গভীর রাতের নিস্তব্ধতায় আরমান ক্লান্ত চোখে চুপচাপ বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। দূরের আকাশে পূর্ণিমার ১৬ কলায় পূর্ণ চাঁদটি জ্যোৎস্না ঢেলে আলোয় ভরিয়ে দিচ্ছে পৃথিবী, কিন্তু তার জীবন যেন অমানিশার ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত। আশাহত জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে যেন সে ভুল পথে পা বাড়িয়েছে, যে পথ ধরে সে পৌঁছে গেছে হতাশার এক গহীন বালুচরে। যেখানে শান্তির কোনো আভাস নেই আর ভালোবাসার কোনো ছোঁয়া নেই কোথাও।
আরমানের ছোট্ট সংসার। স্ত্রী আর সন্তানদের জন্য প্রতিদিন ক্লান্তিহীন সংগ্রামে লিপ্ত সে। শ্রম-ঘাম আর সাধনার প্রতিটি মুহূর্তে সে যেন এক অদৃশ্য শৃঙ্খলে আবদ্ধ। অনেকদিন আগে, যখন তার মনে ছিল কেবল স্বপ্ন, মনে হয়েছিল সে একদিন বড় কিছু করবে—নিজের প্রতিভা, আত্মবিশ্বাস আর আদর্শে ভরে তুলবে জীবনের বিস্তীর্ণ অঙ্গন। কিন্তু বাস্তবতার কঠিন ভারে তার ছোট্টবেলার সেই স্বপ্নগুলো আজ যেন একটি ধুলিমলিন শুকনো খেজুরের ঢাল। প্রিয় মানুষের ভালোবাসার মধ্যে আশ্রয় খুঁজতে চেয়েছিল, সেটাও পেলনা, চারপাশে কেবল হিংসা আর ষড়যন্ত্রের বিষবাষ্প ছড়িয়ে আছে। আপন মানুষের ছলনা, অবহেলা ও অন্যায়ের প্রতি অবিরাম আপোস আর প্রিয়জনের আঘাতে তার হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে। তবু ভালোবাসার কাঙাল এই মানুষটি চেয়েছিল সবকিছু ভুলে সত্যিকারের প্রেমের চাদরে নিজেকে আটকে থাকতে, ভালোবাসার একটু পরশ পেতে, চেয়েছিল একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে।
জীবনের কঠোর ও কঠিন বাস্তবতায় ভেঙে পড়েও, আরমান কখনো হারাতে দেয়নি তার আদর্শ। প্রতিদিন সাদা মেঘের মত স্বপ্ন বুনতে বুনতে নিজেকে সে বারবার নতুন করে গড়ে তোলে। যেন এক সশস্ত্র যোদ্ধা। কিন্তু তার এই যাত্রায় যেন তার নিজস্ব রূপান্তর ঘটে না—কষ্টের মাঝে সবকিছু রুক্ষ হয়ে ওঠে। আর্থিক অনটন, সমাজের অবজ্ঞা আর বাস্তবতার চাপ তাকে মানসিক যন্ত্রণায় পিষ্ট করে দিয়েছে বারবার। তার এই জীবন যেন এক উতপ্ত মরুভূমি, যেখানে তৃষ্ণার্ত আত্মা আর ক্লান্ত দেহ নিয়ে সে হাঁটছে, অথচ সামনের দিগন্তে নেই কোনো আশার জলধারা। কিছুদিন আগেও তাকে যারা দেখত স্বপ্নের চোখে, আজ তারা তাকে বাস্তবতার ক্ষুদ্রতম উপলব্ধি হিসেবে দেখে—যে মানুষটি জীবনযুদ্ধে জিততে চেয়েছিল বার বার, আজ সেই মানুষটি যেন হারিয়ে যাচ্ছে অচেনা এক দুঃস্বপ্নের স্রোতে। চতুর্দিকে মিথ্যার সয়লাব, যেন সত্য এখানে ক্ষীণ আলোর এক ঝলক মাত্র। যা হয়তো কোনোদিন তার জীবনে প্রবেশ করতে পারবে না।
তবু, এই মরুময় জীবনের সাইমুম আঁধারের মাঝে দাঁড়িয়ে আরমান এক অবিশ্বাস্য সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। তার জীবনযুদ্ধ থামানো যাবে না। সে বড় হয়ে ওঠা এক বটবৃক্ষের মতো—ঝড়-ঝাপটা সহ্য করেই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। জীবনের আদর্শকে আঁকড়ে ধরে সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য তাকে এগুতে হবে, তার সবপ্ন; যা কখনো ক্ষত-বিক্ষত হতে পারে না। যখন তার মেয়ে রাতে বাবার গা ঘেঁষে ঘুমায়, তখন আরমানের হৃদয় বলে ওঠে, "এই জীবন শুধু আমার নয়, এই সংগ্রাম আমার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য।"
অথচ, মাঝে মাঝে, আরমানের মধ্যে এক গভীর যন্ত্রণার ঝংকার বাজে—কি হবে তার পরিণতি? আদর্শের জয়ের দিন আসবে তো? তবে সে জানে, যে সত্যিকার মানুষ নিজের আদর্শের পথে হাঁটে, তার পথ কখনো মাটি হবে না। জীবন যতই কঠিন হোক, প্রতিটি পদক্ষেপে সে অনুভব করে, যে গাছটি রুক্ষ শীতের মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়ায়, একদিন তা অপূর্ব ফুলে সুশোভিত হবেই।
ভালোবাসার অভাব আর অর্থের অনটন তার এই জীবনকে যতই বেদনাহত করুক, আরমান এরই মধ্যে জেনে ফেলেছে, সত্যের জয় অনিবার্য। একদিন মিথ্যার পরাজয় হবেই, আর সেই দিন তার অন্ধকার জীবন আলোর পূর্ণেন্দু হয়ে ফুটবে। যে আলো তার ছোট্ট মেয়ে আর তার পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবে। বাস্তবতার নিরিখে হয়তো সেই আলো আজ অনেক দূরে, কিন্তু আশার ভেলা ভাসিয়ে রেখে, আরমান তার এই ক্লান্তিহীন জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যেতে সংকল্পবদ্ধ।
তার ভাবনায়, পদক্ষেপে, তার শ্বাসে, কোথাও কোথাও একটু সঙ্কুচিত, একটু থমকে থাকা অনুভূতির ঢেউ উঠলেও, আবারও এক নিরন্তর পথচলার সঙ্কল্পে আছন্ন হয়ে উঠে—সে জানে, সে বিশ্বাস করে, একদিন এই সংগ্রামের পরেই মুক্তি, একদিন এই সমাজের কোলাহলে, মানুষের ভালোবাসায় সে নিজেকে নতুন করে নতুন আঙ্গিকে খুঁজে পাবে।
(
ফেসবুকের গল্প-Facebooker Golpo ফেসবুক গ্রুপ থেকে)
👉 👉 [এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পোস্টগুলো ফেসবুক এবং ইমেইল থেকে সংগৃহীত। উক্ত লেখার বক্তব্য ও দায়-দায়িত্ব লেখকের একান্ত নিজস্ব। তাই প্রকাশিত লেখার বিষয়ে কোনো মতামতের জন্য এডমিন দায়ী নয়।]
No comments