চোখ খুলে তাকিয়ে দেখি আমি এক বিশাল গাছের উপর ঝোপড়ালো ডালে আটকে আছি। ইন্নালিল্লাহ । আরেকটু হলেই তো পড়ে যেতাম। এখান থেকে পড়লে তো নির্ঘাৎ মরন। আমার হৃদপিন্ড ধুকপুক ধুকপুক করছে। কোন রকমে ডালকে ঝাপটে ধরলাম। সামনে তাকিয়ে দেখি পরী শূন্যের উপর দাড়িয়ে আছে।
-
আজ আবার প্রথম দিনের মত ভয় করছে আমার । পরীর সাথে প্রত্যেকবার চাঁদনি রাতেই দেখা হয়। তার চোখগুলো আজ যেন বের হয়ে যাবে এমন ভাবে তাকিয়ে আছে। তবে কী সে আবার মারবে আমায়? তাহলে আমার ধারণাই ঠিক ছিল? এর আগে সে ভালো ব্যবহারের অভিনয় করেছে। আর আজ আমাকে মেরে ফেলবে? বলি দিবেনা তো আমায়? নাকি গিলে খাবে? আল্লাহ তুমি ছাড়া এখন আমার কেউ নাই।
-
চুপ থাকলে হবেনা । তোতলাতে তোতলাতে পরীকে বললাম-
= দেখেন পরী আমি জানিনা আপনার মনে কী উদ্দেশ্য। কিন্তু আপনার পায়ে পড়ি আমায় প্রাণে মারবেন না।
- ওই চুপ। বেশি সাহস বেড়ে গেছে তাইনা? একটা থাপ্পরের জন্য একটু সুযোগ দেয়ায় বেশি সাহস বেড়ে গেছে? রাস্তায় কী করেছেন এসব?
= ওহ আর হবেনা। আর করবনা। আপনাকে ছুঁয়ে কসম খাচ্ছি।
- এখন কিন্তু একটা থাপ্পর মেরে গাছ থেকে ফেলে দেব।
= দেখেন পরী, আমাকে এই গাছ থেকে নামান । আপনাকে এভাবে শূন্যে দেখে আমার ভয় করছে। নামিয়ে দিন প্লিজ।
- না নামাবোনা। আগে বলেন শিমুল বাগে এসব কাগজ লাগিয়েছেন কেন?
= মনে পড়ছিল খুব। দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল।
- আসলে এই জন্যই কারো ভালো করতে নাই। সাহস কত বড়। আমাকে নাকি দেখতে মনে চায়! থাপ্পরের কথা ভুলে গেছেন? এর আগে তো একটা দিয়েছি। এবার দুই গালে দুইটা দেব। এমন ভাবে দেব যে দুনিয়ার সব ঔষধেও কাজ হবেনা।
= আমার আর ভুল হবেনা। মাফ করে দেন। সত্যি বলছি আর ভুল হবেনা। একদম না। দেখতে মনে চাইলেও কিছু করবনা। আমি আর ওই রাস্তা দিয়ে যাবওনা। আর এমন কিছু করবনা। ওয়াদা।
- হু মনে থাকে যেন। আমি গেলাম।
= আরে আমায় নামিয়ে দিয়ে যান। আমি গাছে চড়তে জানিনা। নামতে পারবনা।
- না নামতে পারলে নাই। গাছেই বসে থাকেন। সকালে গ্রামের লোকেরা এসে নামিয়ে দিবে। এখানে বসে বসে চিৎকার করতে থাকেন।
= না না এমন করবেন না আমার ভীষণ ভয় করবে। আমি এখানে এভাবে থাকতে পারবনা। পড়ে যাব। নামিয়ে দিন আমি হেঁটে বাড়ি চলে যাব।প্লিজ আপনার পায়ে পড়ি।
- ওই চুপ। আপনার শিক্ষা হওয়ার জন্য আজ সারারাত এখানেই থাকতে হবে।
= আরে শুনেন... আমি.....
