একটি সুসংবাদ
এখানে মূল ঘটনাটি বলার আগে লোকটির সংসার সম্পর্কে কিছু বলে রাখা প্রয়োজন। লোকটি ছিলেন একজন মুসলিম ও নিঃসন্তান ব্যক্তি। তাঁর ২ জন স্ত্রী ছিলেন। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে একটি পুত্র সন্তান জন্ম নিলেও ভূমিষ্ঠ লগ্ন থেকেই তারা মা-ছেলে অন্য দেশে বসবাস করতেন।
এখানে ১ম স্ত্রীকে নিয়ে লোকটি আলাদ বসবাস করতেন। দীর্ঘকাল ধরে একটি সন্তানের আশায় আশায় তাঁরা দু'জনেই বয়প্রাপ্ত হয়ে জীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছলেন। জীবনের প্রতিটি ক্ষণে ক্ষণে তারা একটি সন্তানের অভাবে খুবই মনমরা ও নিরানন্দ জীবন কাটাতেন।
একদিন লোকটি রোজা রাখলেন। ইফতারের সময় ঘনিয়ে আসছে। প্রতিদিনের ন্যায় তিনি মেহমানের খোঁজে ঘরের বাইরে গেলেন। কিন্তু আজ কোনো আগন্তকের দেখা নেই! মেহমানের খোঁজে অনেক্ষণ বাইরে অপেক্ষা করে অবশেষে ঘরে ফিরে এলেন। ইফতারের সময় হয়ে গেল। কিন্তু কি আশ্চর্য! তিনি কোনো খাবার খেলেন না। অর্থাৎ ইফতার করে রোজা ভঙ্গ করলেন না।
পরের দিন ইফতারের পূর্বে লোকটি আবারো ঘরের বাইরে গিয়ে কোনো আগন্তকের অপেক্ষা করতে লাগলেন। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজি করে আজও কোনো আগন্তকের দেখা পেলেন না। অথচ এদিকে ইফতারের সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। মেহমান ব্যতীত আজকেও তিনি কোনো খাবার খেলেন না। এভাবে প্রতিদিন মেহমানের খোঁজে তিনি অনেক দূর পর্যন্ত গিয়ে কাউকে নাপেয়ে ফিরে আসেন। তবুও মেহমান ছাড়া তিনি কোনো খাবার খেলেন না অর্থাৎ রোজা ভঙ্গ করলেন না।
এদিকে লোকটির স্ত্রী খাবার গ্রহণের জন্য তাঁকে খুবই পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন। কিন্তু তাঁর এক কথা, মেহমান ছাড়া তিনি কিছুতেই খাবার গ্রহণ করবেন না বা রোজা ভাঙবেন না।
কঠিন অপেক্ষার পালা বদলের দশম দিন পার হতে চলল আজ। তিনি একই নিয়মে আবারো কোনো আগন্তকের অপেক্ষায় মরুভূমির উত্তপ্ত রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ালেন। ধুসর ঊষর বালুকাবেলার চারিদিকে যতদূর চোখ যায় ততদূর দৃষ্টি ছড়িয়ে দেন। কিন্তু বারবার দু'চোখের দীর্ঘদৃষ্টি দিগন্তরেখায় মিলে যায়...! কোনো আগন্তকের দেখা মেলেনা...!! কিন্তু লোকটির বিশ্বাস ছিল যে, আজ কোনো না কোনো মেহমান মিলবে-ই। তাই অধীর আগ্রহে ধুঁধুঁ মরুপ্রান্তরে যে কোনো অজানা অপরিচিত আগন্তকের আশায় অপলক নেত্রে দূর সীমান্তের পথ রেখায় তাকিয়ে রইলেন।
