আমার পাশের সিটের মহিলার কোলের বাচ্চাটা হুবুহু অনিমের মতো দেখতে। অনিম আর আমি দু'জন দু'জনকে ভালোবাসি।
আমি হুড়মুড় করে বাসে উঠে স্থির হয়ে বসার একটু পরেই চোখ গেলো বাচ্চাটার দিকে, আমি চমকে উঠলাম। আশ্চর্য হলাম এত মিল কিভাবে হয়!
ঢাকাগামী এই বাসটা আসছে রাজশাহী থেকে। আমাদের টাঙ্গাইলের নিরালা বাসের চাকা পাংচার হয়ে গেলো হঠাৎ, তাও আবার দুইটা চাকা।
এতগুলো যাত্রী বিপদে পড়ে গেলাম। হেল্পার, ড্রাইভার চলন্ত বিভিন্ন ঢাকাগামী বাস থামাচ্ছে, যদি কোন বাসে ফাঁকা সিট থাকে তবে তারা রিকোয়েস্ট করে যাত্রীদের মধ্যে কাউকে উঠিয়ে দিচ্ছে।
বাচ্চাটা ওর মায়ের বুকে লেগে আছে, আহ্ কি নিশ্চিত জীবনের এই সময়টা। মাও পরম মমতায় জড়িয়ে রেখেছে।
অনিমের সাথে চাহারায় মিল হওয়ায় বাচ্চাটাকে দেখে মনের মধ্যে হঠাৎ কু ডেকে উঠলো।
অনিম এবং আমি দু'জন দু'জনকে অসম্ভব ভালোবাসি। কিছুদিন পরেই আমরা বিয়ে করবো। ফেসবুকে পরিচয় আমাদের, এর পরে দেখা এখন তো ওকে ছাড়া কিছু চিন্তা করাই অকল্পনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ধুর শুধু শুধু চিন্তা করছি। মানুষের মতো মানুষের চেহারা হতে পারে না? কিছুদিন পরেই তো আমরা বিয়ে করবো। অনিমের সাথে বিয়ের ব্যাপারটায় আমার বাসা থেকে রাজি হয় কিনা কে জানে। তাঁরা হয়তো আমার নিজের পছন্দের কথা জানলে বেঁকে বসবে। তাঁরা বলবে এই জন্য তোকে এত টাকা খরচ করে প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়তে পাঠিয়েছি? তাই আমি ভেবে রেখেছি তাঁরা না মানলে আমরা চুপি চুপি বিয়েটা সেরে ফেলবো। তবে অনিম বিয়ের কথা উঠলেই একটু গড়িমসি করে। সে সময় নিতে চায়, আসলে ও আরেকটু গুছিয়ে নিতে চায়। ও খুব ভালো মনের মানুষ, আমার কোন কাজে বাঁধা দিবে না। খুব মুক্ত মনের মানুষ ও। ওর মতো কাউকে জীবন সঙ্গী হিসেবে পেলে যে কোন মেয়ে ধন্য হবে।
বাচ্চাটা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো। হাসিটাও অনিমের মতো। আমি এবার মনোযোগ দিলাম মহিলার দিকে। খুব ছিমছাম আর স্নিগ্ধ, আমার চাইতে বয়সে বড় হবে। ভাবলাম তার সাথে আলাপ করি একটু।
আমি কিছু বলার আগেই মহিলা কথা বলা শুরু করলো। নিজের নাম বলল হিমা, বাচ্চার নাম আদৃতা, বয়স তিন বছর। তার বাবার বাড়ি রাজশাহী। সে এক সপ্তাহের জন্য বেড়াতে গিয়েছিলো বাবার বাড়িতে, তার হাসব্যান্ড বাসে উঠিয়ে দিয়েছিলো আজ আবার নিতে আসবে বাসস্ট্যান্ডে । হাসব্যান্ডের অফিসে কাজের অনেক প্রেসার,ছুটি নেয়ার জো নেই তাই শ্বশুর বাড়িতে যেতে পারেনি।
