• সাম্প্রতিক

    আমাদের চেতনায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম


    May 25, 2015




    আজ ২৫ শে মে, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী । নজরুল বাঙালীর মননশীলতার অনেকখানি জায়গা জুড়ে বিস্তৃত আছে । আজীবন সংগ্রামী এই কবির জীবনী যেন এক জিয়নকাঠি । মুহূর্তেই জেগে উঠে মন প্রাণ । মৃত্যুর প্রায় অর্ধ শতাব্দী হতে চললেও নজরুল প্রাসঙ্গিক । নজরুলকে অনেক পরিচয়ে পরিচায়িত করা যায় । তিনি একাধারে কবি, সাংবাদিক, সৈনিক, সুরকার, সাহিত্যিক রাজনীতিবিদ তো বটেই । অসংখ্য ধর্মীয় গীত রচনা করে নজরুল হিন্দু- মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের প্রিয় পাত্রে পরিনত হয়েছিলেন জীবদ্দশায় । নজরুল কেমন ছিলেন সত্যিকার অর্থে, তেমনি কিছু বিষয় নিয়ে নিম্নে আলোকপাত করার চেষ্টা করেছি ।
    আজ ২৫ শে মে, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী । নজরুল বাঙালীর মননশীলতার অনেকখানি জায়গা জুড়ে বিস্তৃত আছে । আজীবন সংগ্রামী এই কবির জীবনী যেন এক জিয়নকাঠি । মুহূর্তেই জেগে উঠে মন প্রাণ । মৃত্যুর প্রায় অর্ধ শতাব্দী হতে চললেও নজরুল প্রাসঙ্গিক । নজরুলকে অনেক পরিচয়ে পরিচায়িত করা যায় । তিনি একাধারে কবি, সাংবাদিক, সৈনিক, সুরকার, সাহিত্যিক রাজনীতিবিদ তো বটেই । অসংখ্য ধর্মীয় গীত রচনা করে নজরুল হিন্দু- মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের প্রিয় পাত্রে পরিনত হয়েছিলেন জীবদ্দশায় । নজরুল কেমন ছিলেন সত্যিকার অর্থে, তেমনি কিছু বিষয় নিয়ে নিম্নে আলোকপাত করার চেষ্টা করেছি ।
    বিদ্রোহের জয়ডঙ্কা বাজিয়ে ধুমকেতুর মত যার আগমন তিনি হচ্ছেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম । তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সুরস্রষ্টা, সাংবাদিক, রাজনীতি সচেতন ব্যক্তি, শিল্পী, সুরকার, প্রাবন্ধিক । নজরুলের কবিতায়, সাংবাদিকতায়, সঙ্গীতের প্রতিটি পরতে পরতে ফুটে উঠেছে নিপীড়িত, বঞ্চিত, খেটে খাওয়া মানুষের কথা । তিনিই প্রথম ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতার কথা বলেছিলেন ।
    ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মে (১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণকরেন কাজী নজরুলইসলাম। চুরুলিয়া গ্রামটি আসানসোল মহকুমার জামুরিয়াথানায় অবস্থিত।পিতামহ কাজী আমিনউল্লাহর পুত্র কাজী ফকির আহমদেরদ্বিতীয়া পত্নী জাহেদাখাতুনের ষষ্ঠ সন্তান তিনি। তার বাবা ছিলেন স্থানীয় এক মসজিদের ইমাম| তারা ছিলেন তিন ভাই এবং বোন। তার সহোদর তিন ভাইও দুই বোনের নাম হল: সবার বড় কাজী সাহেবজান, কনিষ্ঠ কাজী আলী হোসেন, বোনউম্মে কুলসুম। কাজী নজরুল ইসলামের ডাক নাম ছিল “দুখু মিয়া”| ব্রিটিশশাসিত ভারতের অখন্ড বঙ্গভূমির বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নিলেও নন্দিত কবিপুরুষ কাজী নজরুল ইসলাম আজ আমাদের জাতীয় কবি। রাজনৈতিক উত্থান-পতনে নানা ভৌগোলিক বিভাজনের সূত্রে এক অর্থে ভিনদেশি হয়েও যে-কারণে তিনি আজ আমাদের জাতীয় কবির মর্যাদায় অভিষিক্ত, এর পেছনে রয়েছে তাঁর প্রতি ও তাঁর সৃষ্টিকর্মের প্রতি আমাদের অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা এবং একই সঙ্গে এদেশের মানুষের সঙ্গে তাঁর নিজের সম্পৃক্ততা, সম্প্রীতি ও আক্ষরিক অর্থেই প্রেমের বন্ধন।
    তিনিস্থানীয় মক্তবে (মসজিদ পরিচালিতমুসলিমদের ধর্মীয় স্কুল) কুরআন, ইসলামধর্ম , দর্শন এবং ইসলামী ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন শুরু করেন। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে যখন তার পিতার মৃত্যু হয়, তখন তারবয়স মাত্র নয় বছর।পারিবারিক অভাব অনটনের কারণে তাঁর শিক্ষা বাধাগ্রস্থহয় এবং মাত্র দশ বছরবয়সে তাকে নেমে যেতে হয় জীবিকা অর্জ্জনে। এসময়নজরুল মক্তব থেকে নিম্নমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উক্ত মক্তবেই শিক্ষকতা শুরু করেন। একই সাথে হাজী পালোয়ানের কবরের সেবক এবং মসজিদের মুয়াজ্জিন (আযানদাতা)হিসেবে কাজ শুরু করেন। এইসব কাজের মাধ্যমে তিনি অল্প বয়সেই ইসলাম ধর্মের মৌলিক আচার অনুষ্ঠানের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হবার সুযোগ পান যা তারপরবর্তী সাহিত্যকর্মকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছে।তিনিই বাংলা সাহিত্যে ইসলামী চেতনার চর্চা শুরু করেছেন বলা যায়।
    কৈশোরে বিভিন্ন থিয়েটার দলের সাথে কাজ করতে গিয়ে তিনি কবিতা, নাটক এবং সাহিত্য সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীতেকিছুদিন কাজ করার পর তিনি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। এসময় তিনি কলকাতাতেই থাকতেন। এ সময় তিনি ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। প্রকাশ করেনবিদ্রোহী এবং ভাঙার গানের মত কবিতা; ধূমকেতুর মত সাময়িকী। জেলে বন্দী হলে পর লিখেন রাজবন্দীর জবানবন্দী। এই সবসাহিত্যকর্মে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা ছিল সুস্পষ্ট। ধার্মিক মুসলিম সমাজ এবং অবহেলিত ভারতীয় জনগণেরসাথে তার বিশেষ সম্পর্ক ছিল। পরবর্তীতে তিনি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম জনপ্রিয় বাঙালি কবি, সঙ্গীতজ্ঞ, সংগীতস্রষ্টা, দার্শনিক পরিচিতি লাভ করেন। বাংলাভাষার অন্যতম সাহিত্যিক, দেশপ্রেমী এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি।পশ্চিমবঙ্গও বাংলাদেশ – দুই বাংলাতেই তাঁর কবিতা ও গান সমানভাবে সমাদৃত।তাঁর কবিতায় বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাঁকে বিদ্রোহী কবি বলা হয়।তার কবিতার মূল বিষয়বস্তু ছিল মানুষের প্রতি মানুষের অত্যাচার এবংদাসত্বের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ। বাংলা মননে কাজী নজরুল ইসলামেরমর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদএবং সৈনিক হিসেবে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে নজরুল সর্বদাই ছিলেন সোচ্চার। তাঁর কবিতা ও গানে এই মনোভাবই প্রতিফলিত হয়েছে। অগ্নিবীণাহাতেতাঁর প্রবেশ, ধূমকেতুর মতো তাঁর প্রকাশ। যেমন লেখাতে বিদ্রোহী, তেমনই জীবনে – কাজেই “বিদ্রোহী কবি”।
    মক্তব, মসজিদ ও মাজারের কাজে নজরুল বেশি দিন ছিলেননা। বাল্য বয়সেই লোকশিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে একটি লেটো (বাংলার রাঢ় অঞ্চলের কবিতা, গান ওনৃত্যেরমিশ্র আঙ্গিক চর্চার ভ্রাম্যমান নাট্যদল)| দলে যোগ দেন। তার চাচা কাজী বজলেকরিম চুরুলিয়া অঞ্চলের লেটো দলের বিশিষ্ট ওস্তাদ ছিলেন এবংআরবি, ফারসি ওউর্দূ ভাষায় তার দখল ছিল। এছাড়া বজলে করিম মিশ্র ভাষায়গান রচনা করতেন।ধারণা করা হয় বজলে করিমের প্রভাবেই নজরুল লেটো দলে যোগ দিয়েছিলেন।এছাড়া ঐ অঞ্চলের জনপ্রিয় লেটো কবি শেখ চকোর (গোদা কবি) এবংকবিয়াবাসুদেবের লেটো ও কবিগানের আসরে নজরুল নিয়মিত অংশ নিতেন। লেটো দলেইসাহিত্য চর্চা শুরু হয়। এই দলের সাথে তিনি বিভিন্ন স্থানে যেতেন, তাদেরসাথে অভিনয় শিখতেন এবং তাদের নাটকের জন্য গান ও কবিতা লিখতেন। নিজকর্মববং অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বাংলা এবং সংস্কৃত সাহিত্য অধ্যয়ন শুরুকরেন।একই সাথে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অর্থাৎ পুরাণসমূহ অধ্যয়ন করতে থাকেন।সেই অল্প বয়সেই তার নাট্যদলের জন্য বেশকিছু লোকসঙ্গীত রচনা করেন। এরমধ্যে রয়েছেচাষার সঙ, শকুনীবধ, রাজা যুধিষ্ঠিরের সঙ, দাতা কর্ণ, আকবরবাদশাহ, কবিকালিদাস, বিদ্যাভূতুম, রাজপুত্রের গান, বুড়ো শালিকের ঘাড়েরোঁ এবং মেঘনাদবধ। একদিকে মসজিদ, মাজার ও মক্তব জীবন, অপর দিকে লেটো দলেরবিচিত্রঅভিজ্ঞতা নজরুলের সাহিত্যিক জীবনের অনেক উপাদান সরবরাহ করেছে।নজরুলেরএসময়কার কবিতার উদাহরণ দেয়া যেতে পারে:
    “ আমি আল্লা নামের বীজ বুনেছি এবার মনের মাঠে
    ফলবে ফসল বেচবো তারে কিয়ামতের হাটে। ”
    ১৯১০সালে নজরুল লেটো দল ছেড়ে ছাত্র জীবনে ফিরে আসেন। লেটো দলে তারপ্রতিভায়সকলেই যে মুগ্ধ হয়েছিল তার প্রমাণ নজরুল লেটো ছেড়ে আসার পরতাকে নিয়েঅন্য শিষ্যদের রচিত গান: “আমরা এই অধীন, হয়েছি ওস্তাদহীন /ভাবি তাইনিশিদিন, বিষাদ মনে / নামেতে নজরুল ইসলাম, কি দিব গুণের প্রমাণ”| এই নতুনছাত্রজীবনে তার প্রথম স্কুল ছিল রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুল| এর পরভর্তি হন মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুলে যা পরবর্তীতে নবীনচন্দ্রইনস্টিটিউশননামে পরিচিতি লাভ করে। মাথরুন স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষকছিলেনকুমুদরঞ্জন মল্লিক যিনি সেকালের বিখ্যাত কবি হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।তারসান্নিধ্য নজরুলের অনুপ্রেরণার একটি উৎস। কুমুদরঞ্জন স্মৃতিচারণ করতেযেয়েনজরুল সম্বন্ধে লিখেছেন,
    “ ছোটসুন্দর ছনমনে ছেলেটি, আমি ক্লাশপরিদর্শন করিতে গেলে সে আগেই প্রণাম করিত।আমি হাসিয়া তাহাকে আদর করিতাম।সে বড় লাজুক ছিল।
    যাহোক, আর্থিক সমস্যা তাকে বেশী দিন এখানে পড়াশোনা করতে দেয়নি। ষষ্ঠশ্রেণীপর্যন্ত পড়ার পর তাকে আবার কাজে ফিরে যেতে হয়। প্রথমে যোগ দেনবাসুদেবেরকবিদলে। এর পর একজন খ্রিস্টান রেলওয়ে গার্ডের খানসামা এবংসবশেষেআসানসোলের চা-রুটির দোকানে রুটি বানানোর কাজ নেন। এভাবে বেশ কষ্টেরমাঝেইতার বাল্য জীবন অতিবাহিত হতে থাকে। এই দোকানে কাজ করার সময়আসানসোলেরদারোগা রফিজউল্লাহ’র’ সাথে তার পরিচয় হয়। দোকানে একা একা বসেনজরুল যেসবকবিতা ও ছড়া রচনা করতেন তা দেখে রফিজউল্লাহ তার প্রতিভারপরিচয় পান।তিনিই নজরুলকে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালেরদরিরামপুরস্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি করে দেন। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে তিনিআবাররানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুলে ফিরে যান এবং সেখানে অষ্টম শ্রেণীথেকেপড়াশোনা শুরু করেন। ১৯১৭ সাল পর্যন্ত এখানেই পড়াশোনা করেন। ১৯১৭খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে মাধ্যমিকের প্রিটেস্ট পরীক্ষার না দিয়ে তিনিসেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। এই স্কুলে অধ্যয়নকালে নজরুল এখানকারচারজন শিক্ষক দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। এরা হলেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতেরসতীশচন্দ্র কাঞ্জিলাল, বিপ্লবী চেতনা বিশিষ্ট নিবারণচন্দ্র ঘটক, ফারসিসাহিত্যের হাফিজ নুরুন্নবী এবং সাহিত্য চর্চার নগেন্দ্রনাথবন্দ্যোপাধ্যায়।
