বাবা নেই, আল্লাহ তায়ালার মহা অনুগ্রহে চতুর্দিকের হাজারো নিন্দা আর হিংসাকে উপেক্ষা করে বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে যতটুক সম্ভব উজাড় করে দিয়ে বোনটির জীবন সুখী করার জন্য সাধ্যকেও অতিক্রম করার চেষ্টা করেছিলাম সেদিন। কতটুকু সফল হয়েছি সে হিসেব কোনোদিন করিনি। শুধু বোনটি সূখী হয়েছে কিনা সে চিন্তায়-ই সর্বদা ব্যস্ত থাকতাম। বিয়ের মাস তিনেক পর কাকে দিয়ে যেন বোনটি আমার কাছে ২/৩ পৃষ্টার একটি চিঠি পাঠাল। চিঠিতে অনেক কথার পর শেষ অংশটি ছিল নিম্নরূপঃ
"দাদা, আমি আজ খুব সুখী। তোমার পছন্দের বর এবং মনের মত শশুরবাড়ী পেয়ে আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট। সত্যিই দাদা, তোমার পছন্দের তুলনা হয়না। দাদা...যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন তোমার জন্য আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করবো, আল্লাহ যেন আমার দাদাকে সুখী করেন, অনেক সম্মানীত করেন।"
ইতি-
তোমার আদরের ছোট্ট বোন,
শাহানাজ।
অফিসে বসে চিঠিটি পড়ে সেদিন অনেকক্ষণ কেঁদেছিলাম। মহান আল্লাহর দরবারে যার পর নাই শোকরিয়া আদায় করেছিলাম। রাতে শোবার সময় ডেস্ক থেকে বের করে চিঠিটি আবার পড়লাম, পুনরায় পড়লাম। এভাবে সকাল-দুপুর-রাতে চিঠিটি মাস খানেক প্রতিদিন পড়তাম। যতবারই পড়তাম ততবারই চোখের পানি কপোল গড়িয়ে যেতো। ভাবতাম, যাক; বোনটা সূখী হয়েছে এটিই বড় সফলতা। আল্লাহর কাছে লাখো-কোটি শোকরিয়া।
কিন্তু কেন জানিনা, মাঝে মাঝে মনে হতো বোনটি কোন কিছু লুকাচ্ছে নাতো...!! আসলেই আমার বোনটি সূখী হয়েছে তো...!! মনটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠতো। তাই প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার হলেও বোনের বাড়ী যেতাম, দেখে আসতাম, মনের সবটুকুন আদর ভালবাসা দিয়ে দোয়া করে আসতাম। যতবারই যেতাম, গোলাপ পাপড়ীর ন্যায় বোনের দু'টি মিষ্টি ঠোঁটের রেখায় সন্তুষ্টি ও তৃপ্তিময় হাসির ঝলক আমার তীক্ষ্ণ নজর এড়াতোনা। মনে মনে খুব খুশীই হতাম বৈকি। বোনটিকে আল্লাহ রব্বুল ইজ্জত সুখী করেছে, সন্তুষ্ট করেছে-এর চেয়ে বড় আনন্দের বিষয় আমার কাছে আর কিছুই ছিলনা তখন।
সম্ভ্রান্ত পরিবার, চৌধুরী বাড়ি, অকৃত্রিম ভালোবাসায় পরিপূর্ণ সক্ষম ও সামর্থ্যবান স্বামী, ছবির নায়ক সদৃশ ২ দেবর, অপরুপ সৌন্দর্যমণ্ডিত মনের অধিকারিণী তাদের ২ নায়িকা, পুষ্পকাননে শোভিত ৪ ননদ-ননসের অফুরাণ মায়া-মমতা এবং জামাই বাবুদের অতীব সৌজন্য ও সম্মানবোধ আর মমতার ফুলজুরি সবকিছু মিলে এক মহাসূখের মেলা। পাশাপাশি পরম সুখময় ভগ্যাকাশের অজস্র তারকারাজির ভীড়ে ষোল কলায় পরিপূর্ণ আরেক পূর্ণেন্দু স্নাত সত্তা, যেন তাপসী রাবেয়া বছরীর অবিকল প্রতিচ্ছবি, মহান মহীয়সী, পরম স্নেহময়ী, অতিশয় গুণবতী ঠিক যেন মায়ের মত শাশুড়ী সহ আভিজাত্য কৌলিন্যে ভরা অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, সুশিক্ষিত, পরিমার্জিত পরিমণ্ডলে এক মহা মিলন মেলায় হাসী-খুশীতে বেশ ভালোই কাটছিল বোনের সংসার জীবন।
