"ডকট্রিন অব নেসেসিটি"-কি ও কেন?
ডকট্রিন অব নেসেসিটি কি ও কেন?
ডকট্রিন অব নেসেসিটি বা "অবশ্যকতার তত্ত্ব" হলো এমন একটি আইনগত নীতি, যা বিশেষ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেয়, যেখানে বিদ্যমান আইন বা নিয়মাবলী কার্যকর রাখার চেয়ে রাষ্ট্রের সুরক্ষা ও স্থিতিশীলতাই মুখ্য বিবেচনা হিসেবে দেখা হয়।
"এটি এমন একটি আইনগত ভিত্তি, যা বিশেষ পরিস্থিতিতে যখন প্রচলিত আইন মেনে চলা সম্ভব হয়না, তখন জনস্বার্থে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়।" ডকট্রিন অব নেসেসিটি এমন পরিস্থিতিতে কার্যকর যেখানে সংবিধান বা প্রচলিত আইন অনুসরণ করা সম্ভব নয়। এটি আইনগত সংকট নিরসনে সরকারকে অবিলম্বে কার্যক্রম গ্রহণের অনুমতি দেয়। (উইকিপিডিয়া)
ডকট্রিন অব নেসেসিটির প্রবর্তন :
১৯৫৪ সালে পাকিস্তানের বিচারপতি মুহাম্মদ মুনির প্রথমবার এই নীতি প্রণয়ন করেন, যা পরে বিশ্বজুড়ে বেশ কিছু দেশে অনুসরণ করা হয়েছে। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তানে, গভর্নর জেনারেল মুল্লা গোপীনাথের অধীনে ক্ষমতা গ্রহণের বৈধতা নিয়ে সংকট দেখা দেয় এবং বিচারপতি মুনির ডকট্রিন অব নেসেসিটির অধীনে এই ক্ষমতাকে বৈধতা দেন।
বিশ্বে ডকট্রিন অব নেসেসিটি প্রয়োগের উদাহরণ :
পাকিস্তান
*১৯৫৮ ও ১৯৭৭*: সামরিক শাসনের সময় এই নীতি প্রয়োগ করা হয়। জেনারেল আয়ুব খান ১৯৫৮ সালে দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাতে সামরিক শাসন জারি করেন, যা বিচারপতি মুনিরের দ্বারা বৈধতা লাভ করে।
গ্রেনাডা
*১৯৮৩*: মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নতুন সরকারের প্রতিষ্ঠার সময় ডকট্রিন অব নেসেসিটির প্রয়োগ করা হয়, যা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার দাবিতে ভিত্তি করে গঠিত হয়।
জিম্বাবুয়ে
*২০১৭* : রবার্ট মুগাবের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা হয়, এবং এই পরিস্থিতিতে ডকট্রিন অব নেসেসিটির অধীনে সাংবিধানিকভাবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়।
মিশর
*২০১৩* : সালে মিশরের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ মুরসিকে অপসারণের পর সামরিক বাহিনী "ডকট্রিন অব নেসেসিটি" প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করে।
*২০১৬* : সামরিক অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টার পর রাষ্ট্রীয় জরুরি অবস্থার অধীনে সরকার আইনগত পদক্ষেপ নেয়, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।
ফিজি
*২০০৬* : ফিজির প্রধানমন্ত্রী লেসেতে ফিলিপসের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থানের পর সামরিক সরকার গঠন করা হয়। এই অভ্যুত্থানকে ডকট্রিন অব নেসেসিটির আওতায় বৈধতা দেওয়া হয়, যা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার অবসান ঘটানোর উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়েছিল।
ফিনল্যান্ড
*১৯১৭* : ফিনল্যান্ডের স্বাধীনতা ঘোষণার সময়, রাশিয়ার সামরিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার সুযোগে নতুন সরকারের গঠনে এই নীতি প্রয়োগ করা হয়, যা ফিনল্যান্ডের রাজনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
কেনিয়া
*২০০২* : রাষ্ট্রপতি ড্যানিয়েল আরাপ ময় দ্বারা সরকার গঠনের সময় রাজনৈতিক সংকটের কারণে ডকট্রিন অব নেসেসিটির প্রয়োগ করা হয়। এই সময় ক্ষমতা সংক্রমণকে সহজতর করতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উদাহরণ :
*১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট*: বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর অসাংবিধানিকভাবে সরকার পরিবর্তন করা হয়, যেখানে খন্দকার মোশতাক আহমেদ ক্ষমতায় আসেন।
*১৯৮২ সালের সামরিক অভ্যুত্থান*: এইচ. এম. এরশাদের অধীনে সরকার উৎখাত হয়, যেখানে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার অজুহাতে নয়া শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
*২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার*: রাজনৈতিক সংকটের সময়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে সেনা সমর্থিত সরকার গঠন করা হয়, যা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা ছিল।
*২০১৩ সালের নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন*: নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের কারণে বিশেষ কমিশন গঠন করা হয়, যা ডকট্রিন অব নেসিটির প্রয়োগের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত।
*২০২০ সালের করোনা মহামারির সময়*: করোনার প্রভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে সরকার জরুরি আইন পাস করে, যা স্থিতিশীলতার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা।