আমিও আমার পরিচয় দিলাম, আমি আমরিন। ময়মনসিংহের মেয়ে। আমার খালামনির বাড়ি টাঙ্গাইলে, হঠাৎ খালামনির অসুস্থতার খবর পেয়ে দেখতে গিয়েছিলাম তাঁকে। খালামনি আমাকে অসম্ভব ভালোবাসেন।
আমার কথা বলা শেষ হতেই, হিমা অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। তাদের বিয়ে হয়েছে পাঁচ বছর। খুব সুন্দর গোছানো, সুখের সংসার, হাসব্যান্ডের প্রশংসা করতে করতে যেন মুখে ফেনা উঠে যাচ্ছে ওর। ওর কথা বলার সময় ওর চোখে যে দ্যুতি ছড়াচ্ছে তাতেই বোঝা যায় ও আসলেই খুব সুখী স্বামী সংসার নিয়ে।ওর স্বামী এত ভালো, এত কেয়ারিং সেটা বুঝাতে সে উপযুক্ত শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না।
কথা বলতে বলতে হিমার কল এলো- হিমা বলতে লাগলো,"এত চিন্তা করো কেন, ঠিক আছি, আর খুব বেশিক্ষণ লাগবে না, তুমি অফিস থেকে ঘণ্টা খানেক পরে বের হও। এত তাড়া.. আমাকে খুব মিস করেছ, আমি বুঝি করিনি? আচ্ছা আদৃতার সাথে কথা বল,
বাচ্চাটা বলতে লাগলো, বাবা বাবা, …
বাচ্চাদের এই বয়সটা অনেক সুন্দর, এত কিউট লাগে আধো কথা বলা, বলতে বলতে আটকে যাওয়া।
মোবাইল রেখেই হিমা বলতে লাগলো, আদৃতার বাবা একেবারে অস্থির হয়ে গেছে, এই কয়দিন ছিলাম না, প্রতিদিন তিন চার বার ভিডিও কলে কথা হতো , ঘণ্টা পেরিয়ে যেতো, মেয়ের সাথে তো কথাই শেষ হয় না। মেয়েও বাবা বলতে অজ্ঞান। দেখ কান্ড আমি পেটে ধরেছি, আমি সব কিছু করি আর বাবার জন্য পাগল, দেখতেও হয়েছে একেবারে বাবার মতো। কেন আমার মতো দেখতে হতে পারতো না? বল?
আমার মনে এই বার ভয় হতে লাগলো, এই বাচ্চা অনিমের নয়তো? মনে হচ্ছে আমি ডুবে যাচ্ছি। মনকে বার বার এই বলে সান্ত্বনা দিলাম আমার মনের ভয় অহেতুক।
হিমা আমাকে আলতো করে ধাক্কা দিয়ে বললো , –ঐ দেখ কি সুন্দর সরিষা ক্ষেত, চোখ জুড়িয়ে যায়। ইচ্ছে করে ছুঁয়ে দেখতে।
আমার ভালো লাগছে না দেখতে, সব সময় প্রকৃতির এই সৌন্দর্য মনে সুন্দর অনুভূতি তৈরি করলেও এখন ভালো লাগছে না।
হিমা ফটাফট অনেকগুলো ছবি তুললো। টুপ করে আমাকে সহ সেলফিও উঠালো। আমি অসম্ভব বিরক্ত বোধ করলাম, অনুমতি না নিয়ে কেউ এভাবে ছবি তোলে?
সে আমাকে দেখাতে লাগলো ছবি কেমন হয়েছে। এই সময়ের ছবি ছাড়াও সে তাদের আগের ছবি দেখাতে লাগলো।
–এই দেখ বাবা-মেয়ে।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আমি বোধ শক্তি হারিয়ে ফেললাম । এটা তো সত্যিই অনিম। ও আমাকে যা বলেছে সব কি তবে মিথ্যা?
