• সাম্প্রতিক

    শেষ বয়সের সুখ

    মিমি প্রতিরাতেই নিজেকে একান্তে নিয়ে কান্না করে। প্রথম প্রথম আমি ওকে সান্ত্বনা দিলেও এখন আর সান্ত্বনা দেইনা। বিশ বছর ধরে একজন নিঃসন্তান নারীকে কী বলেই বা সান্ত্বনা দিবো? কতবার যে ডাক্তার দেখিয়েছি তাঁর কোনো ইয়ত্তা নেই।
    সমস্যাটা আসলে আমার নয় বরং মিমির। আর সমস্যাটাও বেশ অদ্ভুত ধরণের কারণ মিমির প্রতিবারই যখন রজঃচক্রে ওর ডিম্বাণু তৈরি হয় তখন সেটা স্পার্ম দিয়ে নিষিক্ত হবার পূর্বেই নষ্ট হয়ে যায়। এটাকে কী রোগ বলে তা আমার জানা নেই তবে আমিও যে এই বিষয় নিয়ে কম কষ্টে আছি তাও কিন্তু না। কেননা প্রত্যেক পুরুষেরই বাবা হবার এক আকুল ইচ্ছা মনে প্রতিবারই উঁকি দেয় কিন্তু আমার বাবা হবার ইচ্ছাটা এখনো ধোয়াশাই রয়ে গেল।

    আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে এক নব দম্পতি উঠেছে বেশ কিছুদিন যাবৎ। আর তাঁদের একটি ফুটফুটে বাচ্চাও রয়েছে। মিমি প্রায় সব সময়েই ঐ বাসায় বসে মেয়েটির সাথে গল্প করে কিন্তু আমি বুঝতে পারি যে মিমির ঐ বাসায় যাবার উদ্দেশ্য মেয়েটির সাথে গল্প করা নয় বরং তাঁর বাচ্চাটাকে কোনো এক ছুতোয় আদর করে দেয়া। মেয়েটি এসব বিষয় বুঝতে পেরেও কখনো মিমিকে খারাপ কিছু বলেনি বরং তাঁর জন্য একটু ভালোই হলো বোধহয়। কারণ সে অন্যান্য কাজ করার সময় বাচ্চাটিকে ভালোভাবে দেখাশুনা কিংবা খেয়াল রাখতে পারেনা আর এই সুযোগটাই সে মিমিকে দিয়ে কাজে লাগায়।
    প্রতিদিন রাতেই মিমি ঘুমানোর পূর্ব মুহূর্তে বাচ্চাটাকে নিয়ে আমার সাথে গল্প করে যে সে আজ তাঁর সাথে কী কী করেছে। আমি এসব শুনে উপরে উপরে নিজেকে হাসিখুশি দেখালেও ভিতরে ঠিকই হৃদয়ের অন্তর দহনে পুড়ে যাচ্ছিলাম কিন্তু আমি তা কখনোই প্রকাশ করতামনা। কারণ মিমি যে অন্যের বাচ্চার কারণে একটুখানি খুশি আছে সেটাই বা কম কীসে?