    নজরুলের জীবনালেখ্য পর্যালোচনা করলে জানা যায়, এদেশের ভূখন্ডে তিনি পা রাখেন তাঁর কৈশোরেই। দারিদ্র্যকবলিত পরিবারে জন্ম-নেওয়া এই কবি-কিশোর আসানসোলের মাথরুন স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠ চুকিয়ে কিছুদিন প্রসাদপুরের এক বাঙালি খ্রিষ্টান পরিবারে বাবুর্চির কাজ করেন। আবারও আসানসোলে এসে যখন তিনি একটি রুটির দোকানে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করছিলেন তখন ঘটনাচক্রে তাঁর সাহিত্য-প্রতিভার পরিচয় পেয়ে কাজী রফিজউল্লাহ নামে এক পুলিশ কর্মকর্তা তাঁকে পরিবারের সদস্যের মতো নিজ বাড়িতে আশ্রয় দেন। কিছুদিন পরই তিনি ময়মনসিংহের ত্রিশাল থানায় দারোগা হিসেবে বদলি হলে নজরুলকেও সঙ্গে নিয়ে কাজীর সিমলা গ্রামে আসেন। ১৯১৪ সালের জানুয়ারি মাসে পার্শ্ববর্তী দরিরামপুর হাইস্কুলে নজরুলকে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করে দেওয়া হয়। নিজগুণেই নজরুল বিনাবেতনে লেখাপড়ার সুযোগ পান। বার্ষিক পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান পেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে চঞ্চলমতি নজরুল কাউকে না-জানিয়ে তাঁর নিজ গ্রাম চুরুলিয়ায় ফিরে যান। কিন্তু কাজীর সিমলা গ্রাম ও দরিরামপুর স্কুলকে তিনি ভুলে যাননি। ১৯২৬ সালের ১৭-১৮ জানুয়ারি ময়মনসিংহে এক কৃষক-শ্রমিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আমন্ত্রণ পেয়ে সম্মেলনে যোগ দিতে না-পারলেও কৃষ্ণনগর থেকে পাঠানো এক বাণীতে কবি লেখেন : ‘ময়মনসিংহ জেলার কাছে আমি অশেষ ঋণে ঋণী। আমার বাল্যকালের অনেকগুলি দিন ইহারই বুকে কাটিয়া গিয়াছে... আজও আমার মনে সেইসব প্রিয় স্মৃতি উজ্জ্বল ভাস্বর হইয়া জ্বলিতেছে।’ পরিণত বয়সে আবারো ময়মনসিংহ অঞ্চলে নজরুল অনেক ঘুরেছেন। ভারতীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য হিসেবে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ঢাকা, বাকেরগঞ্জ, ফরিদপুর ও ময়মনসিংহ জেলার বিস্তৃত অঞ্চল ছিল তাঁর নির্বাচনী এলাকা। জয়লাভ তো দূরের কথা, নির্বাচনে তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। ভোটপ্রার্থী হিসেবে প্রত্যাখ্যাত হলেও কবি হিসেবে তিনি সর্বত্রই ছিলেন সমাদৃত। নজরুলের স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য কাজী নজরুল ইসলামের নামে ময়মনসিংহে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে।
    বিভিন্ন সময়ে নানা কাজের সূত্রে, তাঁকে দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ও বহু সম্মেলনে যোগ দিতে নজরুল ইসলাম এদেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছেন। যেখানে তিনি আজ চিরনিদ্রায় শায়িত, সেই ঢাকা শহর ও এর আশপাশের এলাকায় তাঁর কর্মময় দিনগুলোর দিকে তাকানো যাক।
    নজরুল প্রথমবারের মতো ঢাকায় আসেন বিত©র্র্কত তারিখ ১৯২৬ সালের ২৪ জুন (!) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ২৭-২৮ জুনে অনুষ্ঠিত মুসলিম সাহিত্য সমাজের একটি অধিবেশনে যোগ দিতে। এখানে এসে প্রথমবারের মতো পরিচয় ঘটে কবি ও প্রাবন্ধিক আবদুল কাদির, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের উদ্যোক্তা কাজী আবদুল ওদুদ, আবদুল মজিদ সাহিত্যরত্ন ও অন্য অনেকের সঙ্গে। নজরুল সেই সম্মেলনে ইসলামি পুনর্জাগরণ বিষয়ে বক্তব্য রাখার পর গজল গাওয়া ছাড়াও তাঁর ‘খালেদ’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন এবং ‘খোশ আমদেদ’ নামে একটি নতুন গান পরিবেশন করেন। চট্টগ্রামের সাপ্তাহিক সম্মিলনী এবং মাসিক যুগের আলো পত্রিকার সম্পাদক দিদারুল আলম এ-সময়ে ঢাকায় আসেন। তাঁর অনুরোধে নজরুল আট পঙ্ক্তির প্রশস্তি লিখে দেন, যা যুগের আলোর একটি সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। ১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে মুসলিম সাহিত্য সমাজের দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতে নজরুল আবারও ঢাকায় আসেন; ওঠেন ড. কাজী মোতাহার হোসেনের বর্ধমান হাউসের বাসায়। এখানে বসে তিনি ‘এ বাসী আসরে আসিলে কে ছলিতে’ এবং ‘চল চল চল’ গানটি রচনা করেন, যা এখন আমাদের রণসংগীতের মর্যাদা পেয়েছে। এ-সফরে তিনি পরিচিত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক প্রখ্যাত কবি ও প্রাবন্ধিক বুদ্ধদেব বসু এবং কাজী মোতাহার হোসেনের দূরসম্পর্কের বোন ফজিলতুননেসার সঙ্গে। ফজিলতুননেসা ছিলেন প্রথম মুসলমান নারী, যিনি গণিতশাস্ত্রে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন এবং পরে সরকারি বৃত্তি নিয়ে বিলেতে যান। ফজিলতুননেসার রূপে-গুণে মুগ্ধ হয়ে নজরুল তাঁর প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন এবং এ-বিষয়ে কাজী মোতাহার হোসেন ও ফজিলতুননেসাকে অনেক চিঠি লিখেন ও বই পাঠান। কাজী মোতাহার হোসেন একটি চিঠিতে ফজিলতুননেসার অনাগ্রহের কথা জানালে নজরুল অনুশোচনা করে এ-বিষয়ে বিরত হন। এরপর হঠাৎ করেই তিনি একই বছরের জুন মাসে আবারো ঢাকায় এলে ঘনিষ্ঠতা জন্মে রানু সোম নামে এক সুকণ্ঠী তরুণীর সঙ্গে, যিনি পরে বুদ্ধদেব বসুর স্ত্রী হওয়ার পর প্রতিভা বসু নামে খ্যাতি অর্জন করেন। সেবারের ঢাকা সফরকালে নজরুল রানু সোমকে তাঁদের বনগ্রামের বাসায় গানের তালিম দিতে শুরু করেন এবং তাঁদের বাসায় বসে তিনি ‘আমার কোন কূলে আজ ভিড়লো তরী এ কোন্ সোনার গাঁয়’ গানটি রচনা করেন। এ-সময়ে তিনি একদল গোঁড়া তরুণের আক্রমণের শিকার হন; তারা লাঠিসোটা নিয়ে নজরুলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, কিন্তু সৈনিক হিসেবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নজরুলের সঙ্গে তারা পেরে ওঠেনি। রানু সোম পরে কলকাতায় গিয়ে নজরুলের কাছে গান শেখেন এবং নজরুলের প্রচেষ্টায় তিনি গ্রামোফোনে ও বেতারে গান গাওয়ার সুযোগ পান। নজরুলের সঙ্গে রানু সোম ওরফে প্রতিভা বসুর সম্পর্ককে ব্যঙ্গ করে শনিবারের চিঠি পত্রিকায় নজরুলের ‘কে বিদেশী মন উদাসী’ গানটির প্যারোডি ‘কে উদাসী বনগাঁবাসী’ ছাপা হয়।
    ১৯২৬ সালে ভারতীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্যপ্রার্থী হিসেবে নজরুল নির্বাচনী প্রচারের কাজে ঢাকা হয়ে জয়দেবপুরে গিয়েছিলেন। পথে যেতে যেতে তিনি ‘চাঁদনী রাতে’ নামে কবিতাটি লেখেন। কবি আবদুল কাদিরের বিয়ে উপলক্ষে ১৯৩৪ সালের ২১ অক্টোবর কবি ঢাকায় আসেন এবং ‘বন্ধন’ শীর্ষক ‘অনন্তকাল এ অনন্তলোকে’ আশীর্বাণী রচনা করেন। নারায়ণগঞ্জ সংগীত সংসদের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আববাসউদ্দীনসহ কয়েকজন শিল্পীকে সঙ্গে নিয়ে নজরুল ঢাকা হয়ে নারায়ণগঞ্জে আসেন ১৯৩৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর।
    ঢাকা বেতার কেন্দ্রের প্রথম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে নজরুল ঢাকায় আসেন বুদ্ধদেব বসু ও একদল শিল্পীকে সঙ্গে নিয়ে ১৯৪০ সালের ১৬ ডিসেম্বর। তাঁর রচনা ও পরিচালনায় ‘পূবালী’ নামে একটি সংগীত-বিচিত্রা প্রচারিত হয় ঢাকা বেতার থেকে। পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে আসার সময় রচিত ‘পদ্মার ঢেউ রে’ এবং নৌকায় ভাসমান বেদে সম্প্রদায়ের মেয়েদের দেখে লেখা ‘আমি পূরব দেশের পূরনারী’ গানগুলো সেই সংগীত-বিচিত্রার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৪০ সালের ২৬ মার্চ ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত শচীন সেনগুপ্তের ‘ঝড়ের রাতে’ নাটকের সংগীত পরিচালনায় ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। সংগত কারণে ঢাকায় কাটানো নজরুলের শেষ-জীবনের তথ্যাবলি এ-লেখার শেষাংশে তুলে ধরা হলো।
    নজরুল প্রথমবারের মতো কুমিল্লায় আসেন ১৯২১ সালের ৪ এপ্রিল। আসার পথে ট্রেনে বসে তিনি লেখেন ‘নীলপরী’ নামে একটি কবিতা। দৌলতপুর যাওয়ার পথে তাঁদের যাত্রাবিরতি ঘটে কান্দিরপাড়ে, সফরসঙ্গী আলী আকবর খানের পরিচিত ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাড়িতে। ইন্দ্রকুমারের স্ত্রী বিরজাসুন্দরীর স্নেহে আপ্লুত হয়ে নজরুল তাঁকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করেন; পরে তাঁকে নিয়ে কবিতা লেখেন ও তাঁর নামে বই উৎসর্গ করেন; সে-বাড়িতেই তাঁর ঘনিষ্ঠতা জন্মে বিরজাসুন্দরীর দেবর বসন্তকুমার সেনগুপ্ত ও গিরিবালা দেবীর মেয়ে আশালতার সঙ্গে, যাঁর ডাকনাম ছিল দোলন বা দুলি - নজরুল নিজে যাঁর নাম দিয়েছিলেন প্রমীলা। একই যাত্রায় একদিন পর দৌলতপুর গিয়ে ঘটে আরো এক নাটকীয় এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। এক বিয়ের অনুষ্ঠানে নজরুল পরিচিত হন আলী আকবর খানের পিতৃহীন ভাগ্নি সৈয়দা খাতুনের সঙ্গে, নজরুল যার নাম দিয়েছিলেন নার্গিস। সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে নার্গিসের গান শুনে ও রূপ দেখে তিনি মুগ্ধ হয়ে তাঁর প্রেমে পড়েন। অল্পদিনের মধ্যেই দৌলতপুরে বসে অনেক কবিতা ও গান লিখে ফেলেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে : ‘অ-বেলায়’, ‘হার-মানা হার’, ‘পাপড়ি খোলা’, ‘অনাদৃতা’। হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেন নার্গিসকে তিনি বিয়ে করবেন। খবর পেয়ে কমরেড মুজাফ্ফর আহমেদসহ কবির বহু সুহৃদ বিয়ের ব্যাপারে তাঁকে সাবধানে এগোতে পরামর্শ দেন। তাঁর ও নার্গিসের একান্ত আগ্রহে ১৯২১ সালের ১৭ জুন নজরুল-নার্গিসের ‘আক্ত’ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। অজ্ঞাত কারণে কনের মামা আলী আকবর খান কাবিননামায় শর্ত জুড়ে দেন, নজরুল নার্গিসকে নিয়ে কখনো দৌলতপুর ছেড়ে যেতে পারবেন না। এই অন্যায় আচরণ ও শর্তে মর্মাহত কবি পরের দিনই নার্গিসকে ফেলে রেখে হেঁটে কুমিল্লার কান্দিরপাড়ে পৌঁছেন। কিন্তু এরই মধ্যে দৌলতপুরে বসেই তিনি লিখে ফেলেন ‘বিদায়-বেলায়’, ‘বেদনা-অভিমান’, ‘বিধুরা পথিক-প্রিয়া’, ‘মুকুলের উদ্বোধন’, ‘লাল সালাম’, ‘হারা-মণি’, ‘মানস বধূ’ ও ‘মনের মানুষ’ কবিতাগুলো। কান্দিরপাড়ে প্রমীলার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে থেকে কবি নার্গিসকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেন। জুনের শেষ সপ্তাহে তিনি কুমিল্লায় বসে ‘আজি রক্তনিশি ভোরে’, ‘ভিক্ষা দাও’ - এ দুটি দেশাত্মবোধক গান এবং ‘আমি এ-দেশ হতে বিদায় যেদিন নেব প্রিয়তমা’ - এই প্রেমের গানটি রচনা করেন।
    ১৯২১ সালের ১৮ নভেম্বর নজরুল আবারও কুমিল্লায় আসেন এবং যথারীতি ওঠেন প্রমীলাদের বাসায়। সেখানে পৌঁছেই ‘বন্দনা গান’ নামে একটি গান লেখেন, যা পরে ‘বিজয় গান’ নামে সাধনা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। একই সময়ে তিনি ‘নিশীথ-প্রীতম’ ও ‘বিজয়িনী’ নামে দুটি কবিতা লেখেন। ব্রিটিশ যুবরাজ প্রিন্স অব ওয়েলসের ভারত সফর উপলক্ষে দেশব্যাপী তখন হরতাল চলছে। কুমিল্লায় একটি মিছিলে কাঁধে হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে তিনি সরকারবিরোধী গান গেয়েছেন, মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং তরুণদের জন্য ‘জাগরণী’ নামে একটি নতুন কোরাস গান লিখে দিয়েছিলেন। সেই গান রচনা ও প্রচারের দায়ে একরাত তাঁকে থানায় আটকে রাখা হয়।
    নজরুল তৃতীয়বারের মতো কুমিল্লায় আসেন ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এ-সময়ে তিনি প্রায় চার মাস প্রমীলার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে কাটান। একশ্রেণির গোঁড়া হিন্দু ও উগ্র তরুণ একটি মুসলমান ছেলের সঙ্গে প্রমীলার এই সম্পর্ককে খারাপ চোখে দেখতে শুরু করে এবং এলাকায় এ নিয়ে বেশ উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এরই মধ্যে নজরুল তাঁর ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘প্রিয়ার রূপ’ কবিতাগুলো এবং ‘শায়ক-বেঁধা পাখি’ ও ‘চিরচেনা’ গান দুটি রচনা করেন। প্রমীলার সঙ্গে তাঁর মেলামেশা নিয়ে এলাকাবাসীর উত্তেজনার কারণে জুন মাসের কোনো একসময়ে নজরুল কলকাতায় ফিরে যান। এরপর ২২ নভেম্বর প্রমীলা ও তাঁর মা গিরিবালা দেবীর সঙ্গে তিনি আবারও কুমিল্লায় আসেন এবং আসার পরদিনই পুলিশ তাঁকে আটক করে। প্রমীলার সঙ্গে সম্পর্কজনিত উত্তেজনার কারণে নয়, ধূমকেতু পত্রিকার সরকারবিরোধী ভূমিকার দায়ে তাঁকে আটক করা হয়। ট্রেনে করে পুলিশ তাঁকে কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলে নিয়ে যায়।
    রাজনীতি সচেতন এবং ভারতবর্ষের মুক্তি আন্দোলনের একজন মূর্তিমান আতঙ্ক ছিলেন কবি ইংরেজদের কাছে । সবসময় তিনি ইংরেজেদের রোষানলে ছিলেন । ১৯২৩ সালে তিনি প্রকাশ করেন আনন্দময়ীর আগমনে । কবিতাটির শুরুর পংতিতে ছিল ক্ষোভ আর হতাশা আর ঘৃণার কথা । যেমন লিখেছেন তিনি –
    আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল ?
