• সাম্প্রতিক

    এক 'নষ্ট' মেয়ের গল্প.....

    “বাঙালি মেয়ে হয়ে হোটেলে নাচবে?” পুলিশ অফিসার জিজ্ঞেস করেন তাকে।
    “ক্যান, আপনে আমারে খাওয়াইবেন? রাখবেন আপনার বাড়িতে? ঝি হইয়া কিন্তু থাকুম না, মেয়ের মতো রাখতে হইব। তাইলে আমি হোটেলে নাচুম না।”
    বারো বছরের মেয়েটি বার ডান্সারের লাইসেন্স নিতে গিয়েছিল কলকাতা পুলিশের সদর দপ্তরে। সেখানেই এই কথোপকথন। যে বয়সে মেয়েরা বিনুনি বেঁধে স্কুলে যায় বা এক্কাদোক্কা খেলে সেই বয়সে একটা মেয়ে কিনা নাচনি হতে চায় ! উপায়টাই বা কি, পেটের জ্বালা যে বড় জ্বালা।
    সন ১৯৪৭, ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে গেল একটা দেশ। আর তার সাথে ভাগ হয়ে গেলো দুটো প্রদেশ, বাংলা ও পাঞ্জাব। হাজার বছর ধরে পাশাপাশি বসবাস করা, একই ভাষায় কথা বলা লোকজন হঠাৎ করেই জানতে পারে দুটো আলাদা জাতে পরিণত হয়েছে তারা। শুধু তাই নয়, মাঝখানে উঠে গেছে কাঁটাতারের বেড়া। শুরু হলো বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মহানিষ্ক্রমণ। একদিন যারা বৃষ্টিভেজা সবুজ গাছগাছালি ঘেরা কুটিরে বাস করতো শান্তিতে, তাদের ঠিকানা হলো রেল প্লাটফর্ম কিংবা অস্বাস্থ্যকর বস্তি অঞ্চলে। রাতারাতি তাদের পরিচয় হলো উদ্বাস্তু।
    মেয়েটির নাম আরতি দাস। জন্ম পূর্ববাংলার নারায়ণগঞ্জে। ওপার বাংলা থেকে যেদিন বাবা মায়ের হাত ধরে কোলকাতায় আসে তখন বয়স এক বছরেরও কম। প্রথমে শেয়ালদা স্টেশন তারপর একে ওকে ধরে আহিরীটোলায় মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই হলো। সামান্য যে সোনাদানা আনতে পেরেছিলো তা বেচে চললো কিছুদিন তারপর মা বাবুদের বাড়িতে আর বাবা এক দোকানে কাজ নিলো। সামান্য আয়ে পাঁচটা পেট চালানো মুস্কিল। এরকম আধপেটা খেয়ে দিন চালানোর বিরুদ্ধে আরতি বিদ্রোহ করে বসলো একদিন। দুদিন ঘোরাঘুরি করে এক এ্যাংলো ইন্ডিয়ান পরিবারের কাজ জুটিয়ে নেয়। বয়স তখন তার মাত্র এগারো।
    এই এ্যাংলো পরিবারে প্রায় সন্ধ্যায় রেকর্ড প্লেয়ারে গান চালিয়ে নাচানাচি হতো। পাশের ঘরে পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে আরতি দেখতো, চেষ্টা করতো তাদের নাচ নকল করতে। সে বাড়ির পার্টিতে নিয়মিত আসতো ভিভিয়েন হ্যানসেন, পার্ক স্ট্রিটের ‘মোক্যাম্বো’ রেস্তরাঁর এক গাইয়ে। তার চোখে একদিন ধরা পড়ে গেল আরতির প্রচেষ্টা। তাকে নিয়ে হ্যানসেন গেলো চৌরঙ্গির ‘ফারপোজ’-এ। হ্যানসেনের সুপারিশে মাসিক সাতশো টাকা বেতনে কাজ পেলো আরতি। সাদা চামড়ার মেয়েরা তখন দেশ ছাড়ায় হোটেলে বার ডান্সারের তীব্র অভাব। কাঠখড় পুড়িয়ে হাতে এসেছিল লাইসেন্স। প্রতি রাতে বার-নর্তকী হওয়ার ছাড়পত্র। দর্শকদের সামনে আসার আগে চলেছে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ।
    সেই প্রশিক্ষণেই দেওয়া হয়েছিল পোশাক যা পরে তাকে প্রতি রাতে নাচতে হবে। দেখে অঝোরে কেঁদেছিল মেয়েটা। এতটা নিরাবরণ হয়ে আসতে হবে রাতের আসরে! ধীরে ধীরে একদিন সেই লজ্জাটুকু ভুলে গেলো, মন দিলো অনুশীলনে। প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে একদিন উদ্বাস্তু আরতি দাসের পায়ে উঠে এল ক্যান ক্যান, চার্লসটন, টুইস্ট, হাওয়াইয়ান হুলা এবং বেলি ডান্স। হোটেল থেকে নাম রাখা হয় শেফালি, মিস শেফালি। জৌলুসময় এক ক্যাবারে ড্যান্সারের আড়ালে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় নারায়ণগঞ্জে জন্ম নেওয়া আরতি নামের সাদামাটা মেয়েটা।