    সেদিন সকালে মিমি আমাকে খাবার দিয়ে ঐ বাসার বাবুটার জন্য পায়েশ রান্না করে দিয়ে আসতে যায়। কিছুক্ষণ অন্তর হঠাৎই মিমি চিৎকার করে বাসায় ফিরে আসে। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি মিমিকে বারবার জিজ্ঞেস করার পরও ও কোনো উত্তর দিচ্ছিলো না বরং শীতার্ত মানুষের ন্যায় অনবরত কাঁপছিলো। আমি ওর এহেন কান্ড দেখে অনেকটা কৌতুহল নিয়ে পাশের ফ্ল্যাটে প্রবেশ করতেই রক্তাক্ত মেঝেতে পরে থাকা লোকটিকে দেখে হতভম্ব হয়ে যাই। লোকটি আর কেউই নয় বরং মেয়েটিরই স্বামী। আর লোকটির ঠিক পাশেই বসে মেয়েটি রক্তাক্ত ছুড়ি নিয়ে অনেকটা পাথরের ন্যায় স্থিরচিত্তে বসে আছে আর তাঁদের বাবুটা বিছানায় শুয়ে শুয়ে অঝোর ধারায় কেঁদেই চলছে। ঘটনার আকস্মিকতায় আমিও যেন কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে গিয়েছিলাম।
    পরক্ষণে হুঁশ ফিরতেই মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাম,
    - ' এটা তুমি কী করলে? '
    মেয়েটি অনেকটা সাবলীল আর ভয়হীন মুখে উত্তর দিলো,
    - ' যেটা করা উঁচিত ছিলো সেটাই করেছি। ও আমাকে বিয়ের পর থেকেই ধোঁকা দিতে দিতে এসেছে তাই ওর এটাই প্রাপ্য। '
    মেয়েটির কথা শুনে আমি তেমন অবাক হলাম না কারণ ওর স্বামীর ব্যাপারে মিমির মাধ্যমে অনেক কিছুই জানতে পেরেছিলাম। মেয়েটি মিমির সাথে মনের সব দুঃখ কষ্টই শেয়ার করতো আর মিমিও সবকিছুই আমাকে বলতো।
    ঘটনাক্রমে জানতে পারি মেয়েটির স্বামী তাঁর অগোচরে প্রায়শই অন্যান্য মেয়েদের সাথে সময় কাঁটাতো এবং এই নিয়ে তাঁদের সংসারে বেশ অশান্তিও তৈরী হয়েছিলো আর সেটার শেষ পরিণতি আজ সে তাঁর স্বামীকে নিজ হাতেই খুন করেছে। এসব ভাবনা থেকে বাস্তবে ফিরে মেয়েটিকে আমি অনেকটা ভয়ার্ত গলায় বলে উঠলাম,
    - ' যা করার করেছো। এখন তুমি তোমার বাচ্চাকে নিয়ে পালিয়ে যাও নয়তো... '
    আমার কথা শেষ করতে না দিয়ে মেয়েটি বলে উঠলো,
    - ' নয়তো কী? পুলিশ আমাকে জেলে ভরবে তাইতো? কিন্তু আমি যদি পালিয়ে যাই তখন যে আমাকে তাঁরা খুঁজে পাবেনা তাঁর কী কোনো গ্যারান্টি আছে? '
    মেয়েটির কথার জবাবে আমি কিছু বলতে পারলাম না। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর সহসাই মেয়েটি অনেকটা আকুল কন্ঠে বলে উঠলো,
    - ' ভাইজান, আমার একটি কথা রাখবেন? আমি জানি বাকি জীবনটা আমাকে জেলেই কাঁটাতে হবে। আমি কাউকেই ভরসা করতে পারছিনা যে আমার বাচ্চাটাকে ভালোভাবে লালন পালন করবে। আমি জানি মিমি আপু নিঃসন্তান এবং তিনি আমার বাচ্চাটাকে অনেক ভালোওবাসেন। তাই আমি চাই বাকি জীবনটা আপনারাই ওর বাবা মা হয়ে ওর দায়িত্ব নিন। '
    .
    বিকালে যখন মেয়েটিকে পুলিশ নিয়ে যাচ্ছিলো তখন মিমি কোনো এক অজানা কারণে ওকে জড়িয়ে ধরেছিলো কিছুক্ষণ। আমি তখনও বুঝতে পারিনি এটা কোনো আনন্দের জন্য নাকি কষ্টের জন্য? এরপরের দিনগুলো মিমির কাছে স্বর্গবাসের থেকে কোনো অংশেই কম ছিলোনা। কারণ সে তাঁর একটি সন্তান পেয়েছে এর থেকে সুখকর মুহূর্ত আর কীইবা থাকতে পারে?
    প্রতিদিন যখন অফিস থেকে বাড়িতে ফিরবো তখনি মিমি আমাকে ফোন দিয়ে বাবুর জন্য এটা ওটা নিয়ে আসতে বলবে। আমিও যে কম খুশি তা কিন্তু নয় যদিও সামির অর্থাৎ আমাদের বাচ্চাটির সাথে আমার কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই তবুও ওকে নিজের কোলে নিলে নিজের নিকট এক অন্যরকম মায়া অনুভূত হয়।
    '
    এভাবেই কেঁটে যায় পাঁচ বছর...
    সামির এখন বেশ বড় হয়েছে। মিমি বিন্দু সময়ের জন্যও সামিরকে হাতছাড়া করেনা বরং সে রত্নের মতোই ওকে নিজের নিকট আগলে রাখে। একদিন হঠাৎই সেই মেয়েটি অর্থাৎ সামিরের প্রকৃত মা আমাদের বাড়িতে উপস্থিত হয়। তাকে দেখে স্বভাবতই আমরা অবাক হয়েছিলাম ঠিকই তবে ভয়ও পাচ্ছিলাম এই ভেবে যে সে কী সামিরকে নিয়ে যেতে এসেছে? মেয়েটি নাকি তাঁর কোনো এক ভাইয়ের সুপারিশে দীর্ঘ পাঁচ বছর পর জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে।
    যখন মেয়েটি তাঁর হাত দুটো প্রসারিত করে সামিরকে মায়াবী কন্ঠে কাছে ডেকেছিলো তখন সামির স্বভাবতই ওর কাছে যায়নি। কেননা যে বাচ্চা ছোটবেলা থেকেই অন্য কাউকে নিজের বাবা মায়ের স্থানে দেখে এসেছে সে কখনোই তাঁর প্রকৃত মাকে চিনতে পারবেনা। মেয়েটি যে তাঁর ছেলের এমন ব্যবহারে বেশ কষ্ট পেয়েছে তা তাঁর কান্না অবস্থায় চলে যাওয়ার দৃশ্যই আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিলো। এহেন দৃশ্য দেখে আমার মনে বেশ কষ্ট অনুভূত হলেও মিমি বেশ খুশিই হয়েছিলো বটে।
    এর ঠিক দুদিন পরই মেয়েটি আমাদের বাড়িতে পুলিশ নিয়ে উপস্থিত হয় সামিরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। মেয়েটির এহেন কান্ডে স্বভাবতই আমরা অবাক হয়ে যাই।
    একপর্যায়ে যখন মেয়েটি পুলিশকে বলে উঠলো,
    - ' আমার সাথে তাঁদের চুক্তি হয়েছিলো যে আমি জেল থেকে চলে আসলে আমি আমার ছেলেকে নিয়ে যাবো। '
    এসব কথা শুনে পুলিশও কোনো এক অজানা কারণে মেয়েটির পক্ষ নিয়ে সামিরকে দিয়ে দিতে বলে। মিমি তখন সামিরকে এতোটাই শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলো তাতে মনে হচ্ছিলো দুনিয়া উল্টে গেলেও মিমি সামিরকে কখনোই দিবেনা। তবুও পুলিশের পক্ষপাতিত্বের কারণে মেয়েটি অনেকটা জোরপূর্বকভাবেই সামিরকে কেড়ে নিয়েছিলো। আমার তখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব দৃশ্য অবলোকন করা ব্যতীত আর কোনো পথই ছিলোনা।
    এরপর সামিরকে হারানোর বেদনায় মিমি এতোটাই দুর্বল হয়ে পরে যে সে নাওয়া খাওয়া একপ্রকার বন্ধই করে দিয়েছিলো। মায়ের কোল থেকে সন্তানকে কেড়ে নেবার কষ্টটা যে কতটা প্রখর হয় সেটা মিমিকে না দেখলে আমি কখনোই বুঝতে পারতাম না।