    স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী চাঁড়াল ।
    দেব শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবকদের দিচ্ছে ফাঁসি,
    ভু-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী ?
    রাজনৈতিক কবিতা হওয়ার অপরাধে ১৯২২ সালের ৮ ই নভেম্বর ইংরেজরা এটিকে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে এবং একই বছরের ২৩ নভেম্বর তার যুগবাণী প্রবন্ধগ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং একই দিনে তাকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯২৩ সালে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করে জবানবন্দী দেন যা রাজবন্দীর জবানবন্দী নামে খ্যাত । তিনি বলেছেন –
    আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দি এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত।... আমি কবি,আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। কবির কণ্ঠে ভগবান সাড়া দেন, আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা ভগবানের বাণী। সেবাণী রাজবিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারে সে বাণী ন্যায়দ্রোহী নয়,সত্যাদ্রোহী নয়। সত্যের প্রকাশ নিরুদ্ধ হবে না। আমার হাতের ধূমকেতু এবার ভগবানের হাতের অগ্নি-মশাল হয়ে অন্যায় অত্যাচার দগ্ধ করবে...
    প্রহসনের বিচারে কবির ১ বছরের সাজা হয়, তাকে এই সময়ে সমর্থন জানিয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তার বসন্ত গীতিনাট্য গ্রন্থটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন। তিনি তখন রচনা করেছিলেন আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে । যেমনটি লিখেছেন –
    আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে
    মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে মোর টগবগিয়ে খুন হাসে
    আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে ।
    আজকে আমার রুদ্ধ প্রাণের পল্বলে
    বান ডেকে ঐ জাগল জোয়ার দুয়ার-ভাঙা কল্লোলে ।
    আসল হাসি, আসল কাঁদন,
    মুক্তি এলো, আসল বাঁধন,
    মুখ ফুটে আজ বুক ফাটে মোর তিক্ত দুখের সুখ আসে ।
    ঐ রিক্ত বুকের দুখ আসে-
    আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে ।
    এক বছরের কারাদন্ড শেষে নজরুল জেল থেকে ছাড়া পেয়েই ১৯২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর কুমিল্লায় চলে আসেন। কিন্তু প্রমীলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে এলাকার লোকজন বাড়াবাড়ি শুরু করলে তিনি গোপনে কুমিল্লা ছাড়তে বাধ্য হন। এর চার মাস পর ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল কলকাতার একটি বাড়িতে প্রমীলার সঙ্গে তাঁর বিয়ের কাজটি সম্পন্ন হয়।
    নজরুলের বহুশিল্পিত রচনার জন্মভূমি চট্টগ্রাম। তিনি প্রথমবারের মতো চট্টগ্রামে আসেন ১৯২৬ সালের ২৬ জুলাই। সিন্ধু-হিন্দোল কাব্যগ্রন্থের বহু কবিতা সেখানে রচিত হয়। বইটি তিনি উৎসর্গ করেছেন হবীবুল্লাহ বাহার ও তাঁর বিদুষী ভগ্নি শামসুন নাহার মাহমুদকে, যাদের সান্নিধ্যে তিনি কাটিয়েছিলেন সেই দিনগুলো। ‘অ-নামিকা’, ‘গোপন প্রিয়া’, ‘শিশু যাদুকর’, ‘সিদ্ধু-প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তরঙ্গ’, ‘বাংলার আজিজ’ ও ‘কর্ণফুলী’ কবিতাগুলো তখন তিনি রচনা করেন। ১৯২৯ সালের জানুয়ারি মাসের প্রায় পুরোটাই তিনি চট্টগ্রামে কাটান। কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে সীতাকুন্ড পাহাড়ে উঠে ও সাম্পানে চড়ে তিনি অত্যন্ত উল্লাসের মধ্যে সেই দিনগুলো কাটিয়েছেন। চক্রবাক কাব্যগ্রন্থের অনেক কবিতা তিনি সেখানে বসে রচনা করেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি’, ‘ওগো ও চক্রবাকী’, ‘বাদল রাতের পাখি’, ‘স্তব্ধ রাতে’, ‘নবীন চন্দ্র’ (অঞ্জলি পুরিয়া মম) ও ‘শীতের সিন্ধু’ কবিতাগুলো (পরবর্তীকালে ‘শীতের সিন্ধু’র নামকরণ করা হয় ‘সিন্ধু-চতুর্থ তরঙ্গ’)। এছাড়া ‘সাম্পানের গান’ (ওরে মাঝি ভাই), ‘আমার সাম্পান যাত্রী না লয়’ (যার মুদ্রিত রূপ ‘আমার এ না’ যাত্রী না লয়’), ‘কী হইব লাল বাওটা তুইল্লা’, ‘তোমার কূলে তুলে বন্ধু’ গানগুলোও তিনি এখানে বসে রচনা করেন।
    কবির অকৃত্রিম সুহৃদ কমরেড মুজাফ্ফর আহমেদের পৈতৃক নিবাস সন্দ্বীপ। ২৮ জানুয়ারি তিনি জাহাজে ও নৌকায় চড়ে সেখানে যান। বিতর্ক থাকলেও জানা যায় : তিনি তাঁর ‘খেলিছে জলদেবী সুনীল সাগরজলে’ গানটি তখন রচনা করেন। ১৯৩৩ সালের ৭ মে নজরুল আবারও চট্টগ্রাম জেলা সাহিত্য সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদান করেন। বিকেলের অধিবেশনে তিনি গান ও কবিতা আবৃত্তি করেন।
    নজরুল প্রথমবারের মতো ফরিদপুরে আসেন ১৯২৫ সালের ১ মে, কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে যোগ দিতে। তিনি সেই সম্মেলনে মহাত্মা গান্ধী ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের উপস্থিতিতে অসহযোগ আন্দোলনকে নিয়ে লেখা তাঁর ‘চরকার গান’ এবং এর সঙ্গে ‘শিকল-পরা ছল’ ও ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ গানগুলো গেয়ে শোনান। এ-সময়ে ঘনিষ্ঠতা জন্মে কবি জসীমউদ্দীনের সঙ্গে। দ্বিতীয়বার ১৯২৬ সালের ১০ মার্চ তিনি ফরিদপুরের মাদারীপুর আসেন। মাদারীপুরে নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মিলনীর তৃতীয় অধিবেশনে ‘ধীবর’ বা ‘জেলেদের গান’ শীর্ষক ‘আমরা নিচে পড়ে রইবো না আর’ উদ্বোধনী গান হিসেবে পরিবেশন করেন। গানটি অবশ্য কৃষ্ণনগরে বসে লেখা। সেই সম্মেলনে কুমিল্লা থেকে আগত রাজনৈতিক নেতা বসন্তকুমার মজুমদার ও তাঁর স্ত্রী নারীনেত্রী হেমপ্রভার সঙ্গে পরিচিত হন। নজরুল তখন হেমপ্রভাকে নিয়ে একটি দেশাত্মবোধক গান ‘কোন অতীতের অাঁধার ভেদিয়া’ রচনা করেন। নিজের নির্বাচনী প্রচারের কাজে নজরুল আবারো ফরিদপুরে আসেন একই বছরের ৩ নভেম্বর। এবার তিনি ওঠেন কবি জসীমউদ্দীনের বাড়িতে। পানীয় হিসেবে চা তখনো এদেশে সব মহলে পরিচিত হয়ে ওঠেনি। কলকাতা থেকে নিয়ে-আসা চা বানাতে দিলে এক বাড়ির মেয়েরা পেঁয়াজ-রসুনসহ রাজ্যের সব মশলা সহযোগে রান্না করে তা কবিকে খেতে দেয়। বিষয়টি বহুদিন বহু লোকের হাসির খোরাক জুগিয়েছে।
    ১৯৩৬ সালের ২৭ জানুয়ারি কবি ফরিদপুর আসেন জেলা মুসলিম ছাত্র সম্মিলনীতে সভাপতি হিসেবে যোগ দিতে; ১৯৩৮ সালে ফরিদপুর সংসদের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে এবং সবশেষে ১৯৪১ সালের ১২ আগস্ট ফরিদপুর জেলা মুসলিম ছাত্রলীগের সম্মেলনে যোগ দিতে। অবশ্য সেই সম্মেলনস্থলে ১৪৪ ধারা জারি হওয়ায় তা পন্ড হয়ে যায়। একটি মসজিদে ধর্মীয় আলোচনায় অংশ নিয়ে নজরুল কলকাতায় ফিরে যান।
    ১৯২৭ সালের ১৫ থেকে ২০ জুন তিনি উষ্ণ সংবর্ধনা পান নোয়াখালিতে। আটটি ঘোড়ায়-চালিত এক শৌখিন গাড়িতে চড়িয়ে সোনাপুর রেলস্টেশন থেকে কবিকে নিয়ে যাওয়া হয় খাদেমুল ইসলাম অফিসে; পথে পথে নির্মিত হয়েছিল সুসজ্জিত বহু তোরণ: এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তাঁকে উপহার দেওয়া হয় সোনার তৈরি দোয়াত ও কলম; লক্ষ্মীপুরের জেলেরাও তাঁকে সংবর্ধনা জানান। সেখানে তাঁকে উপহার দেওয়া হয় রুপার তৈরি মালা ও বাটি। এমন প্রাণঢালা সংবর্ধনা পেয়েছেন তিনি সিলেটেও ১৯২৮ সালের অক্টোবর মাসে। সেখানকার পর্দাপ্রথার কঠিন নিয়ম ভঙ্গ করে বহু মুসলমান নারী তাঁর অনুষ্ঠানে যোগ দিলে গোঁড়া মুসলমানদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে; কিন্তু দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ও অন্য তরুণদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
    আমাদের উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের এবং পশ্চিম সীমান্তের জেলাগুলোতে নজরুল প্রায়ই আসতেন। ১৯২৪ থেকে ১৯৩২ সালের বিভিন্ন সময়ে তিনি দিনাজপুর, রংপুর, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, রাজশাহী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, খুলনা, বাগেরহাট, যশোর ও বাকেরগঞ্জে এসেছেন একাধিকবার। বিভিন্ন সম্মেলনে অতিথি হিসেবে যোগদান কিংবা তাঁকে দেওয়া সংবর্ধনা উপলক্ষে এসব সংক্ষিপ্ত সফরে এসেছেন কবি। এসব সফরের সময় রচিত কোনো কবিতা বা গানের কথা আমাদের জানা নেই। তবে ১৯২৮ সালের ২৮ নভেম্বর তিনি রংপুরের হরগাছায় বসে ‘ভোরের পাখী’ কবিতাটি লিখেছেন।
    ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের অবসান চেয়ে যে-নজরুল এতকিছু লিখেছেন, কারাবরণ করেছেন, জাপানকে পরাজিত করার কাজে সহায়তা করলে ব্রিটিশরা চলে যাবে সে-আশ্বাসে ব্রিটিশদের পক্ষে যুদ্ধেও গিয়েছেন, সেই তিনি ১৯৪৭-এর বিতর্কিত স্বাধীনতা ও ১৯৭১-এর বাংলাদেশের স্বাধীনতা কিছুই দেখে যেতে পারেননি, যদিও শারীরিকভাবে তিনি বেঁচে ছিলেন। এক অজানা রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৪২ সাল থেকেই তিনি বোধশক্তি ও বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। তবে, বলতে গেলে এরপরই বাংলাদেশে নজরুল-চর্চা আরো বেগবান হয়ে ওঠে। বাংলা একাডেমীসহ বহু প্রকাশনা সংস্থা থেকে নজরুলের বইগুলোর নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হতে থাকে এবং বিভিন্ন জায়গায় তাঁর জন্মজয়ন্তী উদযাপিত হতে শুরু করে। ১৯৬৩ সাল থেকে বেতারে তাঁর গান ‘নজরুল গীতি’ হিসেবে স্বতন্ত্র মর্যাদা পায়। ১৯৬৪ সালের ২৪ মে ঢাকায় নজরুল একাডেমী প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭০ সালে নজরুলের জীবন ও কর্ম নিয়ে আমাদের দেশে সরকারি উদ্যোগে বিদ্রোহী কবি নামে প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়।
