"কিছু ছবি কিছু কথা"– ঢাবি ক্যাম্পাসের দেয়ালে দেয়ালে আঁকা অংকন গুলো জুলাই বিপ্লবের অবিস্মরণীয় স্মৃতিস্মারক হয়ে থাকবে অনন্তকাল। এ যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, ফ্যাসিস্ট রেজিমের নির্মম-করুণ ইতিহাস। দেয়াল গুলোতে ফুটে উঠেছে জুলাই বিপ্লবের ভীষিকাময় গণহত্যার চিত্র, নারকীয়-উল্লাস আর রক্তের হলিখেলা।
প্রতিটি ছবি যেন এক একটি গল্প, এক একটি আর্তনাদ। বছরের পর বছর অসহায় মানুষের অনিশ্চিত জীবনের অব্যক্ত বেদনা, যা কখনো অশ্রু, কখনো হাহাকার, কখনো সেলফি, কখনো-বা নিঃশব্দ চিৎকারে ফুটে ওঠেছে নিদারুণ যন্ত্রনা !!
২৪ জুলাইয়ের গণহত্যা, গণতন্ত্রের দাবিতে জেগে ওঠা ছাত্র-জনতার কণ্ঠরোধ, ফ্যাসিস্ট বাহিনীর বর্বরোচিত হামলা, রাস্তায় রাস্তায় রক্তের স্রোত, ছাত্র-জনতার অসহায় চিৎকার এবং স্বজন হারানোর বেদনায় ভারী হয়ে ওঠা বাতাস, সব-ই দেয়ালের ছবির সমাহারে যেন জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে। ঢাবি ক্যাম্পাসের দেয়াল দেয়ালে খচিত এই গ্রাফিতি গুলো এক একটি শুধু ক্ষতচিহ্ন-ই নয় বরং তা "ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য শিক্ষা--অপরাজেয় বাংলার উজ্জ্বল ইতিহাস"।
এখানে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের চেতনায় উজ্জীবিত ছাত্র-ছাত্রীদের নিপুন শিল্পীতুলির প্রতিটি আঁচড় যেন আমাদের সামনে আবৃতি করে শোনায়---গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষায় রক্তাক্ত সংগ্রামের অব্যক্ত পংক্তিমালা। মনে করিয়ে দেয়, সেই অবিশ্বাস্য অবিনশ্বর আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের অনবদ্য কাহিনী, যা একসময় আড়াল থেকে বের হয়ে এসে ইতিহাসের সোনালী পাতায় স্থান পেয়ে যায়। প্রতিটি রক্তমাখা চিহ্ন, প্রতিটি সংগ্রামী মুখ, তীব্র প্রতিরোধের প্রতিটি মুহূর্ত যেন অমর অক্ষয় হয়ে গেঁথে যায় বাংলাদেশের ২য় স্বাধীনতার অমলিন শাশ্বত ইতিহাসে।
"এসব গ্রাফিতি আর্ট শুধু একটি স্মৃতি নয়, বরং আমাদের প্রতিবাদ, আমাদের দৃঢ় সংকল্প।" এগুলো চিরকাল মহাকালের সাক্ষী হয়ে থাকবে এদেশের আকাশে-বাতাসে-অন্তরীক্ষে। যা বলে দেয়, অন্যায়, অত্যাচার ও ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষ কখনো চুপ থাকে না। কোনো জালিম ও স্বৈরাচার কখনো দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না, ২৪ জুলাইয়ের গণমানুষের গণঅভ্যুত্থান, জনগনের ঐক্য, শক্তি আর সাহসের বহিঃপ্রকাশ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ-উৎকৃষ্ট প্রমাণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়াল জুড়ে রক্তমাখা এসব দৃশ্যাবলীতে খুব সহজেই বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের অত্যাচার নির্যাতনের এক ভয়াবহ চিত্র এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠে। দেয়ালের চিত্রগুলো তুলে ধরে নির্যাতিতদের চিৎকার, মৃতদের শেষ আর্তনাদ এবং যারা হারিয়েছে প্রিয়জন, তাদের শূন্যতার দীর্ঘশ্বাস। এই চিত্রগুলো শুধু ছবি নয়; এগুলো এক একটি জীবন্ত দলিল---চিরন্তন প্রভাকর স্ফটিকের প্রতিফলন। "এগুলো কেবল শিল্প নয়, বরং জীবনের ক্যানভাসে আঁকা এক অনন্ত প্রত্যয়।"