দেখতে দেখতে ২৫ টি বছর কেটে গেল। পৃথিবীর অনেক কিছুই বদলে গেল। শুধু বদলানো না আমার আদরের ছোট্ট বোনটি। সেই ছোটকাল থেকেই ছিল একটু চাপা স্বভাবের। যে কোন দুঃখ কষ্ট, ব্যথা বেদনা নিমিষেই হজম করে নেয়ার এক আশ্চর্য রকম শক্তি ছিল বোনটির। পাহাড় সমান কষ্ট আর প্রচন্ড ঘূর্ণিঝড়ের সময়েও বোনের চোখে দেখতাম দক্ষিণা হাওয়ার স্নিগ্ধ শীতলতা। বুকভরা জ্বালা নিয়ে চোখ ভরা আশায় ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকার মত অবিশ্বাস্য যোগ্যতা সে রপ্ত করে ফেলেছিল ইতিমধ্যে।
তাই হয়তো সবার অলক্ষ্যে-অজান্তে ক্যান্সারের মতো দুষ্ট ক্ষত বহন করেও সবার জন্যে সবকিছু করে যেতে লাগল অবলীলায়। একটিবারের জন্যেও আমাকে বা বাপের বাড়ীর কাউকেই কথাটি জানায়নি সে। শুধু তাই নয়, ঘরের সবাইকে নিষেধ করেছে তার এই দুরারোগ্য ব্যাধির কথা যেন কাউকে না বলে।
নিঃশ্বাস থাকা অব্দি বাপের বাড়ী আর শশুর বাড়ীর সকলের সাথে হেসে-গেয়ে ধীরে ধীরে অথচ অতি দ্রুত বোনটি চলতে লাগল অসীমের পানে। এতবড় একটি বোঝা নিয়ে বোনটি দিনের পর দিন, মাসের পর মাস স্বামী-সন্তান, আত্মীয়-স্বজন সহ সকলের সাথে মিলেমিশে সংসারের সবকিছু হাসিমুখে করে যাচ্ছে অথচ কেউ টেরও পেলনা।
অত্যন্ত প্রশস্ত হৃদয় এবং অবস্থা সম্পন্ন মানুষ তার স্বামীটি। অনেক চিকিৎসা-অনেক অর্থকড়ি ব্যয় করেও কোনো সুফল শেষ পর্যন্ত এলনা। প্রায় ২ বছর অনেক সংগ্রাম করে আর টিকতে পারলনা। নিয়তির কাছে হার মানতে বাধ্য হল আমার বোন। অবশেষে কাউকেই বিন্দু মাত্র কষ্ট না দিয়ে, কারো বোঝা নাহয়ে নীরবে-নিভৃতে চলে গেল নাফেরার দেশে। বিধাতার অমোঘ নিয়মে চিরদিনের জন্য সবাইকে কাঁদিয়ে আমার আদরের ছোট্ট বোনটি গত ২৭ জুলাই ২০২০ ইং তারিখে মিশে গেল মহান স্রষ্টার অপার সান্নিধ্যে।
সময়ের বর্ণীল স্রোতে অন্য দশজনের মত বোনের কোলেও ভেসে এসেছিল চাঁদের মত ফুটফুটে দু'টি ছেলে সন্তান। ছেলেতো নয়, যেন দুটি হীরের টুকরো। একটি ছেলে চুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বেরিয়েছে, আরেকটি ছেলে ডাক্তারী ফাইনাল পরীক্ষা দেয়ার অপেক্ষায়। ছেলে দু'টির ব্যাপারে আমি আর কি বলবো? তাদের মা অর্থাৎ আমার বোনের মুখেই শুনুন।
মৃত্যুর মাত্র কদিন আগে আমার বোন ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেয়। স্ট্যাটাসটি হুবহু নিম্নরূপঃ
"মাঝে মাঝে জীবনের কিছু সুখ আর আনন্দ এসে নাড়া দেয় যার কোন তুলনা নেই। আমার সন্তানেরা এমন কিছু সুখ এবং আনন্দের মূহুর্ত আমাকে উপহার দিয়েছে, সে সময় ও মুহূর্তগুলো এ জীবনে কোন কিছুর সাথে তুলনা হবার নয়। উপলব্ধিটা চেতনার গভীরে নাড়া দিয়ে আনন্দাশ্রু হয়ে গড়িয়ে পড়ে। সাফল্য যেন এমনি ভাবে সারাজীবন তাদের ছুঁয়ে থাকে। পরম করুণাময় তার রহমতের করুণাধারায় যেন তাদের সিক্ত রাখেন জীবনের প্রতিটি ক্ষণে। অনেক অভিনন্দন আর আদর রইল তোদের প্রতি। কখনো বলা হয়ে ওঠেনি, ধন্যবাদ তাদের বাবাকে। জীবনের প্রতিটি ক্ষণে ক্ষণে সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়ার জন্যে। ধন্যবাদ, সবাই ভালোভাবে থাকিও-ভালোভাবে চলিও।"
এটি ছিল মৃত্যুর পূর্বে আমার বোনের সর্বশেষ ফেসবুক স্ট্যাটাস।
আজ বোনের বাড়ীটি বিরাণ, মরুভূমির মত হাহাকার- নিরব-নিস্তব্ধ। যেদিকে তাকাই শুধু সুনসান নিরবতা। যখনই যাই পুরো ঘরে যেন দেখি, অব্যক্ত বেদনাগুলি শুধু ঘুরপাক খাচ্ছে।
কেন এমন হল? কেন বোনটিকে করুনাময় খোদা আর কটা দিন সময় দিলেন না ?? কেন দয়াবান খোদা আমার বোনটিকে একটু সুখ আর বিশ্রামের সময় তুলে নিলেন ???