    ১৯৭১ সালে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদায় বোধশক্তিহীন নির্বাক কবিকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। ধানমন্ডির ২৮ নম্বর সড়কের ৩৩০-বি ভবনটি এবং একটি গাড়ি কবির নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। ডাক্তার-নার্সসহ সেবা-শুশ্রূষার সবরকম ব্যবস্থা করা হয়। ভবনটির নতুন নাম রাখা হয় ‘কবিভবন’ যা এখন আমাদের জাতীয় প্রতিষ্ঠান নজরুল ইনস্টিটিউট। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি লিট ডিগ্রি প্রদান করে। ১৯৭৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। একই বছর তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয় এবং ‘চল চল চল’ গানটি আমাদের রণসংগীতের মর্যাদা পায়।
    সৈনিক জীবন
    ১৯১৭খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। প্রথমে কলকাতারফোর্টউইলিয়ামে এবং পরবর্তীতে প্রশিক্ষণের জন্য সীমান্ত প্রদেশেরনওশেরায় যান।প্রশিক্ষণ শেষে করাচি সেনানিবাসে সৈনিক জীবন কাটাতে শুরুকরেন। তিনিসেনাবাহিনীতে ছিলেন ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের শেষভাগ থেকে ১৯২০খ্রিস্টাব্দেরমার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় আড়াই বছর। এই সময়েরমধ্যে তিনি ৪৯বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাধারণ সৈনিক থেকে কোয়ার্টার মাস্টারহাবিলদার পর্যন্তহয়েছিলেন। উক্ত রেজিমেন্টের পাঞ্জাবী মৌলবির কাছে তিনিফারসি ভাষাশিখেন। এছাড়া সহসৈনিকদের সাথে দেশী-বিদেশী বিভিন্নবাদ্যযন্ত্র সহযোগেসঙ্গীতের চর্চা অব্যাহত রাখেন, আর গদ্য-পদ্যের চর্চাওচলতে থাকে একই সাথে।করাচি সেনানিবাসে বসে নজরুল যে রচনাগুলো সম্পন্ন করেনতার মধ্যে রয়েছে, বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী (প্রথম গদ্য রচনা), মুক্তি (প্রথম প্রকাশিত কবিতা); গল্প:হেনা, ব্যথার দান, মেহের নেগার, ঘুমের ঘোরে, কবিতা সমাধিইত্যাদি। এই করাচি সেনানিবাসে থাকা সত্ত্বেও তিনি কলকাতার বিভিন্নসাহিত্যপত্রিকার গ্রাহক ছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রবাসী, ভারতবর্ষ, ভারতী, মানসী, মর্ম্মবাণী, সবুজপত্র, সওগাত এবং বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্যপত্রিকা। এইসময় তার কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়এবং ফারসি কবিহাফিজের কিছু বই ছিল। এ সূত্রে বলা যায় নজরুলের সাহিত্যচর্চার হাতেখড়িএই করাচি সেনানিবাসেই। সৈনিক থাকা অবস্থায় তিনি প্রথমবিশ্বযুদ্ধে অংশনেন। এ সময় নজরুলের বাহিনীর ইরাক যাবার কথা ছিল। কিন্তুযুদ্ধ থেমেযাওয়ায় আর যাননি। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে যুদ্ধ শেষ হলে ৪৯ বেঙ্গলরেজিমেন্টভেঙে দেয়া হয়। এর পর তিনি সৈনিক জীবন ত্যাগ করে কলকাতায়ফিরে আসেন।
    সাংবাদিক জীবন ও বিয়ে
    যুদ্ধশেষে কলকাতায় এসে নজরুল ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলিমসাহিত্যসমিতির অফিসে বসবাস শুরু করেন। তার সাথে থাকতেন এই সমিতির অন্যতমকর্মকর্তামুজফ্‌ফর আহমদ। এখান থেকেই তার সাহিত্য-সাংবাদিকতা জীবনের মূলকাজগুলোশুরু হয়। প্রথম দিকেই মোসলেম ভারত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্যপত্রিকা, উপাসনা প্রভৃতি পত্রিকায় তার কিছু লেখা প্রকাশিত হয়। এর মধ্যেরয়েছেউপন্যাস বাঁধন হারা এবং কবিতা বোধন, শাত-ইল-আরব, বাদল প্রাতেরশরাব, আগমনী, খেয়া-পারের তরণী, কোরবানি, মোহরর্‌ম, ফাতেহা-ই-দোয়াজ্‌দম্‌। এই লেখাগুলোসাহিত্য ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রশংসিতহয়। এর প্রেক্ষিতে কবি ও সমালোচকমোহিতলাল মজুমদার মোসলেম ভারত পত্রিকায়তার খেয়া-পারের তরণী এবং বাদলপ্রাতের শরাবকবিতা দুটির প্রশংসা করেএকটি সমালোচনা প্রবন্ধ লিখেন। এথেকেই দেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক ওসমালোচকদের সাথে নজরুলের ঘনিষ্ঠ পরিচয়শুরু হয়। বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্যসমিতির অফিসে কাজী মোতাহার হোসেন, মোজাম্মেল হক, কাজী আবদুল ওদুদ, মুহম্মদশহীদুল্লাহ্‌, আফজালুল হক প্রমুখেরসাথে পরিচয় হয়। তৎকালীন কলকাতারদুটি জনপ্রিয় সাহিত্যিক আসর গজেনদারআড্ডা এবং ভারতীয় আড্ডায়অংশগ্রহণের সুবাদে পরিচিত হন অতুলপ্রসাদ সেন, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, শিশিরভাদুড়ী, শরৎচন্দ্রচট্টোপাধ্যায়, নির্মেলন্দু লাহিড়ী, ধুর্জটিপ্রসাদমুখোপাধ্যায়, হেমেন্দ্রকুমার রায়, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, চারুচন্দ্রবন্দ্যোপাধ্যায়, ওস্তাদ করমতুল্লা খাঁ প্রমুখের সাথে। ১৯২১ সালের অক্টোবরমাসে তিনিশান্তিনিকেতনে যেয়ে রবীন্দ্রনাথের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তখন থেকেরবীন্দ্রনাথের মৃত্যু পর্যন্ত তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় ছিল। কাজীমোতাহার হোসেনের সাথে নজরুলের বিশেষ বন্ধুত্ব গড়ে উঠে।
    ১৯২০খ্রিস্টাব্দের জুলাই ১২ তারিখে নবযুগ নামক একটি সান্ধ্য দৈনিকপত্রিকাপ্রকাশিত হওয়া শুরু করে। অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটেপ্রকাশিতএই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন শেরে-বাংলা এ.কে. ফজলুল হক। এইপত্রিকারমাধ্যমেই নজরুল নিয়মিত সাংবাদিকতা শুরু করেন। ঐ বছরই এইপত্রিকায় “মুহাজিরীন হত্যার জন্য দায়ী কে?” শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেনযার জন্যপত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং নজরুলের উপর পুলিশেরনজরদারী শুরুহয়। যাই হোক সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক ওসামাজিক অবস্থাপ্রত্যক্ষ করার সুযোগ পান। একইসাথে মুজফ্‌ফর আহমদের সাথেবিভিন্ন রাজনৈতিকসভা-সমিতিতে যোগদানের মাধ্যমে রাজনীতি বিষয়ে প্রত্যক্ষঅভিজ্ঞতা অর্জনেরসুযোগ পেয়েছিলেন। বিভিন্ন ছোটখাটো অনুষ্ঠানের মাধ্যমেকবিতা ও সঙ্গীতেরচর্চাও চলছিল একাধারে। তখনও তিনি নিজে গান লিখে সুর দিতেশুরু করেননি। তবেব্রাহ্মসমাজের সঙ্গীতজ্ঞ মোহিনী সেনগুপ্তা তার কয়েকটিকবিতায় সুর দিয়েস্বরলিপিসহ পত্রিকায় প্রকাশ করছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে:হয়তো তোমার পাবদেখা, ওরে এ কোন স্নেহ-সুরধুনী। সওগাত পত্রিকার ১৩২৭বঙ্গাব্দের বৈশাখসংখ্যায় তার প্রথম গান প্রকাশিত হয়। গানটি ছিল: “বাজাওপ্রভু বাজাও ঘন”।১৯২১ সালের এপ্রিল-জুন মাসের দিকে নজরুল মুসলিম সাহিত্যসমিতির অফিসেগ্রন্থ প্রকাশক আলী আকবর খানেরসাথে পরিচিত হন। তার সাথেইতিনি প্রথমকুমিল্লার বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে আসেন। আর এখানেই পরিচিতহন প্রমীলাদেবীর সাথে যার সাথে তার প্রথমে পরিণয় ও পরে বিয়ে হয়েছিল।তবে এর আগেনজরুলের বিয়ে ঠিক হয় আলী আকবর খানের ভগ্নী নার্গিস আসারখানমেরসাথে।বিয়ের আখত সম্পন্ন হবার পরে কাবিনের নজরুলের ঘর জামাইথাকার শর্ত নিয়েবিরোধ বাধে। নজরুল ঘর জামাই থাকতে অস্বীকার করেন এবংবাসর সম্পন্ন হবারআগেই নার্গিসকেরেখে কুমিল্লা শহরে বিরজাসুন্দরী দেবীরবাড়িতে চলে যান।তখন নজরুল খুব অসুস্থ ছিলেন এবং প্রমিলা দেবী নজরুলেরপরিচর্যা করেন। একপর্যায়ে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
    বিদ্রোহী নজরুল
    তখনদেশজুড়ে অসহযোগ আন্দোলন বিপুল উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। নজরুল কুমিল্লাথেকেকিছুদিনের জন্য দৌলতপুরে আলী আকবর খানের বাড়িতে থেকে আবার কুমিল্লাফিরেযান ১৯ জুনে। এখানে যতদিন ছিলেন ততদিনে তিনি পরিণত হন একজন সক্রিয়রাজনৈতিক কর্মীতে। তার মূল কাজ ছিল শোভাযাত্রা ও সভায় যোগ দিয়ে গানগাওয়া। তখনকার সময়ে তার রচিত ও সুরারোপিত গানগুলির মধ্যে রয়েছে “এ কোনপাগল পথিক ছুটে এলো বন্দিনী মার আঙ্গিনায়, আজি রক্ত-নিশি ভোরে/ একি এ শুনিওরে/ মুক্তি-কোলাহল বন্দী-শৃঙ্খলে” প্রভৃতি। এখানে ১৭ দিন থেকে তিনিস্থানপরিবর্তন করেছিলেন। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে আবারকুমিল্লায় ফিরেযান। ২১ নভেম্বর ছিল সমগ্র ভারতব্যাপী হরতাল। এ উপলক্ষেনজরুল আবার পথেনেমে আসেন; অসহযোগ মিছিলের সাথে শহর প্রদক্ষিণ করেন আর গানকরেন, “ভিক্ষাদাও! ভিক্ষা দাও! ফিরে চাও ওগো পুরবাসী”। নজরুলের এসময়কার কবিতা, গান ওপ্রবন্ধের মধ্যে বিদ্রোহের ভাব প্রকাশিত হয়েছে। এরসর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণহচ্ছে বিদ্রোহীনামক কবিতাটি। বিদ্রোহী কবিতাটি ১৯২২খ্রিস্টাব্দেপ্রকাশিত হয় এবং সারা ভারতের সাহিত্য সমাজে খ্যাতিলাভ করে।এই কবিতায়নজরুল নিজেকে বর্ণনা করেন –
    “ আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির গৃহহারা যত পথিকের,
    আমি অবমানিতের মরম বেদনা, বিষ জ্বালা, চির লাঞ্ছিত বুকে গতি ফের
    আমি অভিমানী চির ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়,
    চিত চুম্বন-চোর-কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম প্রকাশ কুমারীর !
    আমি গোপন প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল করে দেখা অনুখন,
    আমি চপল মেয়ের ভালবাসা তার কাকন চুড়ির কন-কন ।
    আমি বসুধা-বক্ষে আগ্নেয়াদ্রি, বাড়ব বহ্নি, কালানল,
    আমি পাতালে মাতাল অগ্নিপাথার কলরোল কলকোলাহল ।
    আমি তড়িতে চড়িয়া উড়ে চলি জোর তুড়ি দিয়া দিয়া লম্ফ,
    আমি ত্রাস সঞ্চারী ভুবনে সহসা সঞ্চারী ভূমিকম্প ।
    আমি চির বিদ্রোহী বীর –
    বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির উন্নত শির !”