"দেয়ালে লেখা বার্তাগুলো" ঢাবি ক্যাম্পাসের দেয়ালে অংকিত চিত্র ও বার্তাগুলো মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় সেসব দিনগুলোর কথা, যখন "বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জানবাজ নেতাকর্মিরা দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সহ সর্বস্থরের মানুষের ভালোবাসা, সমর্থন ও সহযোগিতায় ঐক্যবদ্ধভাবে বৈচিত্রময় কর্মসূচির মাধ্যমে ধাপে ধাপে দূর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল।
"বৈচিত্রময় কর্মসূচি"
"বাংলা ব্লকেড"
"রেড প্রোফাইল"
"মার্চ ফর জাস্টিস"
"মার্চ টু ঢাকা"
"বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিচিত্র শ্লোগান"
"আমি কে তুমি কে, রাজাকার, রাজাকার; কে বলেছে, কে বলেছে, স্বৈরাচার, স্বৈরাচার"
"এক দুই তিন চার, শেখ হাসিনা গদি ছাড়"
"চাইলাম অধিকার হয়ে, হয়ে গেলাম রাজাকার"
"আমার ভাই কবরে, খুনী কেন বাহিরে"
"বউদ্দিন হাইয়ু, আর ন হাইউ"
"আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম"
"আমার খায়, আমার পরে, আমার বুকেই গুলি করে'
"তোর কোটা তুই নে, আমার ভাই ফিরিয়ে দে"
"লাশের ভেতর জীবন দে, নইলে গদি ছাইড়া দে"
"আমার সোনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই"
"যে হাত গুলি করে, সে হাত ভেঙে দাও"
"আমার ভাই জেলে কেন" এবং
"গুলি করে আন্দোলন; বন্ধ করা যাবে না"
ইত্যাদি-ইত্যাদি।
"পটভুমি"এটি ছিল এমন একটি মুহূর্ত, যা ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের ভিত্তি তৈরি করে। ২৪ জুলাইয়ের এই গণহত্যা পুরো দেশকে ক্ষোভের আগুনে ফুঁসিয়ে তোলে। সেই ক্ষোভ থেকে উঠে আসে ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান, যা সরকারের পতন ঘটায় এবং বাংলাদেশের মানুষ দ্বিতীয়বারের মতো নিজেদের স্বাধীনতার এক নতুন অধ্যায় রচনা করে। এই আন্দোলন প্রমাণ করে, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্যই সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।
এই ছবিগুলো শুধু ইতিহাসের অংশ নয়; এগুলো আমাদের দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। আমাদের উচিত, এমন গণহত্যার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে ঐক্যবদ্ধ থাকা। স্মৃতি স্মারকগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচেতন করবে, যাতে অন্যায়, অবিচার এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার থাকা যায়।
২৪ জুলাইয়ের গণহত্যা ও দেয়ালে আঁকা এই স্মৃতিচিহ্ন গুলো আমাদেরকে বার বার স্মরণ করিয়ে দেয়,
রক্ত দিয়ে কেনা গণতন্ত্রের মর্ম। এগুলো শুধু অতীত নয় বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য অভাবনীয় প্রেরণার উৎস হিসেবে চির অম্লান হয়ে থাকবে।
(
Ali Yousuf এর ফেসবুক টাইমলাইন থেকে)
👉 👉 [এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পোস্টগুলো ফেসবুক এবং ইমেইল থেকে সংগৃহীত। উক্ত লেখার বক্তব্য ও দায়-দায়িত্ব লেখকের একান্ত নিজস্ব। তাই প্রকাশিত লেখার বিষয়ে কোনো মতামতের জন্য এডমিন দায়ী নয়।]
No comments