ডিসেম্বরের সেই শীতল সকালটি অন্য সাধারণ দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। ঢাকার শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির মাঠে ছুটির দিনে খেলা করতে বেরিয়েছিল শিশু জিহাদ, মাত্র ৪ বছর বয়সী এক ছোট্ট শিশু। খেলার মাঠের এক কোণে ছিল একটি পরিত্যক্ত পাইপ—কূপ খননের জন্য খোলা রাখা হয়েছিল। সেই পাইপটি ছিল যেন এক ভয়ঙ্কর মরণ ফাঁদ। রেলওয়ে ও ওয়াসা কর্তৃপক্ষ অরক্ষিতভাবে ফেলে রেখেছিল, যা নিতান্তই অবহেলার প্রতীক। কিছুক্ষণ খেলতে খেলতে জিহাদ হঠাৎ করে সেই পাইপের পাশে চলে যায়।
কৌতূহলী ছোট্ট মনের কাছে এই পাইপটি যেন ছিল এক রহস্যময় স্থান। কোনরকম নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই খোলা রাখা এই পাইপটি ছিল অবহেলাজনিত বিপদের অপেক্ষায়। মুহূর্তেই জিহাদ সেই পাইপে পড়ে যায়, আর তারপর শুরু হয় এক ভয়াবহ সময়ের হিসাব।
জিহাদের মা-বাবা এবং স্থানীয়রা দ্রুত খুঁজতে শুরু করে, কিন্তু তাকে খুঁজে পাওয়ার কোন উপায় ছিল না। তারা সাহায্যের জন্য ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেয় এবং ফায়ার সার্ভিস এসে দীর্ঘ ২৩ ঘণ্টা ধরে উদ্ধার অভিযান চালায়। কিন্তু প্রযুক্তি এবং দক্ষতার অভাব এবং দায়সারা মনোভাবের কারণে ফায়ার সার্ভিস শিশুটিকে জীবিত উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়।
এই দীর্ঘ ২৩ ঘণ্টার অভিযানে এলাকার মানুষ ধৈর্য ধরলেও, তাদের মনে একটিই প্রশ্ন বারবার ঘুরছিল—“আমাদের এত আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও কেন শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না?” ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের হতাশাজনক কার্যক্রম দেখে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। ফায়ার সার্ভিসের ব্যর্থতার পর হতাশ ও বাকরুদ্ধ জনতা এক পর্যায়ে নিজেরাই স্থানীয় যন্ত্রপাতি নিয়ে মাঠে নামে। সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা এবং সরঞ্জাম ব্যবহারের মাধ্যমে অবশেষে জিহাদের নিথর দেহটি উদ্ধার কর্যে সক্ষম হয়। সেদিন এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য সকলের হৃদয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। সারাদেশের মানুষ নিরবে কেঁদেছিল সেদিন।
জিহাদের মায়ের হৃদয় ভেঙে গেল তার ছেলেকে নিথর অবস্থায় দেখে। সবার মনে একটাই প্রশ্ন, "কেন এমনটা ঘটলো?" এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য তখন রেলওয়ে ও ওয়াসার দায়িত্বহীনতা, এবং তাদের অরক্ষিত পাইপের অবহেলা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। রেলওয়ে ও ওয়াসা কর্তৃপক্ষ সেই পাইপটি বহুদিন ধরে অরক্ষিতভাবে ফেলে রেখেছিল, যার ফলে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটল। কোনো নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, এমনকি সাধারণ মানুষকে সতর্ক করার মতো কোনো সাইনবোর্ডও ছিল না।
এ ঘটনার পর সারা দেশে মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। পত্রিকা, টেলিভিশন, এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই বিষয়ে আলোচনা হয়। সবাই জানাতে শুরু করে তাদের হতাশা এবং ক্ষোভ। ফায়ার সার্ভিসের ব্যর্থতা এবং রেলওয়ে-ওয়াসার অবহেলা নিয়ে মানুষ সরব হয়ে ওঠে। এই ঘটনায় সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া তীব্র ও বেদনাময় ছিল, এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রশ্ন ওঠে।
জিহাদের করুণ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন রেলওয়ে ও ওয়াসার দায়িত্বহীনতার চিত্র ফুটে উঠেছে, তেমনি সাধারণ মানুষের একতাবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে উদ্ধার কার্যক্রমের সফলতা সবাইকে এক নতুন শক্তি দিয়েছে। কিন্তু ততক্ষণে জিহাদের পরিবারের জন্য সময়টা থেমে গিয়েছিল—তাদের ছোট্ট সন্তান আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।
জিহাদের করুণ মৃত্যু আমাদের সামনে প্রশ্ন তোলে—কেন সরকারি সংস্থাগুলোর অবহেলা এমন বিপদের কারণ হয়? কেন সেই অরক্ষিত পাইপটি দীর্ঘদিন ধরে ফেলে রাখা হয়েছিল?
এই ঘটনা সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও তদারকির অভাবকে প্রকাশ করে। প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা ও সমন্বয়ের অভাবে জিহাদের মৃত্যু ঘটেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে পরিত্যক্ত স্থাপনা সুরক্ষার পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোর ব্যবস্থাপনায় দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন।
( দেশের গল্প-দশের গল্প/জীবনের গল্প-যৌবনের গল্প' ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত )
👉 👉 [এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পোস্টগুলো ফেসবুক এবং ইমেইল থেকে সংগৃহীত। উক্ত লেখার বক্তব্য ও দায়-দায়িত্ব লেখকের একান্ত নিজস্ব। তাই প্রকাশিত লেখার বিষয়ে কোনো মতামতের জন্য এডমিন দায়ী নয়।]
No comments