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর ফ্যাসিস্ট দলীয় আনুগত্য এবং বিতর্কিত অবস্থান দেশের নতুন সরকারের সাথে সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা জনগণের আস্থার জন্য হুমকিস্বরূপ। সাংবিধানিকভাবে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করা রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব হলেও, ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পুনর্বাসন ও পদত্যাগের প্রশ্নে তাঁর দ্বিমুখী বক্তব্য এবং সন্দেহজনক ভূমিকা জনগণের মধ্যে টানাপোড়েন ও উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
বিশেষত, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ও বিপ্লবী জনগণের ব্যাপারে রাষ্ট্রপতির অস্বচ্ছ ভূমিকা, দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও জনগণের ভাগ্য নির্ধারণে এক অস্থির পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। যা দেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জুলাই বিপ্লবের চেতনা বিপন্ন করার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
বিশিষ্টজনের মতামত :
ড. কামাল হোসেন : "রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য সাংবিধানিক বিধি উপেক্ষা করার যুক্তিসঙ্গতা প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির নিয়োগের জন্য ডকট্রিন অব নেসেসিটির প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি।" (সূত্র: কামাল হোসেন, "Constitutional Law in Bangladesh," Oxford University Press, 2022)
ব্যারিস্টার আমির উল ইসলাম : "বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা মোকাবেলায় দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।" -- যা ডকট্রিন অব নেসেসিটির প্রয়োগকে সমর্থন করে।" (সূত্র: আমির-উল ইসলাম, "Legal Perspectives on Political Stability in Bangladesh
ব্যারিস্টার আমির উল ইসলাম ; "বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা মোকাবেলায় দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যা ডকট্রিন অব নেসেসিটির প্রয়োগকে সমর্থন করে।" (সূত্র: আমির-উল ইসলাম, "Legal Perspectives on Political Stability in Bangladesh," Dhaka Law Review, 2023)
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ : "বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকটের কারণে পক্ষপাতদুষ্ট রাষ্ট্রপতির অপসারণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট। রাষ্ট্রপতির নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে এই নীতি প্রয়োগ করা উচিত।" (সূত্র: International Crisis Group, "Bangladesh in Crisis: Political Turmoil and Human Rights Concerns," 2023)
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ : "সরকারের নিয়ন্ত্রণের জন্য যখন রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয়, তখন গণতন্ত্রের স্বার্থে এধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।" (সূত্র: Human Rights Watch, "Impartiality in Governance: Case Studies from Bangladesh and Beyond," 2023)
উপসংহার :
উপরোক্ত আলোচনায় মতে রাষ্ট্রপতির অব্যাহতির ক্ষেত্রে ডকট্রিন অব নেসেসিটির প্রয়োগ দেশে একটি নতুন আইনী দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে, যা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, বিশেষ পরিস্থিতিতে এই নীতি রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
তথ্যসূত্র :
## জার্নাল আর্টিকেল:Munir, M. (1954). A Theory of Necessity in Constitutional Law. Pakistan Journal of Social Sciences.
## পুস্তক : Hossain, K. (1997). Constitutional Law in Bangladesh. Oxford University Press.
## অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস।
## Kamal Hossain, "Constitutional Law in Bangladesh," Oxford University Press, 2022.
## Amir-ul Islam, "Legal Perspectives on Political Stability in Bangladesh," Dhaka Law Review, 2023.
## International Crisis Group, "Bangladesh in Crisis: Political Turmoil and Human Rights Concerns," 2023.
## Human Rights Watch, "Impartiality in Governance: Case Studies from Bangladesh and Beyond," 2023.
## Farzana Shaikh, "Making Sense of Pakistan," Hurst Publishers, 2009.
--------------------------------
--আলী ইউছুফ-২৮/১০/২৪ ইং
রাজনীতিক, সাহিত্যিক, গবেষক ও প্রবন্ধকার,
চট্টগ্রাম।
👉 👉 [এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পোস্টগুলো ফেসবুক এবং ইমেইল থেকে সংগৃহীত। উক্ত লেখার বক্তব্য ও দায়-দায়িত্ব লেখকের একান্ত নিজস্ব। তাই প্রকাশিত লেখার বিষয়ে কোনো মতামতের জন্য এডমিন দায়ী নয়।]

No comments