    ফিরপোজ হোটেলের পর থেকে আর কখনোই পিছু ফিরতে হয়নি শেফালিকে। সেখান থেকে ওবেরয় গ্রান্ড, সতেরো বছর ধরে প্রতি রাতে নেচেছেন, আনন্দ যুগিয়েছেন পুরুষের পিয়াসু দৃষ্টিকে। রাতের কলকাতা তখন সম্মোহিত তাঁর নামে। তার মাঝেই এল সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় ফিল্মে কাজ করার সুযোগ। নামের পাশে বসল ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ এবং ‘সীমাবদ্ধ’তে কাজের অভিজ্ঞতা। বড় পর্দায় অভিনয়ের পাশাপাশি এল থিয়েটার। তরুণকুমারের উদ্যোগে মঞ্চেও দেখা গেল মিস শেফালিকে। প্রতাপ মঞ্চে নাটক "বারবধু" হাজার রজনীর ওপর চলেছে শুধু তার নামে।
    অর্থ সাফল্য সবকিছু পেলেও পাননি সামাজিক স্বীকৃতি বা নারীর মর্যাদা। বিনোদন জগতের অনেক নামকরা মানুষ এসেছিলো জীবনে, কিন্তু তাদের চোখে দেখেছিলেন শুধু লাম্পট্য। বার ড্যান্সার বলে অনেক শিল্পীই যে তাঁকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতো, উপেক্ষা করতো, সেটাও তিনি অকপটে স্বীকার করে গেছেন তার আত্মজীবনী 'সন্ধ্যা রাতের শেফালি'তে। নিঃসংকোচে সেখানে লিখেছেন, "হোটেল নাইট ক্লাবে নাচি বলেই আমি খারাপ মেয়ে হয়ে গেলাম? ওপার বাংলা থেকে এক কাপড়ে পালিয়ে আসা একটা রিফিউজি পরিবারের দু’বেলা ঠিকমতো খেতে না পাওয়া একটা মেয়ে সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায়, কী কষ্ট করে, কী পরিশ্রম করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, সেটা তাঁরা কেউ দেখতে পেলেন না? একলা মেয়েটার লড়াইটা ওঁদের চোখ এড়িয়ে গেল? এমনকি সিনেমা জগতে যারা বামপন্থী বলে পরিচিত তাঁরাও কেউ আমার পরিশ্রম, আমার লড়াইটা দেখতে পেলেন না!"
    ঘর সংসারের মতো অধরা থেকে গেল ‘শিল্পী’ পরিচয়ও। আরতি দাস নৃত্যশিল্পী নন। অভিনেত্রী নন। তিনি শুধুই মদিরা-আসরের ‘মিস শেফালি’। পরিচয় নিয়ে আক্ষেপ ছিল না। আক্ষেপ ছিল স্বীকৃতি না পাওয়া নিয়ে। একরাশ অভিমান বুকে নিয়ে চলে গিয়েছেন তিনি, যেখানে যেতে অন্তত কোন সামাজিক স্বীকৃতির প্রয়োজন হয় না!

    কলমে ✍🏻 স্বপন সেন

    জানার কোন শেষ নাই ফেসবুক গ্রুপ থেকে সংগৃহীত) 




    👉 👉 [এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পোস্টগুলো ফেসবুক এবং ইমেইল থেকে সংগৃহীত। উক্ত লেখার বক্তব্য ও দায়-দায়িত্ব লেখকের একান্ত নিজস্ব। তাই প্রকাশিত লেখার বিষয়ে কোনো মতামতের জন্য এডমিন দায়ী নয়।]

    No comments

    Post Top Ad

    ad728

    Post Bottom Ad

    ad728

    আমরা আপনাকে বিনামূল্যে আমাদের আপডেট গুলি পাঠাতে যাচ্ছি। প্রথমে আপনার অনুলিপি সংগ্রহ করতে, আমাদের মেইলিং তালিকায় যোগ দিন। আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, অকেজো তথ্য প্রেরণ করে আপনাকে বিরক্ত করবো না। সুতরাং কোনও আপডেট মিস করবেন না, সংযুক্ত থাকুন!