    ১৯২২খ্রিস্টাব্দের ১২ই আগস্ট নজরুল ধূমকেতু পত্রিকা প্রকাশ করে। এটিসপ্তাহেদুবার প্রকাশিত হতো। ১৯২০-এর দশকে অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলন একসময়ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এর পরপর স্বরাজ গঠনে যে সশস্ত্রবিপ্লববাদেরআবির্ভাব ঘটে তাতে ধূমকেতু পত্রিকার বিশেষ অবদান ছিল। এইপত্রিকাকেআশীর্বাদ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন,
    কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু, আয় চলে আয়রে ধূমকেতু।
    আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, দুর্দিনের এই দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।
    পত্রিকারপ্রথম পাতার শীর্ষে এই বাণী লিখা থাকতো। পত্রিকার ২৬ সেপ্টেম্বর, ১৯২২সংখ্যায় নজরুলের কবিতা আনন্দময়ীর আগমনে প্রকাশিত হয়। এই রাজনৈতিককবিতাপ্রকাশিত হওয়ায় ৮ নভেম্বর পত্রিকার উক্ত সংখ্যাটি নিষিদ্ধ ঘোষিতহয়। একইবছরের ২৩ নভেম্বর তার যুগবাণী প্রবন্ধগ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করা হয়এবং একইদিনে তাকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তাকেকুমিল্লাথেকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ৭ জানুয়ারিনজরুলবিচারাধীন বন্দী হিসেবে আত্মপক্ষ সমর্থন করে এক জবানবন্দী প্রদানকরেন। চিফপ্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহোর আদালতে এই জবানবন্দীদিয়েছিলেন। তারএই জবানবন্দী বাংলা সাহিত্যে রাজবন্দীর জবানবন্দী নামেবিশেষ সাহিত্যিকমর্যাদা লাভ করেছে। এই জবানবন্দীতে নজরুল বলেছেন:
    আমারউপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দি এবংরাজদ্বারেঅভিযুক্ত।… আমি কবি,আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্তসৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। কবির কণ্ঠে ভগবানসাড়াদেন, আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা ভগবানের বাণী। সেবাণী রাজবিচারেরাজদ্রোহীহতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারে সে বাণী ন্যায়দ্রোহী নয়, সত্যাদ্রোহীনয়। সত্যের প্রকাশ নিরুদ্ধ হবে না। আমার হাতের ধূমকেতু এবারভগবানের হাতেরঅগ্নি-মশাল হয়ে অন্যায় অত্যাচার দগ্ধ করবে…।
    ১৬জানুয়ারি বিচারের পর নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করাহয়।নজরুলকে আলিপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এখানে যখনবন্দীজীবন কাটাচ্ছিলেন তখন (১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি ২২) বিশ্বকবিরবীন্দ্রনাথ তার বসন্ত গীতিনাট্য গ্রন্থটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন। এতে নজরুলবিশেষ উল্লসিত হন। এই আনন্দে জেলে বসে আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কবিতাটিরচনা করেন।
    কাজী নজরুল ইসলাম জনপ্রিয় বাঙালি কবি। তিনি বাংলা ভাষার অন্যতম সাহিত্যিক, দেশপ্রেমী এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি। তাঁর কবিতায় বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাঁকে বিদ্রোহী কবি নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাঁর কবিতার মূল বিষয়বস্তু ছিল মানুষের ওপর মানুষের অত্যাচার এবং সামাজিক অনাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ। তার সব সাহিত্যকর্মে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা ছিল সুস্পষ্ট। তার সাহিত্যকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে ভালবাসা, মুক্তি এবং বিদ্রোহ। ধর্মীয় লিঙ্গভেদের বিরুদ্ধেও তিনি লিখেছেন। ছোট গল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি মূলত কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত। বাংলা কাব্য তিনি এক নতুন ধারার জন্ম দেন। এটি হল ইসলামী সঙ্গীত তথা গজল। এর পাশাপাশি তিনি অনেক উৎকৃষ্ট শ্যামাসংগীত ও হিন্দু ভক্তিগীতিও রচনা করেন। নজরুল প্রায় ৩০০০ গান রচনা এবং অধিকাংশে সুরারোপ করেছেন যেগুলো এখন নজরুল সঙ্গীত বা "নজরুল গীতি" নামে পরিচিত এবং বিশেষ জনপ্রিয়।
    রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল –
    অনেকে অভিযোগ আনয়ন করেন এই মর্মে যে – রবীন্দ্রনাথের সাথে নজরুলের বিরোধ ছিল । কিন্তু বাস্তবিক অর্থে বিরোধ তো দুরের কথা বরং রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে বেশ সম্মোহন করতেন এবং দুই কবির মাঝে বেশ ভাব ছিল । সেটার প্রতিফলন দেখা যায় যখন ধুমকেতু পত্রিকা বের করেন নজরুল তখন । পত্রিকার শুরুতে কবিগুরুর বাণী থাকতো । যেটি ছিল নজরুলের পত্রিকার প্রতি আশীর্বাদ স্বরুপ । বস্তুত ধুমকেতু তখনকার চাওয়া পাওয়া কে ধারন করেই প্রকাশিত হত । কবিগুরু লিখেছেন ধুমকেতুর জন্য –
    কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু, আয় চলে আয়রে ধূমকেতু।
    আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, দুর্দিনের এই দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।
    তাছাড়া আনন্দময়ীর আগমনে কবিতাটি প্রকাশিত হওয়ার পরে নজরুল কে আটক করে ১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলে কবিগুরু নজরুল কে বসন্ত গীতিনাট্য গ্রন্থটি উৎসর্গ করেন। এতে নজরুল খুবই উৎফুল্ল হয়েছিলেন এবং রচনা করেন আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে
    । বস্তুত কবিগুরুর সাথে নজরুলের সম্পর্ক ছিল শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার, রবীন্দ্রনাথ কে পাঠানো নজরুলের তীর্থ পথিক কাব্যে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় এটা -
    তুমি স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, বিস্ময়ের বিস্ময়
    তব গুন গানে ভাষা সুর যেন সব হয়ে যায় লয়
    তুমি স্মরিয়াছ ভক্তের তব, এই গৌরবখানি
    রাখিব কোথায় ভেবে নাহি পাই, আনন্দ মুক বানী ।
    কাব্য লোকের বাণী বিতানের আমি কেও নহি আর
    বিদায়ের পথে তুমি দিলে তবু কেন এ আশিস হার
    প্রাথনা মোর যদি আবার জন্মি এ ধরণীতে
    আসি যেন গাহন করিতে তোমার কাব্য-গীতে ।
    কারাগারে কবির অনশন ভাঙ্গানোর জন্য রবীন্দ্রনাথ নজরুল কে লিখেছেন –
    “Give us hunger strike, our literature claims you”
    পত্রের উত্তরে নজরুল লিখেছেন- আদর্শবাদীকে আদর্শ ত্যাগ করতে বললে তাকে হত্যা করার ই শামিল । অনশনে যদি কাজীর মৃত্যুও ঘটে তাহলে ও তার অন্তরে সত্য আদর্শ চিরদিন মহিমাময় হয়ে থাকবে ।
    তাছাড়া নজরুলের কৈশোর রবি ও অশ্রু পুষ্পাঞ্জলি কবিতা দুইটি কবিগুরুকে শ্রদ্ধা নিবেদন করে লেখা । গোরা ছবিতে রবীন্দ্র সঙ্গীত আপত্তি তুললে নজরুল কবিগুরুর কাছে গিয়েছিলেন, কবিগুরু তাকে বললেন আমার গান তোমার চাইতে কি ওরা ভাল বুঝবে ... রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে শোকাবহ ভারতবর্ষকে সান্ত্বনা দিতে তিনি রচনা করেছেন –
    “ঘুমাইতে দাও, শান্ত রবিরে জাগায়োনা ।
    সারা জীবন যে আলো দিল ঢেকে তার ঘুম ভাঙ্গায়োনা ।
    রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুল ইসলামের আন্তরিক সম্পর্ক অটুট থাকুক এটা মৌলবাদী মুসলমানরা যেমন চাননি, তেমনি চাননি মৌলবাদী হিন্দুরাও। দু’জনের সম্পর্কের মধ্যে ফাটল ধরাবার জন্য দু’পক্ষ থেকেই নানা ধরনের সমালোচনা, আক্রমণ ও ষড়যন্ত্র অবিরামভাবে চলে আসছিল। ধর্ম যাদের কাছে মুখ্য তাঁরা যে সাহিত্যের মর্মমূলে প্রবেশ করার যোগ্যতা বা অধিকার রাখেন না, তা রবীন্দ্রনাথ যেমন জানতেন, তেমনই জানতেন নজরুলও। তাই তাঁরা মানবিকতার সাধনাই করে গেছেন চিরকাল।
    বিদ্রোহী (কবিতা)
    কাজী নজরুল ইসলাম (মে ২৪, ১৮৯৯ – আগস্ট ২৯, ১৯৭৬)
    বিদ্রোহী বাংলা ভাষার বিখ্যাত কবিতাসমূহের একটি। এটি কাজী নজরুল ইসলাম বিরচিত। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে, বিজলী পত্রিকায়। এরপর প্রকাশিত হয় মাসিক প্রবাসী, মাসিক সাধনা এবং ধূমকেতু পত্রিকায়। প্রকাশিত হওয়া মাত্রই এটি ব্যাপক জাগরণ সৃষ্টি করে। দৃপ্ত বিদ্রোহী মানসিকতা এবং অসাধারণ শব্দবিন্যাস ও ছন্দের জন্য আজও বাঙালি মানসে কবিতাটি "চির উন্নত শির" বিরাজমান।
    বল বীর-
    বল উন্নত মম শির!
    শির নেহারী' আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রীর!
    বল বীর-
    বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি'
    চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারা ছাড়ি'
    ভূলোক দ্যূলোক গোলোক ভেদিয়া
    খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া,
    উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর!
    মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!
    বল বীর-
    আমি চির-উন্নত শির! আমি চিরদুর্দম, দূর্বিনীত, নৃশংস,
    মহাপ্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!
    আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর,
    আমি দূর্বার,
    আমি ভেঙে করি সব চুরমার!
    আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
    আমি দ’লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল!
    আমি মানি না কো কোন আইন,
    আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন!
    আমি ধূর্জটী, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর
    আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সুত বিশ্ব-বিধাতৃর!
    বল বীর-
    চির-উন্নত মম শির! আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণি,
    আমি পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি’।
    আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,
    আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ।
    আমি হাম্বীর, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল,
    আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি’ ছমকি’
    পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’
    ফিং দিয়া দেই তিন দোল্‌;
    আমি চপোলা-চপোল হিন্দোল।
    আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা’,
    করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা,
    আমি উন্মাদ, আমি ঝঞ্ঝা!
    আমি মহামারী, আমি ভীতি এ ধরীত্রির;
    আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ণ চির অধীর।
    বল বীর-
    আমি চির-উন্নত শির! আমি চির-দূরন্ত দুর্মদ
    আমি দূর্দম মম প্রাণের পেয়ালা হর্দম্‌ হ্যায় হর্দম্‌ ভরপুর্‌ মদ। আমি হোম-শিখা, আমি সাগ্নিক জমদগ্নি,
    আমি যজ্ঞ, আমি পুরোহিত, আমি অগ্নি।
    আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শ্মশান,
    আমি অবসান, নিশাবসান। আমি ঈন্দ্রাণী-সুত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য
    মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ তূর্য; আমি কৃষ্ণ-কন্ঠ, মন্থন-বিষ পিয়া ব্যথা বারিধির।
    আমি ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর।
    বল বীর-
    চির-উন্নত মম শির! আমি সন্ন্যাসী, সুর সৈনিক,
    আমি যুবরাজ, মম রাজবেশ ম্লান গৈরিক।
    আমি বেদুইন, আমি চেঙ্গিস,
    আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কূর্ণিশ।
    আমি বজ্র, আমি ঈষাণ-বিষানে ওঙ্কার,
    আমি ইস্রাফিলের শৃঙ্গার মহা-হুঙ্কার,
    আমি পিনাক-পাণির ডমরু ত্রিশুল, ধর্মরাজের দন্ড,
    আমি চক্র-মহাশঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ প্রচন্ড!
    আমি ক্ষ্যাপা দুর্বাসা, বিশ্বামিত্র-শিষ্য,
    আমি দাবানল-দাহ, দহন করিব বিশ্ব।
    আমি প্রাণ-খোলা হাসি উল্লাস, -আমি সৃষ্টি-বৈরী মহাত্রাস
    আমি মহাপ্রলয়ের দ্বাদশ রবির রাহু-গ্রাস!
    আমি কভু প্রশান্ত, -কভু অশান্ত দারুণ স্বেচ্ছাচারী,
    আমি অরুণ খুনের তরুণ, আমি বিধির দর্পহারী!
    আমি প্রভঞ্জনের উচ্ছাস, আমি বারিধির মহাকল্লোল,
    আমি উজ্জ্বল, আমি প্রোজ্জ্বল,
    আমি উচ্ছল জল-ছল-ছল, চল ঊর্মির হিন্দোল-দোল!- আমি বন্ধনহারা কুমারীর বেনী, তন্বী নয়নে বহ্নি,
    আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম উদ্দাম, আমি ধন্যি! আমি উন্মন, মন-উদাসীর,
    আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা-হুতাশ আমি হুতাশীর।
    আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির গৃহহারা যত পথিকের,
    আমি অবমানিতের মরম-বেদনা, বিষ-জ্বালা, প্রিয় লাঞ্ছিত বুকে গতি ফের
    আমি অভিমানী চির ক্ষূব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যাথা সূনিবিড়,
    চিত চুম্বন-চোর-কম্পন আমি থর থর থর প্রথম পরশ কুমারীর!
    আমি গোপন-প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল ক’রে দেখা অনুখন,
    আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তাঁর কাঁকণ-চুড়ির কন্‌-কন্‌।
    আমি চির শিশু, চির কিশোর,
    আমি যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচর কাঁচুলি নিচোর!
    আমি উত্তর-বায়ু মলয়-অনিল উদাস পূরবী হাওয়া,
    আমি পথিক-কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীণে গান গাওয়া।
    আমি আকুল নিদাঘ-তিয়াসা, আমি রৌদ্র-রুদ্র রবি
    আমি মরু-নির্ঝর ঝর-ঝর, আমি শ্যামলিমা ছায়াছবি!
    আমি তুরীয়ানন্দে ছুটে চলি, এ কি উন্মাদ আমি উন্মাদ!
    আমি সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ! আমি উত্থান, আমি পতন, আমি অচেতন চিতে চেতন,
    আমি বিশ্বতোরণে বৈজয়ন্তী, মানব-বিজয়-কেতন।
    ছুটি ঝড়ের মতন করতালী দিয়া
    স্বর্গ মর্ত্য-করতলে,
    তাজী বোর্‌রাক্‌ আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার
    হিম্মত-হ্রেষা হেঁকে চলে! আমি বসুধা-বক্ষে আগ্নেয়াদ্রী, বাড়ব বহ্নি, কালানল,
    আমি পাতালে মাতাল, অগ্নি-পাথার-কলরোল-কল-কোলাহল!
    আমি তড়িতে চড়িয়া, উড়ে চলি জোড় তুড়ি দিয়া দিয়া লম্ফ,
    আমি ত্রাস সঞ্চারি’ ভুবনে সহসা, সঞ্চারি ভূমিকম্প। ধরি বাসুকির ফণা জাপটি’-
    ধরি স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি’। আমি দেবশিশু, আমি চঞ্চল,
    আমি ধৃষ্ট, আমি দাঁত দিয়া ছিঁড়ি বিশ্ব-মায়ের অঞ্চল!
    আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী,
    মহা-সিন্ধু উতলা ঘুম্‌ঘুম্‌
    ঘুম্‌ চুমু দিয়ে করি নিখিল বিশ্বে নিঝ্‌ঝুম
    মম বাঁশরীর তানে পাশরি’।
    আমি শ্যামের হাতের বাঁশরী। আমি রুষে উঠে যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া,
    ভয়ে সপ্ত নরক হাবিয়া দোযখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া!
    আমি বিদ্রোহ-বাহী নিখিল অখিল ব্যাপিয়া! আমি শ্রাবণ-প্লাবন-বন্যা,
    কভু ধরনীরে করি বরণীয়া, কভু বিপুল ধ্বংস ধন্যা-
    আমি ছিনিয়া আনিব বিষ্ণু-বক্ষ হইতে যুগল কন্যা!