-
কে শোনে কার কথা। চোখের পলকে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। এদিকে আমার শরীর কাঁপছে। এভাবে ডালের উপর আমি থাকতে পারছিনা। নিচের দিকে তাকালেই কেমন মাথা ঘোরাচ্ছে। আর বার বার ডাল থেকে মনে হচ্ছে হাত ফসকে যাবে। এখন কী করব আমি।
-
সারারাত এভাবেই থাকতে হলো। সকাল হলো। ভালোমত তাকিয়ে খেয়ার করলাম আমি মূলত শিমুল বাগেরই একটা ঝোপড়ালো গাছে আছি। রাতে অন্ধকারে বুঝিনি তেমনভাবে। সকালে একটা লোক আসল এই রাস্তা দিয়ে। আমি চিৎকার করে তাকে ডাকলাম।সে আমাকে চিনতে পারল। বাড়িতে খবর দিল। আমাদের বাড়ি থেকে সবাই হৈ রৈ করে আসতে থাকল। গ্রামে ধুম পড়ে গেল। সবাই বলাবলি করছে আমায় নাকি ভূতে ধরেছে। বাসায় নেওয়া হলো আমায়। বিভিন্ন জন বিভিন্ন কথা বলছে। কেউ আবার আমার সামনে আসতে ভয় পাচ্ছে। মা কান্না করছে। ওদিকে আমার বুড়ি দাদি এসে বাবাকে বলল-
- শোন বাবা জুলাস, তর পোলারে জ্বিনে ধরছে। তর নানি গো বাড়িতে ভালা ওঁঝা আছে। এক্কেবারে জ্বিনের চৈদ্দ গুষ্ঠি খেদাইয়া দিব। তাড়াতাড়ি হেরে খবর দে।(বুড়ি)
= আরে কী বলেন মা । এসব কিছু না। (বাবা)
- দেখ বেশি বুঝিস না কইয়া দিলাম। আমার নাতির যেন কিছু না অয়।
কৈ রে রিয়াজ আয় তো আমারে লইয়া যা আমিই লইয়া আমু।
-
দাদি গিয়ে ওঁঝা না খাজা তারে নিয়ে আসল। বিকেলে মানুষ জমে গেল। ওঁঝা আমার সামনে কিসব মন্ত্র টন্ত্র পড়ে পানি ছিটিয়ে বলল-
- ওরে গেউয়া জ্বিনে ধরছে। এই জ্বিন গাছে থাকতে পছন্দ করে। রাইত ১২ টায় ওইহানে গিয়াই ওরে তাড়াইতে হইব যেইখানে আইজ ছিল।
-
বেটা ওঁঝার বাচ্চা ওঁঝার কথা শুনে মাথায় রক্ত উঠে গেল। কিসের গেউয়া জ্বিন কিসের কী। আমি তো আমার সাথে কী ঘটেছে। যত্তসব ভন্ড ওঁঝা কোথাকার। কিন্তু আমার কথায় কিছু হবেনা। রাত ১২ টায় আমাকে শিমুল বাগে নেয়া হলো। দড়ি দিয়ে সেই গাছের সাথে বাঁধা হলো । তারপর গরম শরষের তেল আনা হলো। পোড়া মরিচ আনা হলো। তারপর মোটা গরু বাঁধার রশি আনা হলো। আমি ভয়ে ছটফট করছি। কিন্তু কেউ বুঝতে চাইছেনা। সবাই আরো আমার থেকে ভয়ে দূরে সরে যায়। এমনকি আমার পরিবারও।
-
প্রায় ঘন্টাখানেক তন্ত্র মন্ত্র সাধন করল ওই ভন্ড ওঁঝা নামক খাজার বাচ্চা। ইচ্ছে করছে তার নুনু বরাবর একটা কষে লাথি মারি। বেটা লম্বা গোঁফ, নামাজ কালাম নাই আসছে আমার কবিরাজি করতে। আর কিসব বলল আমাকে নাকি গেউয়া না কাউয়া জ্বিনে ধরেছে। যত্তসব। আমার শরির প্রচন্ড দূর্বল। সারাদিন কোন কিছু খাওয়া নেই। এখন এই রাতের বেলা আমায় গাছের সাথে বেঁধে রেখেছে। এক থেকে দের ঘন্টা পর আমি ঘুমে ঝিমুচ্ছি। এমন সময় হুট করে গরম তেলের ছিটা আমার নাক বরাবর দেয়া হয় । এক মুহুর্তের জন্য মনে হলো আমার কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে। তাদের আমি কী করে বোঝাই।