কিভাবে অনিমের সাথে জড়িয়ে গেলাম প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ভাবলাম। কখনো একটুর জন্যেও মনে হয়নি ও মিথ্যে বলতে পারে! এত চতুরতা এত বড় ধোঁকা! কিছুদিন থেকেই সে বলে আসছিলো আমাদের আরো কাছে আসা উচিত, আরো বুঝা উচিত, দু'জন দু'জনকে ভালোবাসি হোটেলে একান্তে সময় কাটাতে সমস্যা কি? আমরা তো বিয়ে করবোই। আমি বার বার মানা করেছি, বিয়ের কথা বলেছি কিন্তু আমার মন এক সময় ওর চাওয়ায় সাড়া দিতে চাইলো। কথা ছিলো দুইদিন আগে তার দেয়া এড্রেসে আমি যাবো রুম ডেটে। কিন্তু খালামনির অসুস্থতার খবর শুনে হঠাৎই যেতে হলো আমাকে।
কি সর্বনাশ করতাম নিজেই নিজের! বাবা - মা পড়াশোনার জন্য ঢাকায় পাঠিয়েছে আর আমি এই করে বেড়াচ্ছি? নিজের উপর নিজেরই অসম্ভব রাগ হলো, কিভাবে ফাঁদে পড়লাম ওর? এর ধূর্ত শয়তান ও , আমি একটুও বুঝতে পারিনি ওর চালাকি! আসলে সেই কথাই মনে হয় ঠিক, প্রেমে পড়লে নাকি লোকে অন্ধ হয়ে যায়। অনিমের কাছে আমি শিকার হলেও আমার কাছে সে তো প্রেমিক। আমি একেবারেই অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম ওর প্রেমে পড়ে। এত সুন্দর বৌ, এত কিউট বাচ্চা, এত সুখের সংসার থাকতেও অনিম এমন করতে পারে? আসলে খারাপের জন্য সংসারের সুখ, দুঃখের কোন বিষয় হতে পারে না।
হিমা আমাকে ধাক্কা দিয়ে বলল কোথায় হারিয়ে গেলে?
আমি কি বলবো ভেবে পাচ্ছি না। কিছুটা সময় নিলাম, বড় করে নিঃশ্বাস নিয়ে হিমাকে জিজ্ঞেস করলাম ওর স্বামীকে কতটা বিশ্বাস করে সে। সে বললো, নিজের প্রাণের চাইতেও বেশি।
আমি হেসে ফেললাম ওর কথা শুনে।
আমার হাসি দেখে ও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।
হিমার হাতের উপর একটা হাত রেখে ওকে বললাম-
–আমি যা কিছু বলবো এখন প্রথমেই রিয়েক্ট করবেন না, জীবনে এমন সব আশ্চর্য আর অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যার জন্য আমার কেউ হয়তো প্রস্তুত থাকি না।
আমার দিকে ও আশ্চর্য হয়ে তাকালো।
ওর স্বামীর নাম উল্লেখ না করে,
প্রথম থেকে বর্তমান পর্যন্ত আমার জীবনে একজন পুরুষের জড়িয়ে যাওয়ার গল্প, আমাকে ঠকানো, সেই সাথে স্ত্রীকে ঠকানো, এত বড় বিশ্বাস ঘাতকতা সব কিছুই খুলে বসলাম ওকে।
এর পরে হিমাকে প্রশ্ন করলাম-
–এখন আমার কি করা উচিত?
ওর স্ত্রী যদি এই ঘটনা জানে তারই বা কি করা উচিত?
