালি মারত। শেষে না হেয় গাঙে ডুইবা মরল জ্বীনের হাতে।
= হুমম তোমাকে বলছে যে জ্বীনে মারছে? শোনো, মেহরিমা আমাকে ধরেনাই। বরং আমিই মেহরিমাকে ধরছি। আর শোনো আমি বিয়ে করলে তাকেই করব। তোমাদের চাইতে সেই আমায় বেশি ভালবাসে।
- তোর বাফের আর মায়ের তোর চিন্তায় রাইত থেইক্কা কোন খাওন লওন নাই। তুই এইগুলা বাদ দে ভাই। অই মাইরুম না কি কইলি ওই পেত্নী তরে মাইরা ছাড়ব।
= মারলে মারুক। তার হাতের মরন ও ভালো। কিন্তু তোমরা এ পর্যন্ত আমার সাথে যা যা করলে তা কোন শত্রুও করতে পারেনা। থাকবনা আমি এখানে।
- আরে কই যাস ভাই? আমরা তো কাউরে খবর দেইনাই। শেরালি হাসপাতালো। হেয় আর এই কাম করতনা।
-
আর কিছু শোনার সময় নাই। ওদিকে টিউশনির গার্ডিয়ানরা কল দিয়ে যাচ্ছে। সাথে কোন টাকা নেই আমার। গ্রামের পুরনো বন্ধুর কাছ থেকে টাকা নিয়ে ঢাকা চলে আসলাম। কারণ আমার পরিবার এখনো আমার জন্য বিভিষিকা। তাদের আমি আর বিশ্বাস করিনা। আমি চলে আসার পর বাসা থেকে কল দিয়েছিল। তারা বলে দিয়েছে আমি যদি মেহরিমার চিন্তা মাথা থেকে না ফেলি তবে যেন কোনদিন বাড়ি ফিরে না যাই।
-
এদিকে ঢাকা এসে বুঝতে পারলাম সানি এবার বেশ পাল্টে গেছে। সে আমায় দেখলেই এখন ভয় পায়। আমার সাথে ঠিক ভাবে কথা বলতে চায়না। আমি আসার পর সে সারাদিন বাসায় ছিলনা। যদিও আজ ছুটির দিন ছিল তার। সে রাতে এসে আমাকে বলে-
- শাহরিয়ান শোন অনেক ভেবে দেখলাম তোর তো একটা কাজ দরকার। কী বলিস?
= হ্যা তা তো দরকার। এই টিউশনি দিয়ে আর কত। একটা ভালো কাজ পেলে নাহয় ভালোই চলত।
- শোন একটা ভালো কাজ পেয়েছি আমি । কিন্তু সমস্যা হলো সেটা করতে হলে তোর এখানে থাকা যাবেনা। সামনের মহল্লায় থেকে করতে হবে। কারণ সময় মত যেতে হবে। এখানে থাকলে দেরী হয়ে যেতে পারে।
= ও তাহলে এখন কী করা?
- শোন আমি আমার পরিচিত একজনের সাথে আলাপ করেছি। সামনের মহল্লায় তাদের বাসা। যদিও তারা ব্যাচেলর ভাড়া দেয়না। কিন্তু আমি বলেছি তুই কদিন পরই বিয়ে করবি।
= আচ্ছা তারপর?
- শোন, তাদের ছেলের জন্য একটা হোম টিউটর দরকার। তুই আপাতত তাকে একটু সময় দিস। মূলত এই সুবাদেই তাদের রাজি করতে পেরেছি।
= আমার না কাজের ব্যবস্থা করেছিস? তবে টিউশন করব কখন?
- আরে কাজ তো আর ২৪ ঘন্টা না। তোর কাজটা পার্ট টাইম। সকাল থেকে দুপুর । বিকেলে কয়েকটা টিউশনি করবি আর সকাল থেকে দুপুর পার্ট টাইম কাজ করবি। বেস ভালোই ইনকাম হবে।
= ও । আচ্ছা রুমের ভাড়া কত?
- বেশিনা। তাদের ছাদের চিলেকোঠায়। রুমটা ছোট । তবে মজার বেপার হলো সেখানে বাথরুম কিচেন সব পেয়ে যাবি। অনেক সুন্দর। ভাড়া ৪ হাজার টাকা দিতে হবে। তাও অনেক বলে কয়ে। অন্য কেউ হলে ৫ হাজার লাগত।
= ওহ তুই ভাই আমার জন্য অনেক করেছিস। তোর কাছে আমি ঋণী রে।
- আরে কি বলিস। এ আর এমন কী। তুই আমার ভাই না?