-
বেটা ওঁঝা হাতে একটা ঝাড়ু নিয়ে আমায় আঘাত করে বলল -
- বল কী নাম তোর? কোথা থেকে আসছিস? (ভন্ড)
= ভন্ডর বাচ্চা ভন্ড আমার কী নাম তা আমার বাবাকে জিজ্ঞেস কর। (আমি)
- দেখছেন দেখছেন কত্ত বড় বেয়াদব জ্বিন? কীভাবে কথা বলে? (ভন্ড)
-
এসব বলে আবারো আমার গায়ে গরম তেলের ছিটকা দিচ্ছে আবার পোড়া মরিচ এনে নাকের কাছে ধরছে। আমার প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে আর মেজাজ গরম হচ্ছে । আর তাই তাকে ইচ্ছেমত গালাগালি করছি। আর বেটা সবাইকে বোঝাচ্ছে যে এসব জ্বিন বলছে। আজব বেপার, এভাবে কাউকে মারলে সে তো জেদ দেখাবেই আর গাল দিবেই। তাই বলে এটা জ্বিনের কান্ড? আমার পরিবারের মানুষগুলোও তার এই ভন্ডামি বুঝছেনা। সবাই দাড়িয়ে দাড়িয়ে দাড়িয়ে তামাশা দেখছে। শুধু মা আড়ালে থেকে কান্না করছে। আমি মাকে দাদিকে বাবাকে সবাইকে বলছি আমার কিছু হয়নি এই ভন্ড মিথ্যে কথা বলছে । কিন্তু কে শোনে কার কথা।
-
টানা এক ঘন্টা আমার উপর নির্যাতন করে। আমাকে প্রায় আধমরা করে ফেলে। তারপর ভন্ড ওঁঝা সবাইকে বলে জ্বিন চলে গেছে। আর আসবেনা। আর ভবিষ্যতে আবার খারাপ কিছু দেখলে যেন ওনাকে খবর দেয়। আমাকে মারধর করার কারণে আমি অজ্ঞান হয়ে গেছি, আর সে বলছে এর মানে নাকি আমার থেকে জ্বিন চলে গেছে। মানুষগুলোও কত বোকা । একটাবার বোঝারও চেষ্টা করছেনা। সবাই মোমের পুতুলের মত তার কথা বিশ্বাস করে যাচ্ছে। আমাকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো। রাত প্রায় তিনটা বাজে। খাটে শুইয়ে দেয়া হয়েছে আমায়। আর কিছু মনে নেই।
-
সকালে জেগে দেখি পরিবারের সবাই আমার চারপাশে । গ্রামের আরো অনেকেই আছে। ইচ্ছে করছে সবগুলোকে ইচ্ছা মত কথা শুনিয়ে দেই । কিন্তু এখন কিছু করলেতো আবার ওঁঝা আনা হবে। তাই আর কিছু বললামনা কাউকে। সারাদিন বিছানায় শুয়ে আছি। আমার আত্মিয়স্বজনরা এসে আমায় দেখে গেল। কী চলছে এসব বিশ্বাসই হচ্ছেনা। ইচ্ছে করছে কোথায় পালিয়ে যাই এই গন্ড মূর্খের সমাজ থেকে। রাত হয়ে গেল। আমার শরীর এখনো দূর্বল। রাতে সবাই চলে গেল যার যার মত। মা পাশে ছিল প্রায় ১১ টা পর্যন্ত। তারপর মা ও চলে গেল। আমার চোখে ঘুম লেগে যায়। রাতে হঠাৎ কারো উষ্ণ স্পর্শে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে যাই। তারপর তাকিয়ে দেখি বোরকা পড়া সেই চিরচেনা পরী আমার মাথা থেকে হাত সরিয়ে নিল। আমি কিছু বলতে যাওয়ার আগেই আমার মুখে আলতো করে আঙুল রাখল যেন কোন কথা না বলি। আমি খেয়াল করে দেখলাম সে কাঁদছে।
(ভৌতিক রহস্যময়ী ভূতের গল্প ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত)
No comments