    এভাবেই কেঁটে যায় কিছুমাস...
    মিমি নিজের কষ্ট কিছুটা প্রশমিত করতে পারলেও তখনও সামিরকে হারানোর বেদনাটা সে ভুলতে পারেনি। একদিন মিমি হঠাৎই বলে উঠে তাঁর নাকি বেশ বমি বমি ভাব হচ্ছে। আমি তখন মিমিকে কোনো এক অজানা কৌতুহলে ডাক্তারের নিকট নিয়ে যাই। আমাদের মনে তখনও কিঞ্চিত আশার সঞ্চার হয়েছিলো একটি সন্তানের জন্য। যদিও মিমির যেই সমস্যা তাতে সন্তান লাভের কোনো সম্ভাবনাই থাকার কথা নয় আর তাছাড়া চল্লিশ বছরের পর কোনো নারীর সন্তান লাভের আশা করাটাও বেশ হাস্যকরও বটে।
    যখন ডাক্তার রিপোর্টটা হাতে নিয়ে বললেন মিমি কনসিভ করেছে তখন আমাদের দুজনের কেউই তা বিশ্বাস করিনি এমনকি স্বয়ং ডাক্তারের নিকটও বিষয়টা অদ্ভুত লাগছিলো। যদিও এরকম উদাহরণ পৃথিবীতে অজস্র রয়েছে তবে একজন বন্ধ্যা নারীর শেষ বয়সে কনসিভ করার উদাহরণ বোধহয় খুব বিরলই বটে।