    আমি অন্যায়, আমি উল্কা, আমি শনি,
    আমি ধূমকেতু জ্বালা, বিষধর কাল-ফণী!
    আমি ছিন্নমস্তা চন্ডী, আমি রণদা সর্বনাশী,
    আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি! আমি মৃন্ময়, আমি চিন্ময়,
    আমি অজর অমর অক্ষয়, আমি অব্যয়!
    আমি মানব দানব দেবতার ভয়,
    বিশ্বের আমি চির-দুর্জয়,
    জগদীশ্বর-ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য,
    আমি তাথিয়া তাথিয়া মাথিয়া ফিরি স্বর্গ-পাতাল মর্ত্য!
    আমি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!!
    আমি সহসা আমারে চিনেছি, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!! আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার,
    নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!
    আমি হল বলরাম স্কন্ধে,
    আমি উপাড়ি' ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে। মহা- বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
    আমি সেই দিন হব শান্ত,
    যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
    অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না -
    বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
    আমি আমি সেই দিন হব শান্ত!
    আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,
    আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ-হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব-ভিন্ন!
    আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন!
    আমি খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন! আমি চির-বিদ্রোহী বীর -
    আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!
    নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় তিনি বলেছেন-আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন/আমি স্রষ্টাসূদন শোক তাপহীন খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন।’ তাঁর এই বিদ্রোহের মূলেই ছিল মানবপ্রেম, স্বদেশপ্রীতি ও সাম্যবাদী মনোভাব।
    নজরুল যখন ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনা করেন তখন তাঁর বয়স ২৩ বছর। কবিতাটির ভাষা, ছন্দ, উপস্থাপন ভঙ্গি এবং মিথ-এর ব্যবহার ছিল এককথায় অনন্য; চর্যাপদ থেকে শুরু করে প্রায় হাজার বছরের বাংলা কবিতার ইতিহাসে এমন তেজদ্দীপ্ত কবিতা আর একটিও লেখা হয়নি। এই কবিতার আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল এর অসাম্প্রদায়িক চরিত্র। ভারতীয় ও গ্রিক পুরাণের পাশাপাশি কবিতাটিতে ইসলামী ঐতিহ্যের সমান্তরাল ব্যবহার হয়েছে। কবিতায় যেভাবে ভগবানের বুকে পদচিহ্ন এঁকে দেওয়া কিংবা খোদার আসন আরশ ছেদিয়া উঠবার ঘোষণা এসেছে, তাতে তাঁকে ধর্মনিরোপেক্ষ বা ছিদ্রান্বেষীদের ভাষায় বলতে গেলে ধর্মদ্রোহী হিসোবে শনাক্ত করা চলে। বিশ শতকের শুরুর সেই সময়ে বাংলাদেশের কোনো ঘোষিত নাস্তিকও এতটা বলার সাহস দেখায়নি। নজরুলকে নাস্তিক হিসাবে শনাক্ত করা চলে না। তাঁর অসংখ্য লেখা থেকে এবং ব্যক্তিগত আচরণ থেকে প্রমাণ দেওয়া যায় যে, সৃষ্টিকর্তায় তাঁর বিশ্বাস ছিল। তবে সে বিশ্বাস যে আর দশজন মুসলমানের মতো ছিলা না, তা এক প্রকার নিশ্চিত করে বলা যায়। নইলে বিশ শতকের ভারতবর্ষে তিনি ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো মুসলমান ছিল কি না সন্দেহ, যিনি নিঃসংকোচে ঘোষণা দিতে পারেন, তাঁর মনের দোতারায় একটি তার শ্যামের এবং আরেকটি শ্যামার! তাঁর এই ঘোষণা নিছক কথার কথা ছিল না, বস্তুত তিনি একই হাতে এতো উৎকৃষ্ট শ্যামা সংগীত এবং শ্রীকৃষ্ণের ভজন লিখেছেন যে, শ্যামা কিংবা শ্যামের আজন্ম কোনো বাঙালি ভক্তও তা পারেননি। একটি গানে তিনি লিখেছেন, ‘শ্যামা মায়ের কোলে চড়ে জপি আমি শ্যামের নাম/ মা হলেন মোর মন্ত্রগুরু ঠাকুর হলেন রাধেশ্যাম।’
    কাজী নজরুল ইসলাম যদিও আমাদের জাতীয় কবি তারপরও তাকে নিয়ে আমাদের সাহিত্য সমালোচকদের উদ্দীপনা কম লক্ষ্য করা যায়। তার কবিতার যত না ভক্ত তার চেয়ে বেশি ভক্ত তার অসাম্প্রদায়িকতার। এবং তাকে সেভাবেই পরিচিত করা হয়। কিন্তু তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তিনি প্রমাণ করেছেন একমাত্র কবিরাই নির্ভীক চিত্তে অসুরের সামনে দাঁড়িয়ে সত্য কথাটি বলতে পারে। কাজী নজরুল ইসলাম সেই কবি যার মাত্র একটা কবিতার (আনন্দময়ীর আগমন) জন্য তাকে রাষ্ট্রদোহী মামলায় এক বছরের জন্য জেলে দেয় ব্রিটিশ সরকার। শুধু তাই নয়, তিনি সেই কবি যিনি শুধু রাজনৈতিক বন্দির মর্যাদার জন্য ৩৯ দিন অনশন পালন করেন। তিনি দেখিয়ে দিয়ে গেছেন কবিদের যুদ্ধ করার জন্য বারুদ লাগে না, তাদের কবিতার একটি পঙ্ক্তিই অত্যাচারীকে টলোমলো করে দিতে যথেষ্ট। কিন্তু এখন? কোথায় সে কবি?
    কাজী নজরুল ইসলাম এর ধর্ম বিশ্বাস
    কাজী নজরুল ইসলাম এর ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। নজরুল অসংখ্য হামদ, নাত লিখেছেন; সাথে সাথে হিন্দু ধর্ম নিয়ে অসংখ্য কবিতা, গান লিখেছেন। তাই অনেকে সন্দেহ পোষণ করেন, উনি প্রকৃতই হিন্দু ধর্ম বিশ্বাস করতেন কিনা? নিজেরা ব্যাখ্যা দেবার আগে সবচেয়ে ভালো হয় নজরুল এ বিষয়ে কী বলেছেন সেটা পর্যালোচনা করা। কেউ কোনো সাহিত্য রচনা করে থাকলে সে বিষয়ে তিনি কি বলেছেন সেই ব্যাখ্যাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য। সেই ব্যাখ্যার দ্বারা যদি প্রমাণিত হয় সেটা ইসলাম-বিরোধী তাহলে অবশ্যই সেটা ইসলাম-বিরোধী।
    কালী পূজা
    অনেকে অভিযোগ করে থাকেন নজরুল কালি পূজা করেছেন এবং অভিযোগটা আসে মুসলিমদের থেকেই। ‘অতীত দিনের স্মৃতি’ বই এর ৪২ পৃষ্ঠায় লেখক নিতাই ঘটক উল্লেখ করেছেন, “সীতানাথ রোডে থাকাকালীন কবিকে হিন্দুশাস্ত্র বিশেষভাবে চর্চা করতে দেখেছি। অনেকে বলেন কালীমূর্তি নিয়ে কবি মত্ত হয়েছিলেন- একথা ঠিক নয়। আমি কখনো তাঁকে এভাবে দেখিনি।” হিন্দুরাই বলছেন নজরুল পূজা করেননি, যদিও সেটা হয়ে থাকলে হিন্দুদেরই খুশী হবার কথা ছিল বেশী। এখানে একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য; তা হোলো, হিন্দুধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করা আর কালীপূজা করা এক জিনিস নয়।
    হিন্দু ধর্ম বিষয়ক লেখা
    এখন আমরা দেখব নজরুল হিন্দু ধর্ম বিষয়ক কবিতা, গান কেনো লিখেছিলেন। নজরুল বলেছেন, “আমি হিন্দু-মুসলমানের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী। তাই তাদের কুসংস্কারে আঘাত হানার জন্যই মুসলমানী শব্দ ব্যবহার করি, বা হিন্দু দেব-দেবীর নাম নিই। অবশ্য এর জন্য অনেক জায়গায় আমার সৌন্দর্যের হানি হয়েছে। তবু আমি জেনে শুনেই তা করেছি।” [শব্দ-ধানুকী নজরুল ইসলাম, শাহাবুদ্দিন আহমদ, পৃষ্ঠা ২৩৬,২৩৭]
    এখানে নজরুল স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন হিন্দু মুসলমানের মিলনের জন্য তিনি এ কাজ করেছেন। তখনকার রাজনৈতিক আবহাওয়া সম্বন্ধে যাদের ধারণা আছে তারা জানেন কি প্রচণ্ড হিন্দু মুসলিম বিরোধ তখন বিরাজমান ছিল।
    ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ই ডিসেম্বর রবিবার কলিকাতা এলবার্ট হলে বাংলার হিন্দু-মুসলমানের পক্ষ থেকে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বিপুল সমারোহ ও আন্তরিকতা সহকারে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। সেখানে তিনি বলেন, “কেউ বলেন, আমার বাণী যবন, কেউ বলেন, কাফের। আমি বলি ও দুটোর কিছুই নয়। আমি শুধুমাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি। [নজরুল রচনাবলী – ৮, পৃষ্ঠা ৩, ৫]
    ধর্মবিশ্বাস
    কেউ হয়ত বলবেন, হিন্দু মুসলিম এর মিলনের জন্য উনি না হয় এমন লিখেছেন, কিন্তু এতে প্রমাণিত হয়না যে তিনি ইসলাম ধর্ম বিশ্বাস করতেন। হ্যাঁ কথা ঠিক। এর উত্তর নজরুল দিয়েছেন তাঁর ‘আমার লীগ কংগ্রেস’ প্রবন্ধের ৬১ পৃষ্ঠায় “আমার আল্লাহ নিত্য-পূর্ণ -পরম- অভেদ, নিত্য পরম-প্রেমময়, নিত্য সর্বদ্বন্দ্বাতীত। ‘ইসলাম’ ধর্ম এসেছে পৃথিবীতে পূর্ণ শান্তি সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে – কোরান মজিদে এই মাহাবাণীই উত্থিত হয়েছে। ···এক আল্লাহ ছাড়া আমার কেউ প্রভূ নাই। তাঁর আদেশ পালন করাই আমার একমাত্র মানবধর্ম। আল্লাহ লা-শরিক, একমেবাদ্বিতীয়ম। আল্লাহ আমার প্রভু, রসূলের আমি উম্মত, আল-কোরআন আমার পথ-প্রদর্শক। আমার কবিতা যাঁরা পড়ছেন, তাঁরাই সাক্ষী: আমি মুসলিমকে সঙ্ঘবদ্ধ করার জন্য তাদের জড়ত্ব, আলস্য, কর্মবিমূখতা, ক্লৈব্য, অবিশ্বাস দূর করার জন্য আজীবন চেষ্টা করেছি।”
    ১৯৪০ সালে কলিকাতায় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতিরি ঈদ-সম্মেলনে প্রদত্ত সভাপতির অভিভাষণ নজরুল বলেছিলেন, “ইসলাম জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম বলে সকলের শ্রদ্ধা অর্জন করতে পেরেছে।" [নজরুল রচনাবলী – (৭) পৃষ্ঠা ৩৩]
    এই লেখার মাধ্যমে নজরুল নিজেকে মুসলমান হিসেবে প্রকাশ করেছেন।
    ইসলামের পক্ষে কলম পরিচালনা করা
    মৌলভী তরিকুল আলম কাগজে এক প্রবন্ধ লিখে বললেন কোরবানীতে অকারণে পশু হত্যা করা হয়; এমন ভয়াবহ রক্তপাতের কোনো মানে নাই। নজরুল তার জওয়াবে লিখলেন ‘কোরবানী’ কবিতা। তাতে তিনি বললেন-
    ওরে, হত্যা নয়, এ সত্যগ্রহ শক্তির উদ্বোধন,
    দুর্বল ভীরু চুপ রহো, ওহো খামখা ক্ষুদ্ধ মন।
    …..এই দিনই মীনা ময়দানে
    …..পুত্র স্নেহের গর্দানে
    ……ছুরি হেনে খুন ক্ষরিয়ে নে
    রেখেছে আব্বা ইবরাহীম সে আপনা রুদ্র পণ,
    ছি,ছি, কেঁপো না ক্ষুদ্র মন।
    [নজরুল স্মৃতিচারণ, নজরুল একাডেমী পৃষ্ঠা ৪৩৯ ]
    ইসলামের বিপক্ষে আক্রমণ হলে সেটার প্রতিবাদস্বরূপ নজরুল কবিতা লিখেছিলেন। ব্যাপারটা বিস্ময়ের বৈকি। যে কবিকে “কাফের” ফতোয়া দেয়া হয়েছে তিনি-ই কিনা ইসলামের পক্ষে কলম ধরেছেন!!!