-
আমি জানি সানি ভয়ে আমায় দূরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। তবে তার ঋণ শোধ করার নয়। আমার জন্য এতকিছুর ব্যবস্থা করল। আমি তো এতসব কখনোই ব্যবস্থা করতে পারতামনা। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। কিন্তু আমার মেহরিমা? তার কী হলো? কিসের সিদ্ধান্ত হলো কাল? আমি তো কিছু জানতেও পারলামনা। মেহরিমার সাথে আর দেখাও হয়নি।
-
সানি আমায় পরের দিন সেইখানে দিয়ে আসে । চিলেকোঠাটা খুব সুন্দর। কিন্তু সেখান থেকে এই এলাকায় এসে টিউশন গুলো করতে হবে। সানি বলল ওই এলাকায় কয়েকটা টিউশনের ব্যবস্থা করে দেবে। সানি ভাই হিসেবে আমার জন্য সব করছে আর সব করতেই রাজি। কিন্তু ওর একটু ভয় পায় বেশি তাই আমায় সাথে রাখেনি। যদিও এটাকে আমি খারাপ ভাবে দেখিনা।
-
কিন্তু সানি যখন কাজের কথাটা বলে তখন একটু অবাক হই। সানি বলেছিল আমার জন্য নাকি অনেক ভালো একটা কাজের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু এখানে আসার পর সে জানালো আমার জন্য একটা রেস্টুরেন্টে পার্টটাইম চাকরির ব্যবস্থা করেছে। আমি জীবনে তেমন কোন কাজ করিনি। কারো কাছে ছোট হইনি। রেস্টুরেন্টে অপরিচিত মানুষগুলো খাবারের অর্ডার করবে আর আমি পরিবেশন করব ভাবতেই কেমন যেন লাগছে। আর বেতন মাত্র ৬ হাজার টাকা। এটাই কী তার অনেক ভালো কাজ ছিল? তিন চারটা টিউশন করেও ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা আসে। কিন্তু এখন আমি কী করব। এখন যে আমাকে এটাই করতে হবে। কারণ টিউশনির তো কোন নিশ্চয়তা নেই।
-
জানিনা কী হচ্ছে আমার জীবনের। কোন দিকে যাচ্ছি আমি। কিন্তু তবুও শুনেছি যেকোন অবস্থাতেই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হয়। কোন কাজকেই ছোট করে দেখা উচিৎ নয়। আমি নিজের মন কে নিজেই শান্তনা দিলাম। আর পরে দেখলাম রেস্টুরেন্ট ও বেশ নামি দামি। যেমনটা ভেবেছিলাম তেমনটা নয়। ভালোই।
-
একদিন দুইদিন এমন করে প্রায় ১০ দিন চলল। মেহরিমার চিন্তায় আমার মানসিক অবস্থা খারাপ। শুনেছিলাম সেদিন পরীস্থানের আলোচনায় তাদের এলাকার সম্রাট এসেছিল। তবে কী তিনি এ বিষয়ে সম্মতী দেয়নি? আমি জানি মেহরিমা আমায় না পেলে একদম ভালো থাকবেনা। সে যদি আমাকে ছাড়া ভালো থাকত তবে নাহয় আমি সব সয়ে নিতাম।
-
আমার একটা রাতেও ভালো মত ঘুম হয়না। আমি কার কাছে যাব? কার কাছে সাহায্য চাইব? আমার পরিবার আমার ভালো বুঝেনা। তারা আমার ভালো চাইতে গিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। সানি আমার বিষয়টা জেনে এখন আমায় ভয় পায়। আমি কার কাছে বলব এসব কথা? না করবে কেউ বিশ্বাস না করবে কেউ সাহায্য।
-