জীবনে কোনদিন কারো সাথে কখনো খারাপ আচরণ করেনি। কাউকে কোনদিন কষ্ট দেয়নি। বিগত ২৫ টি বছর বাপের বাড়ীতে একটি রাত ভাল মত কাটায়নি। যতক্ষন বাপের বাড়ীতে থাকতো শুধু স্বামী আর সন্তানের চিন্তায় অস্থির থাকতো বোনটি।
কোনদিন শুনিনি, বাপের বাড়ীতে এসে শশুর বাড়ীর কোনো সমালোচনা করতে। কোনোদিন শুনিনি শশুর বাড়ীর কারো নামে কোনো বদনামী করতে। কোনোদিন দেখিনি শশুর বাড়ীর কারো সাথে কোন রকম মন্দ আচরণ করতে। বোনের সুখ-দুখ, হাসি-কান্না, ব্যথা-বেদনা সবকিছু মিলেমিশে যেন একাকার হয়ে গিয়েছিল সে বাড়ীতে। কি এক অদ্ভুত আপনতায় আবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল বোনটি আমার সে বাড়িতে!!
কি পেয়েছিল আমার বোন সে বাড়ীতে?
কেন বাপের বাড়ীর চেয়েও বড্ড আপন হয়ে গিয়েছিল আইস ফ্যাক্টরি রোডের সে দ্বিতল বাড়িটি !!
কি ছিল সে চৌধুরী বাড়িতে ???
মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে কায়মনোবাক্যে ফরিয়াদ করি; তিনি যেন চৌধুরী বাড়ির সকল মানুষের উপর রহম করেন ও তাঁদেরকে হেফাযত করেন। যারা ২৫ টি বছর আমার আদরের ছোট্ট বোনটিকে নিজেদের মেয়ে আর বোনের মত পরম মমতায় আপন করে নিয়েছিলেন এবং বোনের অন্তিম নিশ্বাস অব্দি অকৃত্রিম ভালবাসায় আবদ্ধ করে রেখেছিলেন।
মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে আরো ফরিয়াদ করি; তিনি যেন আমার বোনকে দয়া করে ক্ষমা করে দেন এবং জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করেন।
হে দয়াময় আল্লাহ, আপনি আমার আদরের ছোট্ট বোনের বিদেহী আত্মাকে পবিত্র ও সুগন্ধিময় আত্মাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করুন এবং তার স্বামী-সন্তানদের প্রতি রহম করুন, আমীন।
বেদনাহত বড় ভাই
-আলী ইউছুফ
👉 👉 [এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রায় সকল পোস্ট-ই ফেসবুক থেকে সংগৃহীত। উক্ত লেখার বক্তব্য ও দায়-দায়িত্ব লেখকের একান্ত নিজস্ব। তাই প্রকাশিত লেখার বিষয়ে কোনো মতামতের জন্য এডমিন দায়ী নয়।]
Subscribe to:
Post Comments
(
Atom
)
Post Top Ad
ফেসবুকের গল্প তে আপনাকে স্বাগত। এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কোনো লেখা বা মতামতের জন্য 'ফেসবুকের গল্প' কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।
Post Bottom Ad

No comments