অবশেষে পড়ন্ত বিকেলের তীর্যক সূর্যরশ্নি ভেদ করে লোকটি দেখলেন বালুময় তটভুমির শেষ প্রান্ত থেকে
একটি ছোট্ট কাফেলা তাঁর দিকে উঠে আসছে। তিনি সাথে সাথে খুব বিচলিত হয়ে উঠলেন। ধীরে ধীরে কাফেলাটি যখন তাঁর একেবারে কাছাকাছি চলে এল। তিনি দেখলেন ১০/১২ জন লোকের একটি দল তাঁর সামনে দিয়েই হেঁটে যাচ্ছে। তাদেরকে দেখে তিনি খুব আনন্দিত হলেন। তিনি অতিশয় ভক্তি সহকারে তাদেরকে সালাম দিলেন এবং খুবই বিনয়ী কন্ঠে বললেন, "ভাই, আপনাদের যদি আপত্তি না থাকে তবে আজকে আমার ঘরে আপনারা মেহমান হতে পারেন।" তারা সানন্দে তাঁর দাওয়াত গ্রহন করলেন। তাদের দলনেতা বললেন, "ঠিক আছে চলুন।"
তিনি মেহমানদেরকে অতি সম্মানের সাথে ঘরে নিয়ে বসালেন এবং স্ত্রীকে বললেন, "মেহমান এসেছে, খাবার দাবার কিছু কি আছে? স্ত্রী বললেন, "ঘরেতো খাবার দাবার তেমন কিছু নেই। তবে আমার পালিত বাছুরটি আছে। যেটিকে আমি সন্তানের মত লালন পালন করে মোটাতাজা করেছি। আপনার অনুমতি পেলে সেটিকেই জবেহ করে রান্না করে দিতে পারি।" ব্যক্তিটি তখন বললেন, "তবে সেটিই কর।" একথা বলেই তিনি মেহমানদের সাথে গল্প করতে লাগলেন। ওদিকে তাঁর স্ত্রী পালিত বাছুরটি জবেহ করে খাবারের আয়োজন করতে লাগলেন।
ইফতারের সময় ঘনিয়ে আসছে। নির্দিষ্ট সময়ে খাবার তৈরি হয়ে গেল এবং মেহমানদের সামনে খাবার পরিবেশন করা হলো। ১০ দিনের ক্ষুধার্ত হওয়াতে লোকটি স্বাভাবতই খাবার গ্রহণের জন্য কিছুটা উৎসুক ছিলেন বটে; কিন্তু খুবই আন্তরিক এবং বিনয়ের সাথে মেহমানদেরকে খাবার গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে তারপর নিজে খেতে শুরু করলেন। এদিকে ব্যক্তিটির স্ত্রী ঘরের ভিতর থেকে পর্দার ফাঁক দিয়ে সব কিছু অবলোকন করছিলেন। কিছুক্ষণ পর পর্দার পেছন থেকে তাঁর স্ত্রী বললেন, "হায় আল্লাহ, এ কেমন মানুষ ! একা একা খাবার খেয়ে চলেছেন অথচ মেহমানরা না খেয়ে বসে আছেন !!"
লোকটি তখন মাথা তুলে দেখলেন, তাইতো...!! মেহমানরা খাবার না খেয়ে বসে আছেন। তা দেখে তিনি একটু লজ্জিত হলেন এবং বললেন, "আমি দুঃখিত, আসলে আমি খেয়াল করিনি। আপনারা দয়া করে খাবার গ্রহণ করুন, খাবার নিন"- এভাবে একটু জোরাজুরি করলেন।
তাদের দলনেতা তখন বললেন, "দয়া করে আপনি থামুন, ব্যস্ত হবেন না। আমরাতো খাবার খাইনা।"
লোকটি তখন খুবই আশ্চর্য হলেন। বললেন, "খাবার খাননা মানে...!!"
মেহমানের দলনেতা আবার বললেন, "হ্যাঁ, আসলেই আমরা খাবার খাইনা। আমরাতো মানুষ না।"
এবার লোকটি একেবারে হতচকিত হয়ে গেলেন। বললেন, "মানুষ না মানে...!!"