    যেদিন মিমি আমাদের প্রথম সন্তানটাকে জন্ম দিয়েছিলো তখন ডাক্তারের ভাষ্যমতে আমি জানতে পারি সে নাকি আমাদের সন্তানকে রক্তাক্ত অবস্থাতেই জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলো। একজন মায়ের সন্তান লাভের কতটা আকাঙ্ক্ষা থাকলে যে এধরণের কাজ করতে পারে সেটাই আমার মস্তিষ্কে তখনো ঘুরপাক খাচ্ছিলো।
    নার্স যখন আমার হাতে আমাদের নবাগত সন্তানকে তুলে দিচ্ছিলো তখন অজানা এক আনন্দে আমার হাত দুটো থরথর করে কাঁপছিলো। তরুণী নার্সটি তখন আমার হাতের অবস্থা দেখে বলেছিলো,
    - ' আপনার হাত এতো কাঁপছে কেন? আপনি আপনার সন্তানকে হাতের মধ্যে আগলে রাখতে পারবেনতো নাকি আবার ফেলে দিবেন? '
    আমি তখন অজানা এক খুশিতে নিজের ক্ষানিকটা অশ্রু বিসর্জন দিয়ে বলেছিলাম,
    - ' হ্যাঁ খুব করেই ওকে আগলে রাখতে পারবো। তুমিতো কখনোই বুঝতে পারবেনা শেষ বয়সে সন্তান লাভের আনন্দটা কতটা প্রখর হতে পারে। '
    এই বলেই আমি আমার নবাগত সন্তানকে বুকের মাঝে আগলে নিয়ে ওর কানে কানে বলছিলাম,
    – ❝ আজ থেকে তোর নাম রাখলাম সামির। কারণ তোর মাঝেই আমি সামিরের অস্তিত্ব অনুভব করতে চাই। ❞
    (সমাপ্ত)
    ✍️মিস্ক আল মারুফ

    (Md Ismail Hossen 2.0  ফেসবুকপেজ থেকে সংগৃহীত) 

    👉 👉 [এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রায় সকল পোস্ট-ই ফেসবুক থেকে সংগৃহীত। উক্ত লেখার বক্তব্য ও দায়-দায়িত্ব লেখকের একান্ত নিজস্ব। তাই প্রকাশিত লেখার বিষয়ে কোনো মতামতের জন্য এডমিন দায়ী নয়।]

    1 comment:

    1. সত্যি ! যারপর নাই আনন্দ।

      ReplyDelete

    Post Top Ad

    ad728

    Post Bottom Ad

    ad728

    আমরা আপনাকে বিনামূল্যে আমাদের আপডেট গুলি পাঠাতে যাচ্ছি। প্রথমে আপনার অনুলিপি সংগ্রহ করতে, আমাদের মেইলিং তালিকায় যোগ দিন। আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, অকেজো তথ্য প্রেরণ করে আপনাকে বিরক্ত করবো না। সুতরাং কোনও আপডেট মিস করবেন না, সংযুক্ত থাকুন!