২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলন তথা গণঅভ্যুত্থান দেশের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এই সংগ্রাম ছিল শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য নয়, এটি ছিল দেশব্যাপী দীর্ঘদিন ধরে চলা ফ্যাসিস্ট খুনী শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত লড়াই।
বিগত ১৭ বছর ধরে ফ্যাসিস্ট হাসিনা বিনা ভোটে ক্ষমতার গদি ধরে রাখা, খুন, গুম, নির্যাতন, প্রশাসনিক দুর্নীতি ও স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে জনসাধারণের মনে ক্রমাগত ক্ষোভ জমতে থাকে। শেষপর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের নেতৃত্বে সর্বস্তরের জনগণ একত্রিত হয়ে এই ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করে।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও শুরুর ঘটনাঃ
২০২৪ সালের ২৪ জুলাই ঢাকার রাস্তায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্ররা সোচ্চার হয়। এই আন্দোলনের প্রধান কারণ ছিল দীর্ঘদিনের সামাজিক, শিক্ষাগত ও রাজনৈতিক বৈষম্য এবং ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের বিনা ভোটের শাসন। পুলিশ ও সরকারের গুন্ডা বাহিনী কর্তৃক হামলা, গুম, এবং নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো ছিল নিয়মিত ঘটনা। এই পরিস্থিতিতে, ছাত্ররা নিজেদের অধিকার আদায়ে সংগঠিত হতে শুরু করে।
আন্দোলনের সাফল্য ও পরিণতিঃ
এই আন্দোলন কেবল ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনেই থেমে থাকেনি; এটি ছাত্র রাজনীতির জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। শিক্ষার্থীরা বুঝতে পেরেছে যে, তাদের ভূমিকা শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং শিক্ষার ন্যায্যতা ও সমাজের বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যও তাদের দায়িত্ব রয়েছে।
বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুবুল হক এই আন্দোলনের বিষয়ে বলেন, "জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলন শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন আনেনি, বরং এটি জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি আদর্শ উদাহরণ হয়ে থাকবে" (সূত্র: ১০ আগস্ট ২০২৪, ঢাকা ট্রিবিউন)।
এছাড়াও বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. রাশেদুল ইসলাম বলেন, "ছাত্র-জনতার ঐক্য ও তাদের অপ্রতিরোধ্য মনোবল ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের মূল কারণ। এই আন্দোলন আমাদের দেশের গণতন্ত্র এবং শিক্ষার ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে" (সূত্রঃ ১০ আগস্ট ২০২৪, দৈনিক প্রথম আলো)।
আন্দোলনের সমন্বয়ক ও তাদের অবদানঃ
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সফলতা ও কার্যকারিতার পেছনে কিছু প্রথম সারির সমন্বয়ক বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলঃ
১। নাহিদুল ইসলাম নাহিস: তিনি ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংগঠন ও নেতৃত্বের দক্ষতা বিকাশে মনোযোগ দেন। (সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ৫ আগস্ট ২০২৪)
২। আসিফ মাহমুদ: আসিফ আন্দোলনের কৌশলগত পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সোশ্যাল মিডিয়া ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে আন্দোলনের দাবি তুলে ধরেছেন। (সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন, ২ আগস্ট ২০২৪)
৩। হাস্নাত আবদুল্লাহ: হাস্নাত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করেন এবং আন্দোলনের দাবি ও লক্ষ্য স্পষ্ট করতে সক্ষম হন। (সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন, ৮ আগস্ট ২০২৪)
৪। সারজিস আলম: সারজিস আন্দোলনের পরিকল্পনা ও সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করেছেন এবং রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য চেষ্টা করেছেন। (সূত্র: নিউজ ২৪, ৩ আগস্ট ২০২৪)
অন্যান্য মাস্টারমাইন্ড ও রাজনৈতিক দলের ভূমিকাঃ
এই আন্দোলনের পেছনে অনেক মাস্টারমাইন্ড কাজ করেছেন, যারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনগুলোর সহযোগিতা নিয়েছেন। বিএনপি ও জামায়াতের ছাত্র সংগঠন, ছাত্রদল ও ছাত্র শিবিরের সদস্যরা সক্রিয়ভাবে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন এবং ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে সমন্বিত প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তাদের সহযোগিতা আন্দোলনের শক্তি বাড়িয়েছে এবং সরকারবিরোধী পরিস্থিতি আরও জোরদার করেছে।
বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. জয়নুল আবেদীন বলেন, "বিএনপি এবং জামায়াতের ছাত্র সংগঠনের অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে আরো শক্তিশালী করেছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে জনতার ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য এই সমন্বয় অপরিসীম ভূমিকা রেখেছে" (সূত্র: ১২ আগস্ট ২০২৪, সমকাল)।
শহীদদের আত্মত্যাগঃ
এই আন্দোলনে অনেক শহীদ হয়েছেন, যাদের ত্যাগ ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রথম শহীদ আবু সাঈদ, যিনি আন্দোলনের সূচনালগ্নেই গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন, তার আত্মত্যাগ আন্দোলনকে আরো উজ্জীবিত করে। চট্টগ্রামের ওয়াসীম, যিনি ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারান, এবং মুগ্ধ, যিনি পুলিশের হামলায় নিহত হন, তাদের মতো অনেক শহীদ এই আন্দোলনের পথ তৈরি করেছেন। আন্দোলনের বিভিন্ন স্থানে হামলায় আহত ও শহীদ হওয়া অন্যান্য ছাত্রদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নামগুলো হল—রাজীব, নাসির, সাদিক, সিফাত, এবং আরো অনেক brave-heart যারা নিজেদের জীবনকে দেশ ও জনগণের জন্য উৎসর্গ করেছেন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি চিরস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। ফ্যাসিস্ট খুনী হাসিনা সরকারের পতন শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক জয় নয়, এটি ছিল একটি জাতির পুনর্জাগরণ। অসংখ্য শহীদ এবং আহতদের ত্যাগে যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা ভবিষ্যতের প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস হবে। তাদের আত্মত্যাগ ও সংগ্রাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে এবং নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।
রাজনীতিক, গবেষক ও প্রবন্ধকার,
👉 👉 [এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পোস্টগুলো ফেসবুক এবং ইমেইল থেকে সংগৃহীত। উক্ত লেখার বক্তব্য ও দায়-দায়িত্ব লেখকের একান্ত নিজস্ব। তাই প্রকাশিত লেখার বিষয়ে কোনো মতামতের জন্য এডমিন দায়ী নয়।]
No comments