তখন দলনেতা বললেন, "হ্যাঁ, আমরা মানুষ না, আমরা আল্লাহর ফেরেশতা। আপনার রবের পক্ষ থেকে আমরা এসেছি। লোকটি তখন যারপর নেই বিস্মিত হয়ে গেলেন !! বললেন, "আমার রব অতি মহান !!"
দলনেতা এবার বললেন, "আপনি সব সময় মেহমান নিয়ে খাবার গ্রহণ করেন এবং মেহমানকে খুবই সমাদর করেন। মেহমান ব্যতীত দশদিন যাবত রোজা ভঙ্গ করেননি। এতে আপনার রব আপনার উপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছেন। তাই তিনি আপনাকে তাঁর বন্ধু (খলিল) বানিয়ে নিয়েছেন এবং আপনার জন্য একটি সুসংবাদ দিয়ে আমাদেরকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন।"
লোকটি বললেন, "সুসংবাদ? কিসের সুসংবাদ??"
ফেরেশতাদের দলনেতা এবার মুচকি হেসে বললেন, "আপনার রব আপনাকে একটি পুত্র সন্তান দান করবেন এবং তিনি সে সন্তানের জন্য একটি সুন্দর নামও জানিয়ে দিয়েছেন।"
লোকটি তখন বললেন, "আমি এবং আমার স্ত্রী একেবারে বার্ধক্যে উপনীত হয়ে গেছি। আমাদেরতো সন্তান ধারণ করার কোনো ক্ষমতাই নেই। কিভাবে সম্ভব?"
তখন ফেরেশতাদের দলনেতা বললেন, "হ্যাঁ সম্ভব,।"
একথা বলেই দলনেতা খাবারের উচ্ছিষ্ট এবং হাড় মাংস গুলি একত্র করে সেগুলির উপর একটা ফুঁক দিলেন।
সাথে সাথে মেহমানদের জন্য জবেহ করা বাছুরটি জীবিত হয়ে ঘরের ভিতরে দৌড়ে চলে গেল। এই ঘটনার মাধ্যমে ফেরেশতাগণ বুঝালেন যে, আল্লাহর দ্বারা সবকিছু সম্ভব।
এই ঘটনা দেখে লোকটি অভিভুত হয়ে গেলেন। এত বড় একটি সুসংবাদ পেয়ে সাথে সাথে তিনি তাঁর রবের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। এরপর ফেরেশতারা সালাম জানিয়ে তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিলেন।
ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার সময় ফেরেশতাদের দলনেতা বাড়ির আঙ্গিনায় থাকা গাছ থেকে একটি পাকা ফল ছিঁড়ে ফুঁক দিলেন এবং লোকটির হাতে দিয়ে বললেন, "এই ফলটি আপনার স্ত্রীকে খেতে বলবেন।" লোকটি ফেরেশতাদের কথামত ফলটি এনে তাঁর স্ত্রীকে খেতে দিলেন। তাঁর স্ত্রী ফলটি খেলেন এবং কিছুদিনের মধ্যে সন্তান সম্ভবা হয়ে গেলেন। সুবাহানাল্লাহ...!!!
যথাসময়ে লোকটির ঘরে চাঁদের মত ফুটফুটে একটি পুত্র সন্তান জন্ম হল। তিনি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে দেয়া নাম রেখে শিশু পুত্রটিকে লালন পালন করতে লাগলেন। জীবনের ক্রান্তিলগ্নে দয়াময় আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এমন একটি মূল্যবান নেয়ামত লাভ করে স্বামী স্ত্রী দুজনেই অত্যন্ত আনন্দে দিন কাটাতে লাগলেন...।।
এতক্ষণ যে ব্যক্তিটির গল্প শুনছেন নিশ্চয়ই আপনাদের জানতে ইচ্ছে করছে লোকটি কে বা তাঁর নাম কি?
তাই না বন্ধুরা ??
