
ভারতে দলিত সম্প্রদায় সামাজিক বৈষম্য ও সহিংসতার শিকার হচ্ছে দীর্ঘকাল ধরে। এদের ওপর ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা মানবিকতার গভীর সংকটকে প্রকাশ করে। মুম্বাইয়ে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে এই নিপীড়নের চিত্রগুলো ফুটে উঠেছে, যা ফটোগ্রাফার সুধারাক ওলভের ক্যামেরায় ধারণ করা। সরকারি তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ সালেই দলিতদের বিরুদ্ধে ৪০,০০০ এর বেশি অপরাধের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে।
কিছু মর্মান্তিক ঘটনা:
২০১৫ সালে মহারাষ্ট্রের শিরদি শহরে নার্সিং ছাত্র সাগর সেজওয়াল একটি বন্ধুর বিয়েতে গিয়ে উচ্চবর্ণের আটজন ব্যক্তির ক্রোধের শিকার হন। তাঁর ফোনের রিংটোনে দলিত নেতা ড. বি আর আম্বেদকরের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো গান বাজতে থাকলে তা তাদের অপছন্দ হয়। ঝগড়া থেকে মারধরে পরিণত হয়ে তাঁকে মাঠে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ময়নাতদন্তে জানা যায়, সেজওয়ালের দেহে একাধিক হাড় ভাঙার চিহ্ন ছিল এবং তাঁকে মোটরবাইক দিয়ে পিষে ফেলা হয়েছিল। অভিযুক্তরা জামিনে মুক্তি পেলেও সেজওয়ালের পরিবার এখনও ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করছে।
- মানিক উদাগের নির্মম পরিণতি:
পুনেতে ২০১৪ সালে দলিত যুবক মানিক উদাগে ড. আম্বেদকরের জন্মদিনে একটি বড় অনুষ্ঠান আয়োজন করেন। উচ্চবর্ণের প্রতিবেশীরা এই উদ্যোগে বাধা দিয়েছিল এবং স্থান পরিবর্তনের জন্য চাপ দিয়েছিল। উদাগে তাদের কথায় কর্ণপাত না করায় তাকে তাঁর বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে পাথরের খনিতে হত্যা করা হয়। অভিযুক্ত চারজনকে গ্রেফতার করা হলেও উদাগের পরিবার এখনও ভয় এবং নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে।
- নিতিন আগের শ্বাসরোধ ও গাছে ঝোলানো দেহ:
২০১৪ সালের খাদরা গ্রামে, ১৭ বছরের নিতিন আগেকে উচ্চবর্ণের এক মেয়ের সঙ্গে কথা বলার কারণে হত্যা করা হয়। ময়নাতদন্তে দেখা যায়, তাঁকে শ্বাসরোধে হত্যা করার পর গাছ থেকে ঝুলিয়ে আত্মহত্যার নাটক সাজানো হয়। মামলার ১৩ জন অভিযুক্ত ২০১৭ সালে বেকসুর খালাস পায়। নিতিনের পরিবার পুনর্বিচারের দাবি জানালেও দীর্ঘদিনেও ন্যায়বিচার পাননি।
- পানির অভাবে রাজশ্রী কাম্বলের মৃত্যু:
মহারাষ্ট্রের একটি গ্রামে ২০১৬ সালে ১০ বছরের রাজশ্রী কাম্বলে পানির অভাবে মৃত্যুবরণ করে। খরার কারণে গ্রামে পানি সরবরাহ বন্ধ থাকলেও দলিতদের এলাকায় তা পুনরায় চালু করা হয়নি। রাজশ্রীর পিতা নামদেব কাম্বলে গ্রামের মাতব্বরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চাইলেও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কারণে তা সম্ভব হয়নি।
- মাধুকর ঘাদজের কুয়া খননকে কেন্দ্র করে হত্যা:
২০১৪ সালে ৪৮ বছর বয়সী মাধুকর ঘাদজে তাঁর নিজের জমিতে একটি কুয়া খনন করায় প্রতিবেশী উচ্চবর্ণের ১২ জনের ক্ষোভের শিকার হন। তাঁকে নির্মমভাবে আঘাত করে হত্যা করা হয়। মামলায় অভিযুক্তরা প্রমাণের অভাবে খালাস পেলেও তাঁর পরিবারের অভিযোগ, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কারণে বিচারপ্রক্রিয়া প্রভাবিত হয়েছে।
২০০৯ সালে ১৮ বছর বয়সী রোহান কাকাদের শিরশ্ছেদ করে মরদেহ পুড়িয়ে ফেলা হয়। তাঁর অপরাধ ছিল, তিনি উচ্চবর্ণের এক তরুণীর সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছিলেন। ঘটনার পর তাঁর মা বিচার চেয়ে বারবার আদালতে গিয়েছেন, কিন্তু অভিযুক্তরা প্রভাবশালী হওয়ায় সবাই খালাস পেয়েছে।
প্রত্যেকটি ঘটনা দলিত সম্প্রদায়ের প্রতি সহিংসতা ও বিচারহীনতার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। এই বৈষম্যের অবসান না হলে ভারতের সমাজে প্রকৃত সাম্য প্রতিষ্ঠা অসম্ভব।
বিচার ও আইনের ব্যর্থতা:
অধিকাংশ ঘটনায় অভিযুক্তরা জামিনে মুক্তি পেয়েছে বা প্রমাণের অভাবে খালাস পেয়েছে। ফলে দলিত সম্প্রদায় এখনও নিরাপত্তাহীনতা এবং আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। নিতিন আগের পরিবারের মতো অনেকে পুনর্বিচারের দাবি জানালেও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ভারতের দলিতদের উপর চলমান সহিংসতা শুধু ব্যক্তিগত নির্যাতনের নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের প্রতিচ্ছবি। সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগ, জনসচেতনতা এবং বৈষম্যহীন এক ভারতের।
(
ফেসবুকের গল্প-Facebooker Golpo - এর ফেসবুক আইডি থেকে সংগৃহীত)
👉 👉 [এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পোস্টগুলো ফেসবুক এবং ইমেইল থেকে সংগৃহীত। উক্ত লেখার বক্তব্য ও দায়-দায়িত্ব লেখকের একান্ত নিজস্ব। তাই প্রকাশিত লেখার বিষয়ে কোনো মতামতের জন্য এডমিন দায়ী নয়।]
No comments