এভাবে আমার দিনগুলো কাটছিল অত্যন্ত বাজে অবস্থায়। আর একদিন আমাকে অবাক করে দিয়ে কোথা থেকে হঠাৎ মেহরিমার ওস্তাদ আমার কাছে আসে। উনাকে দেখে তো আমি যেন আকাশের চাঁদ পেয়েছি। তারপর উনি আমার সাথে কথা বলে। আর আমাকে জানায় সেদিন আলোচনায় অনেক ঝামেলা হয়েছিল। আমার বাবার ধারণা মেহরিমার সাথে বিয়ে হলে জ্বীনরা আমার ক্ষতি করবে। বা আমার কোন বিপদ হবে। আর ওইদিকে জ্বীনদের সম্রাটও এই বেপারটি মেনে নেয়নি। পরে এ কয়দিনে অনেক ঝামেলার পর সমাধান হয়েছে। মেহরিমাকে আমি বিয়ে করতে পারব। কিন্তু একটা জ্বীন হিসেবে মেহরিমার যত ক্ষমতা ছিল তার সবটা থেকে সে বঞ্চিত হবে। তার রাজ্যে ফেরা তার জন্য চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। তার পরিবার তার সাথে বছরে কয়েকবার নির্দীষ্ট সময় এখানে এসে দেখা করে যেতে পারবে এর বেশি কিছুনা। সে কোনদিন জ্বীনদের থেকে কোন সহায়তাও পাবেনা। এক কথায় সে আমাকে পাওয়া ছাড়া সবকিছু থেকে বঞ্চিত হবে।
-
আমি খুশি হয়েও যেন হতে পারছিনা। কারণ মেহরিমা আমার জন্য সবকিছু থেকে বঞ্চিত হবে। এমন কি তার পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। সব কিছু ছেড়ে মেয়েটা আমার কাছে কী পাবে? তাকে কী আদৌ আমি সুখি করতে পারব? ওস্তাদজি আমাকে এসব জানিয়ে বলেন আজ রাতে আমাদেরকে পরীস্থানে যেতে হবে। তিনি নাকি এখন আমার বাবাকে নিয়ে আসার জন্য যাবেন। ওস্তাদজি জ্বীনদের সহায়তায় এসব করছেন। রাতে সত্যি সত্যি আমাকে পরীস্থানে নেয়া হলো। সেখানে গিয়ে দেখি সবাই আছে। আমার বাবা, মেহরিমার বাবা মা দাদুজি। ওস্তাদজি। সবাই কিসের যেন কথা বলাবলি করছে। আমি দাদুজির কাছে চাইলাম একটু মেহরিমার সাথে দেখা করতে চাই। দাদুজি আমায় মেহরিমার সাথে দেখা করার ব্যবস্থা করে দিলেন।
-
সূর্যমুখী ফুলের বাগানে মেহরিমা দাড়িয়ে আছে। কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটির অবস্থা খুব খারাপ। আমি কী বলব বুঝতে পারছিনা। কিন্তু আজ যে আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নেবার সময়। আজ চুপ থাকলে তো হবেনা। আমি অনেক কষ্টে মেহরিমাকে বললাম-
= মেহরিমা, আমি জানি আপনি আমাকে অনেক ভালবাসেন। হয়তো আমার চেয়ে অনেক অনেক গুন বেশি। কীভাবে কী হয়ে গেল চোখের পলকে। একটা ভুল থেকে প্রেম হয়ে গেল । নিজের অজান্তেই নদীর স্রোতের মত মায়া বেড়ে গেল। হয়ে গেলাম গভীর ভালবাসায় মগ্ন। কিন্তু শুধু মাত্র আপনাকে পাওয়ার স্বার্থে আমি কোন ভাবেই আপনার এত ক্ষতি মেনে নিতে পারিনা। এটা ঠিক যে আমি থাকতে পারবনা। হয়তো জীবনের অর্থটাই মিথ্যে হয়ে যাবে আপনাকে ছাড়া। কিন্তু আমি যে আপনার প্রতি এতটা স্বার্থপর হতে পারছিনা।
-
এক দমে কথা গুলো বলে গেলাম বিরতিহীন ভাবে। মেহরিমা কিছুক্ষণ নিরব থাকল। তারপর সেও বলতে লাগল-
- ভেবেছি আমিও। আমি আমার ব্যক্তিগত কিছু ক্ষমতা হারিয়ে ফেলব তাতে আমার দুঃখ নেই। কোনদিন কারো সাহায্য পাবোনা তাতেও আফসোস নেই। রাজ্যে আসতে পারবনা সেটাও মানতে পারব। কিন্তু বাবা মা, দাদুজি তাদের বিচ্ছেদ কীভাবে সহ্য করব? সারাটাদিন সারাটারাত ভেবেছি আমি। ভেবেছিলাম আপনাকে ভুলে যাব। সয়ে নেব সব। কিন্তু পারিনি। যতটা আমার বাবা মা আর দাদুজির জন্য খারাপ লাগে ততটা আপনার জন্য লাগে। যতটা তাদের কথা ভাবি, ততটা আপনার কথাও ভাবনায় চলে আসে। আমি কোনদিন কাউকে এ মনে স্থান দিতে পারবনা আপনাকে ছাড়া। হয়তো আমাদের ভালবাসাটা খুব অল্প সময়ের। হয়তো খুব সাধারণ । কিন্তু আপনার প্রতি আমার ভালবাসা যে কতটা গভীরে চলে গেছে তা দুনিয়ার কাউকে আমি বোঝাতে পারবনা। এখানে থাকলে হয়তো আমি সব পাবো। কিন্তু সারাটা জীবন আমি মৃতের মতো বেঁচে থাকব।