    মুসলমানের সমালোচনা করে কবিতা লিখা
    আরো একটি অভিযোগ করা হয়, সেটা হোলো নজরুল আলেমদের সমালোচনা করেছেন, যেমন:
    মৌ-লোভী যত মোলভী আর মোল্লারা কন হাত নেড়ে
    দেব-দেবী নাম মুখে আনে সবে তাও পাজীটার যাত মেড়ে।
    এখানে মৌলভীদের নজরুল “মৌ লোভী” বলেছেন। যারা এতে অসন্তুষ্ট তাদের এই কবিতাটা হয়ত নজরে পড়েনি:
    শিক্ষা দিয়ে দীক্ষা দিয়ে
    …. ঢাকেন মোদের সকল আয়েব
    পাক কদমে সালাম জানাই
    ….নবীর নায়েব, মৌলভী সাহেব।
    এখানে মৌলভী সাহেবদের নজরুল সালাম জানিয়েছেন। দুটোর মধ্যে আসলে কোনো বিরোধ নেই। বর্তমান সমাজে এটাই বাস্তব। আলেমদের মধ্যেও ভালো-খারাপ দু-ধরণের পরিস্হিতি বিদ্যমান। দুটোই নজরুল ফুটিয়ে তুলেছেন। আর মুসলমানদের দোষ-ত্রুটি থাকলে সেটা বলার মধ্যে দোষের কিছু নেই। ইব্রাহিম খাঁ-র চিঠির জবাবে নজরুল সেটাই বলেছেন, “যাঁরা মনে করেন-আমি ইসলামের বিরুদ্ধবাদী বা তার সত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছি, তাঁরা অনর্থক এ ভুল করেন। ইসলামের নামে যে সব কুসংস্কার মিথ্যা আবর্জনা স্তুপীকৃত হয়ে উঠেছে তাকে ইসলাম বলে না মানা কি ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযান? এ ভুল যাঁরা করেন, তাঁরা যেন আমার লেখাগুলো মন দিয়ে পড়েন দয়া করে-এ ছাড়া আমার আর কি বলবার থাকতে পারে?” [ইসলাম ও নজরুল ইসলাম, শাহাবুদ্দিন আহমেদ, পৃষ্ঠা ৯৫]
    আরো একটি অভিযোগ
    অনেকে আরো একটি অভিযোগ করেন, নজরুল প্রথম দিকে হিন্দুদের খুশী করার জন্য হিন্দু ধর্ম নিয়ে কবিতা লিখেছেন, পরবর্তীতে মুসলমানদের খুশী করার জন্য ইসলাম বিষয়ক কবিতা লিখেছেন। বিষয়টি তথ্য বিভ্রাট ছাড়া আর কিছু নয়। নজরুলের প্রথম কাব্যগ্রন্হ অগ্নিবীণা-য় ১২টি কবিতার মধ্যে ৭টি কবিতা ইসলাম-বিষয়ক। নজরুল তাঁর সমগ্র জীবনে ছিলেন অকুতোভয়। জীবনে কখনও তিনি কাউকে খুশী করার জন্য বা কাউকে ভয় করার কারণে সত্য গোপন করেননি। সুতরাং হিন্দুদের খুশী করার জন্য নিজের নীতি বিসর্জন দিবেন এটা চিন্তাই করা যায় না।
    মুজাফফর আহমদ ও নজরুল
    নজরুলের তরুণ জীবনের কমুনিস্ট হয়ে যাওয়া বন্ধু কমরেড মুজাফফর আহমদ তাঁকে কমুনিজমে নিতে ব্যর্থ হন। তাঁর স্বপ্ন সফল হয়নি। ১৯৬৬ খৃস্টাব্দের ২রা আগস্ট কবি আবদুল কাদিরের কাছে লেখা এক চিঠির শেষে তিনি লিখেছেন,
    "নজরুল যে আমার সঙ্গে রাজনীতিতে টিকে রইল না; সে যে আধ্যাত্নিক জগতে প্রবেশ করল তার জন্যে অবশ্য আমার মনে খেদ নেই। যদিও আমি বহু দীর্ঘ বৎসর অনুপস্থিত ছিলেম তবুও আমার মনে হয় আমি হেরে গেছি।"
    তিনি আরো বলেছেন, "আমি তাকে যত বড় দেখতে চেয়েছিলেম তার চেয়েও সে অনেক, অনেক বড় হয়েছে।"
    (নজরুল একাডেমী পত্রিকাঃ ৪র্থ বর্ষঃ ১ম সংখ্যাঃ পৃষ্ঠাঃ ১৬৪)
    এরপরও অনেকে থাকবে যারা বিদ্বেষ ছড়াবে, তাদের সম্বন্ধে নজরুল বলেছেন:
    উহারা প্রচার করুক হিংসা বিদ্বেষ আর নিন্দাবাদ
    আমরা বলিব, “সাম্য শান্তি এক আল্লাহ জিন্দাবাদ।”
    নজরুলের কিছু ইসলাম বিষয়ক কবিতা
    বিষয়: ইসলাম
    আল্লাহ আমার প্রভু, আমার নাহি নাহি ভয়
    আমার নবী মোহাম্মদ, যাহার তারিফ জগৎময়।
    আমার কিসের শঙ্কা,
    কোরআন আমার ডঙ্কা,
    ইসলাম আমার ধর্ম, মুসলিম আমার পরিচয়।
    কলেমা আমার তাবিজ, তৌহীদ আমার মুর্শিদ
    ঈমান আমার বর্ম, হেলাল আমার খুর্শিদ।
    ‘আল্লাহ আক্‌বর’ ধ্বনি
    আমার জেহাদ বাণী
    আখের মোকাম ফেরদৌস্‌ খোদার আরশ যেথায় রয়
    আল্লাহ আমার প্রভু, আমার নাহি নাহি ভয়।
    বিষয়: রিজিক
    আহার দিবেন তিনি, রে মন
    জীব দিয়েছেন যিনি
    তোরে সৃষ্টি করে তোর কাছে যে
    আছেন তিনি ঋণী।
    বিষয়: রেসালত
    চলে আন্‌জাম
    দোলে তান্‌জাম
    খোলে হুর পরী মরি ফিরদৌসের হাম্মাম!
    টলে কাঁখের কলসে কওসর ভর, হাতে ‘আব্‌-জম-জম্‌-জাম্‌’।
    শোন্‌ দামাম কামান্‌ তামাম্‌ সামান্‌
    নির্ঘোষি কার নাম
    পড়ে ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহে সাল্‌লাম!’
    বারেক মুখে নিলে যাঁহার নাম
    চিরতরে হয় দোজখ্‌ হারাম,
    পাপীর তরে দস্তে যাহার, কওসরের পিয়ালা
    হের আজ আরশে এলেন মোদের নবী কম্‌লীওয়ালা।
    বিষয়: কালেমা শাহাদত
    এসমে আজম হ’তে কদর ইহার,
    পায় ঘরে ব’সে খোদা আর রসুলের দীদার
    তাহার হ্রদয়াকাশে
    সাত বেহেশ্‌ত ভাসে
    খোদার আরশে হয় আখেরে গতি
    কলেমা শাহাদাতে আছে খোদার জ্যোতি
    ঝিনুকের বুকে লুকিয়ে থাকে যেমন মোতি।
    বিষয়: কোরবানী
    আল্লার নামে, ধর্মেরও নামে, মানব জাতির লাগি
    পুত্রেরে কোরবানী দিতে পারে, আছে কেউ হেন ত্যাগী?
    সেই মুসলিম থাকে যদি কেউ, তসলিম কবি তারে,
    ঈদগাহে গিয়া তারি সার্থক হয় ডাকা আল্লারে।
    অন্তরে ভোগী বাইরে যে যোগী, মুসলমান সে নয়,
    চোগা চাপাকানে ঢাকা পড়িবে না সত্য সে পরিচয়!
    বিষয়: জাকাত
    দে জাকাত, দে জাকাত, তোরা দে রে জাকাত
    দিল্‌ খুলবে পরে – ওরে আগে খুলুক হাত।
    বিষয়: আরাফাত ময়দান
    দুখের সাহারা পার হ’য়ে আমি
    চলেছি কাবার পানে
    পড়িব নামাজ মারেফাতের
    আরাফাত ময়দানে।
    বিষয়: বেহেশত
    সেথা হর্দম খুশির মৌজ,
    তীর হানে কালো আখির ফৌজ,
    পায়ে পায়ে সেথা আর্জি পেশ,
    দিল চাহে সদা দিল্‌-আফরোজ,
    পিরানে পরান বাধা সেথায়
    আয়, বেহেশতে কে যাবি, আয়।
    বিষয়: জাগরণমূলক কবিতা
    মোরা আসহাব কাহাফের মত
    হাজারো বছর শুধু ঘুমাই,
    আমাদের কেহ ছিল বাদশাহ
    কোনো কালে তারি করি বড়াই,
    জাগি যদি মোরা, দুনিয়া আবার
    কাঁপিবে চরণে টালমাটাল
    দিকে দিকে পুন জ্বলিয়া উঠেছে
    দ্বীন ই ইসলামি লাল মশাল।
    কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ডিসেম্বর ‘নজরুল সংবর্ধনা সমিতি’ কাজী নজরুল ইসলামকে ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে ভূষিত করে। স্বাধীন বাংলার জনগণও তাঁকে যে জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়েছে, তাতে নিঃসন্দেহে বাঙ্গালি জাতি সমগ্র বিশ্বে মর্যাদার আসনে উন্নীত হয়েছে। নজরুল একাধারে কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক; গীতিকার, সুরকার, সাংবাদিক, সম্পাদক, চলচ্চিত্র পরিচালনা ও অভিনেতা হলেও তাঁর প্রধান পরিচয়- তিনি কবি। বহুমাত্রিক রচনা শৈলীর মাধ্যমে নজরুল বাংলা সাহিত্যের এক অন্যতম আবিষ্কার। রবীন্দ্র সাহিত্য যুগ থেকে বের হয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ আলাদা ভাবে প্রকাশ করার কাজে সফল যে কয়েকজন লেখক রয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম দুখু মিয়া খ্যাত নজরুল। জীবনের যে অবস্থান থেকে তিনি বাংলা সাহিত্যকে ঢেলে দিয়েছেন তা-ই আজ তাকে মহান করে তুলেছে। ঠিক সেই অবস্থানে থেকেও জীবন, সমাজ ও রাষ্টকে তিনি উপলব্ধি করেছেন অতি কাছে থেকে যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রায় বিরল। দুখের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে তিনি অঙ্কন করেছেন রাজাসন; দুখের রাজ্যে বাস করে মনকে করেছেন বিশাল অট্টালিকা। (যেখানে আজ আশ্রয় নিতে চায় দিকভ্রান্ত সভ্যতা।) বিংশ শতকের বিশের দশকে বাংলার সংবাদ, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক এমনকি রাজনৈতিক জগতে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের কেবল একজন কবি বা সাহিত্যিক বা গীতিকার নন, ক্রমে আজ একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ লাভ করেছে।
    কাজী নজরুল ইসলাম সাম্যের কবি। নজরুল সমসাময়িক সাহিত্য পরিসরে বিভিন্ন ধর্মের কৃষ্টি কালচার সম্পর্কে অবগত থেকে সাহিত্য চর্চা এবং সাম্যবাদের চেতনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহার করতে খুব কম সাহিত্যিককেই দেখা গেছে। অথবা এটা বলা সমীচীন হবে রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্র প্রভাবে প্রভাবিত কবিদের রচনায় যেখানে প্রেম প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতা প্রবল ভাবে উঠে এসেছে সেখানে কাজী নজরুল ইসলাম কেবল এসবের বা ভৌগোলিক স্বরূপের রূপায়ন না করে তাঁর সাহিত্যে সমাজ রাষ্ট্র ও ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় রীতিনীতিকে গভিরভাবে উপলব্দি করেছেন। আর সাহিত্যে অতিযতেœর সহিত স্থান করে দিয়েছেন সেসবের মূল উপাদান। তাতে করে তাঁর বিশ্বাসকে সুনির্দিষ্ট করে না বলা গেলেও প্রত্যেকটি ধর্মের মূল সুর যে কি ছিল তা সহজেই অনুমান করা যায়। তিনি যখন মুসলিম ঐহিত্য নিয়ে কোন কিছু রচনা করেছেন ঠিক সে সময়েই অন্যত্র লিখেছেন হিন্দু ঐহিত্য নিয়ে। অর্থাৎ এই মহাদেশের হিন্দু এবং মুসলিম এই দুটি ধর্মের মেল বন্ধন রচনা করার ক্ষেত্রে নজরুলের এই ভিন্নতর প্রচেষ্টাই তাঁর সাহিত্যের অন্যতম মূল সূর। সাহিত্যের আদি যুগ থেকে হিন্দু মুসলিম মিলনের কথা যে কেবল নজরুলের মাধ্যমেই এসেছে তা নয়। তাঁর পূর্বেও বহু সাহিত্যিকের মাধ্যমে (মীর মশাররফ হোসেন এর প্রবন্ধ ‘গো জীবন’, কায়কোবাদ এর মহাকাব্য ‘মহাশ্মশান’, শ্যামা-সঙ্গীত, বৈষ্ণব-পদ ও রচিত হয়েছে) এসব বিষয় এসেছে তবে নজরুল ইসলাম সাম্যবাদের মাধ্যমে তাঁর এই দাবিকেই যেভাবে প্রধান আসনে স্থান দিয়েছেন সেভাবে কখনোই তা প্রাধান্যতা পায় নি।
    সাম্য শব্দের অর্থ সমতা। বিভিন্ন ধর্মের বিষয়গুলোকে কবি যেভাবে নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দিয়ে তাঁর সাহিত্যে ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করেছেন কেবল সেই জন্য তাঁকে সাম্যের কবি হিসেবে চিন্তা করা বাতুলতা হবে। প্রত্যেকটি ধর্মেরই নিজস্ব ভিত্তি রয়েছে। নিজস্ব বিশ্বাস ও নিয়মনীতির উপরে প্রতিষ্ঠিত সবগুলো ধর্মকে একটি Plat form এ নিয়ে আসা যে শূন্য হাতে পর্বতারোহনের মতো তা বর্তমান প্রেক্ষাপটে খুবই স্পষ্ট। যেখানে-
    হিন্দু ধর্মের রয়েছে তেত্রিশ লক্ষ দেব-দেবী। প্রত্যেকটি দেবতাই যাদের কাছে সমান পূজনীয় ও ক্ষমতাধর পক্ষান্তরে মুসলিম স¤প্রদায় বিশ্বাস করে ‘কালেমা শাহাদাত আসহাদু আল্লা-ইলাহা ইল্লালাহু লা শরিকালাহু..।’ ইসলামের মূল নীতিগুলোর সাথে হযরত ঈসা আ. এর অনুসারী খ্রিস্টান স¤প্রদায়ের কিছু কিছু দিক দিয়ে মিল থাকলেও কয়েকটি বড় রকমের মতভেদ এই দুটি ধর্মকে আলাদা করে রেখেছে। খ্রিস্টানদের বিশ্বাস আদি পিতা হযরত ইব্রাহিম আ.’র ছেলে হযরত ইসহাক আ. কে কুরবানির জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আর ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা বিশ্বাস করে দ্বিতীয় স্ত্রী বিবি হাজেরা আ.’র ছেলে হযর ইসমাইল আ.'কে। এবং রোজ কেয়ামতে ইসলামের অনুসারীদের সুপারিশকারী হবেন হযরত মুহাম্মদ (সা) আর খ্রিস্টানদের হযরত ঈসা (আ যাকে তারা যিশু খ্রিষ্ট বলে সম্ভোধন করে।
    এভাবে প্রতিটি ধর্মের ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তি খুবই কঠিন এবং প্রত্যেকের কাছে তা যুক্তিযুক্তও। এসব যুক্তির বিশ্লেষণ আপাতত দরকার নেই। অবশ্য নজরুল ইসলাম তাদের এই যুক্তিগুলোকে ভেঙ্গে একটি ধর্মের মধ্যে নিয়ে আসার জন্যও কোন লেখার মাধ্যমে বলেননি। তিনি গেয়েছেন সাম্যের গান-
    গাহি সাম্যের গান-
    যেখানে আসিয়া এক হ'য়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,
    যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান।
    গাহি সাম্যের গান!
