আলি ছিলেন পরিবারের বড় ছেলে, একটি নিবিড় ছায়ার মতো, ছোট ভাইদের জন্য যেন এক বিশাল বটবৃক্ষ। বাবা-মায়ের স্নেহের ছায়ায় বেড়ে ওঠা ছোট্ট সংসারটিতে ছিল খুশির অফুরন্ত সম্ভার। পড়াশোনায় অগাধ মনোযোগী আলির চোখে ছিল একদিন জীবনে বড় কিছু করার স্বপ্ন। তবে সেই স্বপ্নের আকাশে হঠাৎ নেমে এলো দুর্যোগের ঘনঘটা। তার বাবা, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, একদিন আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়লেন, এবং কিছুদিনের মধ্যেই তারা হারিয়ে গেলেন অজানার পানে। বাবার চলে যাওয়া যেন আলির জীবনের সমস্ত আলোকে এক নিমেষে নিভিয়ে দিলো। বাবার প্রস্থান আলিকে কেবল বড় ছেলে নয়, পুরো পরিবারের অভিভাবকের দায়িত্বে দাঁড় করিয়ে দিলো। সংসারের সমস্ত দায়িত্ব এখন তার কাঁধে। তার ছোট ভাই-বোনেরা তখনো শৈশবের সরলতায় ডুবে ছিল, জীবন সংগ্রামের তিক্ত স্বাদ থেকে তারা তখনো অনভিজ্ঞ। আলি বড় ভাই হিসেবে তাদের জন্য পথ প্রদর্শক হয়ে উঠতে হলো। নিজের পড়াশোনার মায়া ছেড়ে, সমস্ত স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সে হাতে তুলে নিলো বাবার রেখে যাওয়া ছোট্ট দোকানের ভার। দোকানটি তখন থেকে হয়ে উঠলো পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন।
প্রতিদিন ভোরে দোকান খুলতে গিয়ে আলির মনে হতো, সে যেন এক যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করছে। সমাজের নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি তাকে হতে হতো। আশেপাশের অনেকেই তার এই সংগ্রামকে গুরুত্ব না দিয়ে বিদ্রূপ করতো। কেবল পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই নয়, ছোটদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্যও তাকে রোজ রোজ এই অদৃশ্য যুদ্ধ লড়তে হতো।
তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতো। তবে আলি হাল ছাড়েনি। ছোট ভাইবোনেরা যখন আশায় বুক বাঁধে, তখন আলির মনে হয়, তার দায়িত্ব তাদের স্বপ্নকে রক্ষা করা। প্রতিটি বাধার মধ্যে দাঁড়িয়েও, বড় ভাইয়ের মতো সে তাদের পাশে থাকার অঙ্গীকারে অটল রইলো।
তার একমাত্র সান্ত্বনা ছিল বই। দোকানের কাজের ফাঁকে, ক্লান্ত সন্ধ্যায় কিংবা গভীর রাতে, যখন ঘুম তার চোখের পাতায় ভর করে না, তখন বইয়ের পাতায় সে খুঁজে পেতো নতুন প্রেরণা। বইগুলো যেন তাকে বোঝাতো, জীবন মানেই সংগ্রাম, আর প্রতিটি সংগ্রাম এক নতুন শক্তির উৎস।
এক রাতে, সব কাজ শেষে ক্লান্ত আলি আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। দূরে, অগণিত তারার মাঝে কয়েকটি আলোর বিন্দু মিটমিট করে জ্বলছিল। তার মনে হলো, তার জীবনও এই আকাশের মতো—গভীর অন্ধকারে ঢাকা, কিন্তু কোথাও যেন এক ফালি আশার আলো অপেক্ষা করছে। বড় ভাইয়ের দায়িত্বে নিজেকে বলিষ্ঠ রেখে, সে জানে, হয়তো একদিন এই সংগ্রাম শেষ হবে, হয়তো তার ছোট ভাইবোনেরা আলোর পথে এগিয়ে যাবে।
আলির জীবন যেন আমাদের বলে, একজন বড় ভাই কীভাবে ত্যাগের সীমা ছাড়িয়ে পরিবারের অভিভাবক হয়ে ওঠে। জীবন যত কঠিনই হোক, পরিবারের ভালোবাসার জন্য সে সংগ্রাম করতে কখনো পিছপা হয় না। আলি জানে, সে এক অজানা পথের যাত্রী—তবে এই পথই তার নিজের জন্য নয়, তার পরিবারকেও আলোর ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
(
ফেসবুকের গল্প-Facebooker Golpo ফেসবুক গ্রুপ থেকে সংগৃহীত)
👉 👉 [এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পোস্টগুলো ফেসবুক এবং ইমেইল থেকে সংগৃহীত। উক্ত লেখার বক্তব্য ও দায়-দায়িত্ব লেখকের একান্ত নিজস্ব। তাই প্রকাশিত লেখার বিষয়ে কোনো মতামতের জন্য এডমিন দায়ী নয়।]
No comments