এবার শুনুন তাঁর পরিচয়।
লোকটি কোন সাধারণ মানুষ নন। পবিত্র মহাগ্রন্থ আল-কোরানে যাঁর নাম বহুবার বর্ণিত হয়েছে। ত্যাগ ও ধর্য্যের চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে যিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে জীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় যথাযত ভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা যাকে খলিল অর্থাৎ বন্ধু উপাধিতে ভূষিত করে ধন্য করেছেন। যাঁকে সারা দুনিয়ার মুসলিম জাতির পিতা বানিয়েছেন। সেই মহামানব হযরত ইব্রাহীম খলীল আলাইহিস সালাম।
আর আল্লাহর পক্ষ থেকে দেয়া তাঁর সন্তানের নামটি ছিল ইসহাক। তিনিও পরবর্তীতে ইসহাক (আঃ) নামে মর্যাদাবান নবীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন।
এই হিংসা ভরা কুটিল পৃথিবীতে, দূষপ্রতিরোধ্য আপদ বিপদে বিপর্যস্ত মানবজাতিকে পরিত্রাণের জন্য যুগে যুগে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে প্রেরিত অসংখ্য নবী-রাসুলের মধ্যে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ছিলেন অত্যন্ত মর্যাদাবান একজন রাসুল।
কথিত আছে, হজরত ইব্রাহীম-ই (আঃ) সর্বপ্রথম পৃথিবীতে মেহমানদারীর প্রথা চালু করেন। পরম করুনাময় আল্লাহ তায়ালা তাঁর উপর এবং তাঁর বংশধরগণের উপর অপার শান্তি বর্ষন করুন, আমীন।
সুতরাং প্রিয় বন্ধুরা, এই গল্পটি থেকে আমরা এই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি যে, কোনো আগন্তক, মুসাফির বা মেহমানকে সমাদর করতে আমরা যেন কখনো কার্পন্য নাকরি। মেহমানকে সম্মান করতে আমরা যেন বিন্ধুমাত্র কুন্ঠিত নাহই। আমাদের যা-ই আছে তাই দিয়ে যেন সবসময় মেহমানকে আন্তরিক ভাবে আপ্যায়ন এবং সেবাযত্নের চেষ্টা করি।
কারণ মেহমানদারীকে আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত পছন্দ করেন। হয়তো আপনার এই ছোট্ট কাজে আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত খুশী হয়ে আপনাকে তাঁর অফুরন্ত নেয়ামতের ভান্ডার থেকে অনেক বড় কিছু দান করে দিতে পারেন। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর মত আপনার উপর সন্তুষ্ট হয়ে তিনি পূরণ করে দিতে পারেন আপনার মনের গভীরে লালন করা গোপন কোনো সৎ আশা-আকাঙ্ক্ষা। আল্লাহ তো অতীব দয়াময় ও দানশীল !!
"ওয়াতার ঝুকু মানতাশাউ বিগাইরি হিছা-ব" অর্থাৎ-তিনি যাকে ইচ্ছা বেহিসাব রিযিক দান কর।”
তাছাড়া মেহমানদারী হচ্ছে সামাজিক সম্পর্ক রক্ষার অন্যতম একটি মাধ্যম। পরস্পরিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধি ও সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে মেহমানধারীর গুরুত্ব অপরিসীম। মেহমানদারীতে আছে অতিশয় পুণ্য ও আনন্দ। বস্তুত এটি অত্যন্ত কল্যাণকর ও মহত্ত্বের পরিচায়ক।
মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) বলেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে।"
(বুখারী: হাদীস নং ৬০১৮, মুসলিম: হাদীস নং ৪৮)
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে বুজার তাওফিক দান করুক এবং সঠিক পথ প্রদর্শন করুক, আমীন।
(কোরআন-হাদীসের আলোকে)
রচনা-আলী ইউছুফ
২৬/০৬/২০ ইং

No comments