-
মেহরিমা কথাগুলো বলে চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেনা। আমি তাকে কী উত্তর দিব বুঝতে পারছিনা। কিন্তু কোনভাবেই যে স্বার্থপরের মত তাকে বলতে পারছিনা যে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে আমার কাছে চলে আসতে। হয়তো সে এখন আবেগে এসব বলছে। কদিন পরে ঠিকই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এভাবে সব হারিয়ে আমার কাছে যদি সে সুখী না হয়? কী জবাব দেব তখন ? কী করে সহ্য করব? আমি আর সাত পাঁচ না ভেবে চলে আসলাম সবার কাছে। সবাই চুপ করে আছে আমাকে দেখে। বাবা কিছুটা শান্ত। উনাকে ওস্তাদজি সব ভালো খারাপ বুঝিয়েছেন। হয়তো তিনি এখন আর এতটা ভীত নয়। আমি সবাইকে চোখ বন্ধ করে জানিয়ে দিলাম মেহরিমা কে আমি বিয়ে করতে চাইনা।
-
আমার কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে গেলেন। এতকিছুর পরে আমার এমন সিদ্ধান্তে সবাই অবাক। সবাই কারণ জানতে চাইলে আমি সব খুলে বললাম। মেহরিমার এমন অবস্থা আমি মেনে নিতে পারবনা। তাছাড়া এখানে কেউ খুশি না এ সম্পর্কে। আমার পরিবার চায়না আমি মেহরিমাকে বিয়ে করি। অন্যদিকে মেহরিমার পরিবারও বাধ্য হয়ে রাজি হয়েছেন।
-
আমার কথায় সবাই বেশ চিন্তিত হয়। আর তারপর তারা আমাকে জানায় যে তারা মেহরিমার কষ্টও সহ্য করতে পারবেনা। অনেক ভালবাসে সবাই মেহরিমাকে। আর তারা বছরে কয়েকবার তাকে দেখতে আসতে পারবে এটাই তাদের একমাত্র শান্তনা। আমার বাবার আচরণেও অবাক হই আমি। তিনি বলেন এতদিন না বুঝে না জেনে আমার উপর তারা ভুল করেছে। আমি যদি মেহরিমাকে বিয়ে করতে চাই তবে বাবার কোন আপত্তি নেই। কিন্তু বাবার শুধু একটাই চাওয়া, আমার যেন কোন ক্ষতি না হয়।
-
একটা জীবনে যে কত বৈচিত্রতা থাকতে পারে তা আমার জানা ছিলনা। আমার আর মেহরিমার বেপারটা পুরোটাই এক গোলক ধাঁধার মত । অবশেষে সবার ইচ্ছাতে আর রাজি খুশিতেই সিদ্ধান্ত হয় আমার আর মেহরিমার বিয়ের। তিন দিন পর বিয়ে হবে এই সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত করা হয়।
-
হাজারো কষ্টের মাঝেও এক স্বর্গীয় সুখের হাওয়া। শুনেছি দুঃখ কষ্ট মিলিয়েই মানুষের জীবন। এবার দেখার পালা মেহরিমা আর আমার জীবনের অধ্যায়টি কেমন হয়। তিন দিনে সবকিছু ঠিক করা হয়। আমাদের পরিবারে অনেক বোঝাপড়ার মাধ্যমে এটাই সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে মেহরিমাকে ঢাকায়ই রাখতে হবে। কারণ আমি এখন গ্রামে চলে আসতে পারবনা। ঢাকা থাকলে একটা না একটা ভালো কিছুর ব্যবস্থা হবেই। কিন্তু গ্রামে থাকলে কিছুই হবেনা। বাবার তেমন সামর্থও নেই যে একটা ব্যবসা ধরিয়ে দিবে। তাই মেহরিমাকে বিয়ের পর ঢাকাতেই তোলা হবে। তাছাড়া যে মেহরিমার জন্য এতকিছু তাকে ছাড়াও যে একা থাকতে পারবনা তারা এটা ভালো করেই জানে আর বোঝে। কয়েকদিনের ছুটি নিতে পারতাম। কিন্তু মাত্র নতুন চাকরি তাই পারছিনা।