    কে তুমি?- পার্সী? জৈন? ইহুদী? সাঁওতাল, ভীল, গারো?
    কন্‌ফুসিয়াস্‌? চার্বাক চেলা? ব’লে যাও, বলো আরো!
    বন্ধু, যা-খুশি হও,
    পেটে পিঠে কাঁধে মগজে যা-খুশি পুঁথি ও কেতাব বও,
    কোরান-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক-
    জেন্দাবেস্তা-গ্রন্থসাহেব প’ড়ে যাও, য্ত সখ-
    কিন্তু, কেন এ পন্ডশ্রম, মগজে হানিছ শূল?
    দোকানে কেন এ দর কষাকষি? -পথে ফুটে তাজা ফুল!
    তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান,
    সকল শাস্র খুঁজে পাবে সখা, খুলে দেখ নিজ প্রাণ!
    তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম, সকল যুগাবতার,
    তোমার হৃষয় বিশ্ব-দেউল সকল দেবতার।
    কেন খুঁজে ফের’ দেবতা ঠাকুর মৃত পুঁথি -কঙ্কালে?
    হাসিছেন তিনি অমৃত-হিয়ার নিভৃত অন্তরালে!
    যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান
    যেখানে মিশছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুস্‌লিম-ক্রীশ্চান।
    তাই বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব কোন মতবাদ প্রয়োগ পরিলক্ষিত না হয়ে বরং প্রকাশিত হয় সকল ধর্মের স্তুতিগান। যার চিহ্ন পাওয়া যায় তাঁর ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে রচিত সাহিত্য কর্মের মাঝে।
    তওফিক দাও খোদা ইসলামে
    মুসলিম জাঁহা পুন হোক আবাদ।
    দাও সেই হারানো সুলতানত্
    দাও সেই বাহু, সেই দিল আজাদ।
    ইসলামকে তার হারানো ঐতিহ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার জন্য বা ইসলামের মহিমা বর্ণনা করে তাঁর রচনা সবচেয়ে বেশী, তিনি গজল, হামদ নাথ, কেরাত, ইসলামী গান এবং বহু কবিতা ও গদ্য লিখেছেন এ বিষয়ে। তারপরেও তিনি যখন হিন্দু দেব-দেবীর স্তুতি গেয়েছেন তখন সেই দেব-দেবী’রাই তাঁর কাছে মহৎরূপে দেখা দিয়েছে। সাম্য চিন্তার ফলে তাঁর বিশ্বাসের ভিত্তি কোন স্থানে তা বিচার করা প্রায় দুরুহ। কখনো কখনো তিনি মহালক্ষী কল্যাণদাত্রীর কাছে রাষ্ট্রীয় শক্তি কামনা করে সকল প্রকার অতৃপ্তি, অশান্তি, বিরোধ, হিংসা, দ্বেষ ইত্যাদি অকল্যান দুর করার বিনতি আর্জি করেছেন-
    নমো অনন্ত কল্যাণদাত্রী।...
    সহস্রভুজা ভীতজনতারিণী জননী জগৎ-ধাত্রী
    দীনতা ভীরুতা লাজ গ্লানি ঘুচাও
    দলন কর মা লোভ-দানবে।
    রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও, মান দাও
    দেবতা কর ভীরু মানবে।
    আবার অন্যত্র খ্রীষ্টের কণ্টক মুকুট শোভা পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করেছেন। বিলিয়ে দিয়েছেন তাঁর সকল অযোগ্যতা এবং দারিদ্রে মহান এই মহামানব এর স্তুতি করে লিখেছেন-
    হে দারিদ্র, তুমি মোরে ক'রেছ মহান।
    তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রীষ্টের সম্মান
    কণ্টক-মুকুট শোভা। -দিয়াছ, তাপস,
    অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস;
    এরপর ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে নজরুল ও প্রমীলা দেবীকে চিকিৎসার জন্যলন্ডন পাঠানো হয়। মে ১০ তারিখে লন্ডনের উদ্দেশ্যে হাওড়া রেলওয়ে স্টেশনছাড়েন। লন্ডন পৌঁছানোর পর বেশকয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তার রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা করেন। এদের মধ্যে ছিলেন: রাসেল ব্রেইন, উইলিয়াম সেজিয়েন্ট এবং ম্যাককিস্ক। তারা তিন বার নজরুলের সাথে দেখা করেন। প্রতিটিসেশনের সময় তারা ২৫০ পাউন্ড করে পারিশ্রমিক নিয়েছিলেন। রাসেল ব্রেইনেরমতে নজরুলের রোগটি ছিল দুরারোগ্যবলতে গেলে আরোগ্য করা ছিল ছিল অসম্ভব।একটি গ্রুপ নির্ণয় করেছিল যে নজরুল “ইনভল্যুশনাল সাইকোসিস” রোগে ভুগছেন।এছাড়া কলকাতায় বসবাসরত ভারতীয়চিকিৎসকরাও আলাদা একটি গ্রুপ তৈরিকরেছিলেন। উভয় গ্রুপই এই ব্যাপারে একমতহয়েছিল যে, রোগের প্রাথমিকপর্যায়ের চিকিৎসা ছিল খুবই অপ্রতুল ওঅপর্যাপ্ত। লন্ডনে অবস্থিত লন্ডনক্লিনিকে কবির এয়ার এনসেফালোগ্রাফি নামকএক্স-রে করানো হয়। এতে দেখা যায় তার মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব সংকুচিতহয়ে গেছে। ড: ম্যাককিস্কের মতবেশ কয়েকজন চিকিৎসক একটি পদ্ধতি প্রয়োগকেযথোপযুক্ত মনে করেন যার নামছিল ম্যাককিস্ক অপারেশন। অবশ্য ড: ব্রেইন এরবিরোধিতা করেছিলেন।
    এই সময় নজরুলের মেডিকেল রিপোর্ট ভিয়েনারবিখ্যাত চিকিৎসকদের কাছে পাঠানোহয়। এছাড়া ইউরোপের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণস্থানেও পাঠানে হয়েছিল।জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসার্জনঅধ্যাপক রোঁয়েন্টগেনম্যাককিস্ক অপারেশনের বিরোধিতা করেন। ভিয়েনারচিকিৎসকরাও এই অপারেশনেরব্যাপারে আপত্তি জানান। তারা সবাই এক্ষেত্রে অন্যআরেকটি পরীক্ষার কথাবলেন যাতে মস্তিষ্কের রক্তবাহগুলির মধ্যে এক্স-রেতেদৃশ্যমান রং ভরেরক্তবাহগুলির ছবি তোলা হয় (সেরিব্রাল অ্যানজিওগ্রাফি)।কবিরশুভাকাঙ্খীদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাকে ভিয়েনার চিকিৎসক ডঃ হ্যান্সহফেরঅধীনে ভর্তি করানো হয়। এই চিকিৎসক নোবেল বিজয়ী চিকিৎসক জুলিয়াসওয়েগনার-জাউরেগের অন্যতম ছাত্র। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ৯ ডিসেম্বর কবিকে পরীক্ষা করানো হয়। এর ফলাফল থেকে ড. হফ বলেন যে, কবি নিশ্চিতভাবে পিক্‌সডিজিজ নামক একটি নিউরন ঘটিত সমস্যায় ভুগছেন। এই রোগে আক্রান্তদের মস্তিষের ফ্রন্টাল ও পার্শ্বীয় লোব সংকুচিত হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন বর্তমানঅবস্থা থেকে কবিকে আরোগ্য করে তোলা অসম্ভব। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ২৭ ডিসেম্বরতারিখে কলকাতার দৈনিক যুগান্তর পত্রিকা ভিয়েনায় নজরুল নামে একটি প্রবন্ধ ছাপায় যার লেখক ছিলেন ডঃ অশোক বাগচি। তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্য ভিয়েনায় অবস্থান করছিলেন এবং নজরুলের চিকিৎসা সম্বন্ধে প্রত্যক্ষ জ্ঞানঅর্জনকরেছিলেন। যাহোক, ব্রিটিশ চিকিৎসকরা নজরুলের চিকিৎসার জন্য বড়অংকের ফি চেয়েছিল যেখানে ইউরোপের অন্য অংশের কোন চিকিৎসকই ফি নেননি।অচিরেই নজরুল ইউরোপ থেকে দেশে ফিরে আসেন। এর পরপরই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ডঃ বিধানচন্দ্র রায় ভিয়েনা যান এবং ড. হ্যান্স হফের কাছেবিস্তারিত শোনেন।নজরুলের সাথে যারা ইউরোপ গিয়েছিলেন তারা সবাই ১৯৫৩সালের ১৪ ডিসেম্বর রোম থেকে দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। মধ্যবয়সে তিনি পিক্‌স ডিজিজে আক্রান্ত হন। এর ফলে আমৃত্যু তাকে সাহিত্যকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। একই সাথে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।
    বাংলাদেশে আগমন ও মৃত্যু
    ১৯৭১খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাঙালিদের বিজয় লাভের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৭২খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে তারিখে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে কবি নজরুলকে সপরিবারে বাংলাদেশেনিয়ে আসা হয়। কবির বাকি জীবন বাংলাদেশেই কাটে। স্থায়ীভাবে এদেশে আসার পর প্রতি বছর কবির জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে কবিকে ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত করেছেন এদেশের মানুষ। কিন্তু সেসব ‘ফুলের জলসায়’ও নীরব ছিলেন কবি।
    বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে তার বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দের ৯ডিসেম্বর তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়তাকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিতকরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একসমাবর্তনে তাকে এই উপাধি প্রদান করা হয়। ১৯৭৬খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিমাসে বাংলাদেশ সরকার কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্বপ্রদান করে। একই বছরের ২১ফেব্রুয়ারিতে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।একুশে পদক বাংলাদেশেরসবচেয়ে সম্মানসূচক পদক হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। এরপর যথেষ্ট চিকিৎসা সত্ত্বেও নজরুলের স্বাস্থ্যের বিশেষ কোন উন্নতিহয়নি। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে কবির সবচেয়ে ছোট ছেলে এবং বিখ্যাত গিটার বাদক কাজীঅনিরুদ্ধ মৃত্যুবরণ করে। ১৯৭৬ সালে নজরুলের স্বাস্থ্যেরও অবনতি হতে শুরু করে। জীবনের শেষ দিনগুলো কাটে ঢাকার পিজি হাসপাতালে। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগস্ট তারিখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কবি তার একটি কবিতায় বলেছিলেন:
    “ মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিয়ো ভাই,
    যেন গোরের থেকে মুয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই”
    এই কবিতায় তার অন্তিম ইচ্ছা প্রকাশ পেয়েছে। তার এই ইচ্ছার বিষয়টি বিবেচনা করে কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাধিস্থ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং সে অনুযায়ী তাঁর সমাধি রচিত হয়। তার জানাজার নামাযে ১০ হাজারের মত মানুষ অংশ নেয়। জানাজা নামায আদায়ের পর রাষ্ট্রপতিসায়েম, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, রিয়াল এডমিরাল এম এইচখান, এয়ারভাইস মার্শাল এ জি মাহমুদ, মেজর জেনারেল দস্তগীর জাতীয় পতাকা মন্ডিত নজরুলের মরদেহ সোহরাওয়ার্দী ময়দান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গনে নিয়ে যান। বাংলাদেশে তাঁর মৃত্যু উপলক্ষ্যে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক দিবস পালিত হয়। আর ভারতের আইনসভায় কবির সম্মানে এক মিনিট নিরবতা পালন করাহয়।
    নজরুলের জীবন নিয়ে চিন্তা করলে অবাক হতে হয়। বিষ্ময়কর এই প্রতিভাবান মানুষটি কত অসাধারণ সাহিত্য কর্ম সৃষ্টি করেন মাত্র ৪৩ বছরে। এর পর ৩৪ বছর নির্বাক-নিশ্চল থেকে মহান মানবতার কবি নজরুল চলে গেলেন পরোলোকে। রেখে গেছেন মানবধর্মের মহান আদর্শ। কিন্তু আমাদের হৃদয়ে কবি কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যু নেই; এদেশের শিল্প-সংস্কৃতির মূলধারায় নজরুলের সৃষ্টিকর্ম হারাবে না তার চিরন্তন প্রবহমানতাকে। আজও তিনি বেঁচে আছেন বেঁচে থাকবেন বহুকাল তাঁর কবিতায়, আর গানে গানে।
    লেখক : ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম , জিয়া পরিষদের সহ আর্ন্তজাতিক বিষয়ক সম্পাদক, সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের যুক্তরাজ্য শাখার যুগ্ম আহবায়ক, শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক রিসার্চ ইনস্টিটিউট’র প্রতিষ্ঠিতা এবং চার্টাড ইনস্টিটিউট অব লিগ্যাল এক্সিকিউটিভের মেম্বার

    (বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ ফেসবুক আইডি থেকে সংগৃহীত) 

    👉 👉 [এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রায় সকল পোস্ট-ই ফেসবুক থেকে সংগৃহীত। উক্ত লেখার বক্তব্য ও দায়-দায়িত্ব লেখকের একান্ত নিজস্ব। তাই প্রকাশিত লেখার বিষয়ে কোনো মতামতের জন্য এডমিন দায়ী নয়।] 

    No comments

    Post Top Ad

    ad728

    Post Bottom Ad

    ad728

    আমরা আপনাকে বিনামূল্যে আমাদের আপডেট গুলি পাঠাতে যাচ্ছি। প্রথমে আপনার অনুলিপি সংগ্রহ করতে, আমাদের মেইলিং তালিকায় যোগ দিন। আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, অকেজো তথ্য প্রেরণ করে আপনাকে বিরক্ত করবো না। সুতরাং কোনও আপডেট মিস করবেন না, সংযুক্ত থাকুন!