হিমার মুখ কঠিন হয়ে গেলো। ও বললো-
–এমন লোককে সবার সামনে জুতা দিয়ে পিটিয়ে শিক্ষা দেয়া উচিত আর সেই স্ত্রীরও কোন ভাবেই এই বিশ্বাস ঘাতকের সাথে সংসার করা উচিত না।
এমন লম্পট স্বামী থাকার চাইতে না থাকা ভালো।
এই বার প্রশ্ন করলাম, আপনার ক্ষেত্রে এমন হলে কি করতেন? সে তো প্রথমে মানতেই পারে না তার স্বামী কোনদিন তার সাথে এমন করতে পারবে, কোনদিনও এমন করবেই না। আমি বললাম, তার পরেও যদির কথা বলছি যদি এমন হতো তবে কি করতেন? সে বললো, কোন ভাবেই লম্পটের সাথে সংসার করতাম না।
অনিম আর আমার ছবি বের করে আমার মোবাইলটা হিমার হাতে দিলাম।
হিমার যেন কারেন্টে শক লাগলো। একবার ছবির দিকে আরেকবার আমার দিকে তাকালো। আমি বললাম, আরো আছে দেখুন সবগুলো। কল লিস্ট দেখুন, তিনঘণ্টা আগেও ওর সাথে কথা হয়েছে। ফেসবুকে এড আছি দেখেন। অবশ্য এটা হয়তো আরেকটা আইডি ওর। একটু আগে যার কথা বলেছিলাম সে আর কেউ নয় আপনার হাসব্যান্ড অনিম। সে তো আমাকে ধোঁকা দিয়েছেই সাথে আপনার সাথে প্রতারণা করে চলেছে সব সময়। আমার তো মনে হয় শুধু আমিই না, আরো অনেকের সাথে তার রিলেশন আছে।
হিমা একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলো। আদৃতা ঘুমিয়ে গিয়েছিলো এইবার জেগে গেলো।
বাস স্ট্যান্ডে যখন বাস থামলো আমাদের মধ্যে গভীর নিরবতা বিরাজ করছে। আমার মনে যে ঝড় বইছে, বুঝতে পারছি তার থেকে অনেক গুণ বেশি ঝড় বইছে হিমার মনে। তার এত দিনের সংসার, তার সন্তানের বাবার একটা মুখোশ আছে আর সেটা এত কুৎসিত এই সত্য তাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
অনিম এগিয়ে এসে আদৃতাকে কোলে নিতে চাইলে হিমা দিলো না।
হিমার পেছনেই আমাকে দেখতে পেয়ে অনিম ভুত দেখার মতো চমকে উঠল। সে বুঝতে পারলো তার এত লক্ষী আর নরম বৌটার এত কঠিন রুপ কেন?
আমি শুধু বললাম, সত্য কখনো চাপা থাকে না। ওর বাচ্চাটা জেগে না থাকলে কষিয়ে একটা থাপ্পড় লাগিয়ে দিতাম।
হিমা সিএনজি অটোরিকশা দাঁড় করিয়ে উঠে পড়লো। অনিমের দিকে না তাকিয়ে শুধু বললো, আপার বাসায় চলে যাচ্ছি। কোন লম্পটের সাথে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না।
আমি রিক্সা নিলাম। ভাবতে লাগলাম অনিমের মতো ধূর্তদের ফাঁদে পড়ে আমার মতো বোকারা সর্বস্ব খুইয়ে ফেলে। অথচ সন্দেহ করার মতো অনেক কিছুই ছিলো অনিমের মধ্যে। কত ঘটনাই শুনি, জানি তবু কেন আমাদের মতো বোকারা সাবধান হয় না, সচেতন হয় না, টুপ করে গিলে ফেলি টুপ সহজেই বিশ্বাস করে? হঠাৎ বয়ে যাওয়া ঝড়োহাওয়ায় আমার মনে যে আর্বজনা জমেছে সেটাকে সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে ফেলতে হবে দ্রুত। হঠাৎ খেয়াল করলাম আমার চোখ থেকে পানি পড়ছে, অপাত্রে ভালোবাসা নিবেদন করেছিলাম যে।
(সমাপ্ত)
No comments