-
আমার ঢাকার ছোট্ট চিলেকোঠায় প্রয়োজনীয় সবকিছুর ব্যবস্থা করা হয়। সবার অনেক সাহায্য পেলাম। সবাই মিলে মিশে আমার সংসার সাজিয়ে দিল। কিন্তু আমার এ বয়সে সংসার, ভাবতেও অবাক লাগে। যদিও এ বয়সেই বিয়ে করা উচিৎ। যাকগে এত কিছু ভাবার সময় নেই। মেহরিমার পরিবার একদম স্বাভাবিক। মেহরিমাকে একটুও বুঝতে দিচ্ছেনা যে তারা কষ্ট পাবে। কারণ তাহলে মেহরিমা তাদের ছেড়ে আসতে পারবেনা। সেজন্য সবাই আনন্দের সাথে তাকে বিদায় দেবার ব্যবস্থা করছে। মেহরিমা তিনটা রাত আমাকে জ্বালিয়ে মারছে। আর কোনদিন এমন জাদুময় ক্ষমতা থাকবেনা সেজন্য আচ্ছা করে আমার সাথে মজা করে নিচ্ছে। হুট করে আসে ভয় দেখায় আবার হুট করে চলে যায়। দাদুজি জোর করে মেহরিমাকে আমার কাছে বারবার পাঠায় যেন তার মন এক মুহুর্তের জন্য খারাপ না থাকে।
-
অবশেষে সেই সোনালী দিন। কষ্টের দুয়ারে তালা লাগিয়ে এক সুখের সাগরে ডুব দেয়ার দিন। আজ আমার আর মেহরিমার বিয়ে। তাও কিনা পরীস্থানে। বাবা, মা, দাদি, ওস্তাদজি, দাদুজি, আরো সবাই। পরীস্থানের আয়োজন মুখে বলে বোঝানোর মত নয়। তাছাড়া নিজের বিয়ে বলে কথা। লিখতেও তো একটু কাতুকুতু লাগে। আমার আর মেহরিমার বিয়ে হয়ে গেল। অনেকটা মৃত্যুকান্নার মত মেহরিমা পরীস্থান থেকে বিদায় নেয়। আর তারপর আমার ছোট্ট চিলেকোঠায় এক সাধারণ মানুষের মত প্রবেশ করে। বাবা মা আমাকে আর মেহরিমাকে বিদায় দিয়ে চলে যান গ্রামে। সাথে আমাকে কিছু টাকাও দিয়ে যায়। আর বলেন সময় সুযোগ করে যত দ্রুত সম্ভব যেন গ্রামে যাই।
-
আলতো করে ছোট্ট একটি বাসর ঘর সাজানো হয়েছে। গাধাফুলের গন্ধে রুমটা কিছুটা মুখরিত। বাড়ির অনেকেই শুনতে পেরেছে আজ চিলেকোঠার ছেলেটি বিয়ে করে বউ নিয়ে এসেছে। তাই অনেকে তাকে দেখতে আসছে। কিন্তু কেউ মেহরিমার রহস্য জানেনা। মেহরিমা শুধু মহিলাদের সাথে দেখা করে। কোন পুরুষ আসা নিষেধ। বাড়িওয়ালা ছাদটাকে আমাদের জন্য লক করে দিয়েছে। আজ থেকে কারো ছাদে আসা নিষেধ। তবে কিছুদিনের মধ্যেই একটা ভালো রুমের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। জানিনা কেন সবাই আমার জন্য এতকিছু করছে। সবাই কেমন আপন হয়ে গেল। শুনেছিলাম একটা ছেলের জীবনে তার স্ত্রী রহমত হয়ে আসে। হয়তো আমার জন্য মেহরিমা তাই । তার আগমনে সব কেমন ঠিক হয়ে গেল। এবার তাকে খুশি রাখাটাই আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ।
-
রাত সারে দশটা বাজে। মেহরিমা বিছানায় বসে আছে । কেঁদেছে অনেক। এখন আর চোখে পানি নাই। মেহরিমার কাছে যাবার আগে আমার একটি কথা মনে পড়ে গেল। বিয়ের প্রথম রাতের জন্য অনেক আগে থেকেই একটা প্লান করে রেখেছিলাম। এটা যে আমাকে করতেই হবে। তাই দ্রুত বাইরে চলে আসলাম।
পর্ব ১২ পড়তে
Subscribe to:
Post Comments
(
Atom
)
Post Top Ad
ফেসবুকের গল্প তে আপনাকে স্বাগত। এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কোনো লেখা বা মতামতের জন্য 'ফেসবুকের গল্প' কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।
Post Bottom Ad

No comments