• সাম্প্রতিক

    ফেলানী-সীমান্তের এক নিরব কান্না-

    সেই শীতের ভোর, জানুয়ারি ৭, ২০১১। কুড়িগ্রামের অনন্তপুর সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে বাংলাদেশের মাটি। বাবা নুর ইসলামের হাত ধরে ফেলানী খাতুন ফিরছিলেন নিজের দেশে। মাত্র ১৫ বছরের কিশোরী ফেলানী, যার ছোট্ট জীবনজুড়ে ছিল হাসি, স্বপ্ন আর সীমাহীন ভালোবাসা। কিন্তু সেই দিনই তার জীবনের শেষ দিন হয়ে দাঁড়ায়।
    কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে বাবার পেছন পেছন এগোচ্ছিল ফেলানী। তার শাড়ি কাঁটাতারে আটকে যায়। টেনে নামানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুলির শব্দে সবার প্রাণ কেঁপে ওঠে, আর ফেলানীর নিথর দেহ ঝুলে থাকে কাঁটাতারে। সে আর বাড়ি ফিরতে পারেনি।
    নুর ইসলামের চোখের সামনে মেয়ের মৃত্যু। তিনি দিশেহারা হয়ে সাহায্যের আর্তি জানালেন, কিন্তু সীমান্তের ওপারে কেবল নীরবতা। দীর্ঘ সময় ফেলানীর দেহটি কাঁটাতারে ঝুলে থাকে। সেই নিষ্ঠুর দৃশ্য যেন পুরো বাংলাদেশের হৃদয়ে গেঁথে যায়।
    ফেলানীর মৃত্যুর পর শুরু হয় বিচার পাওয়ার লড়াই। নুর ইসলাম ভারতের আদালতে দুইবার সাক্ষ্য দিয়েছেন। তবুও ন্যায়বিচার মেলেনি। বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। নুর ইসলামের কণ্ঠে আজও ক্ষোভের ঝড়, “আমার মেয়ে কোনো অপরাধ করেনি। কিন্তু সে জীবন দিল, আর আমরা সুবিচার পেলাম না। আমি যতদিন বাঁচব, ততদিন এই লড়াই চালিয়ে যাব।”
    ফেলানীর ছোট ভাই জাহান উদ্দিনের গলা ভারী, “আমার বোন কি শুধু সীমান্ত পাড়ি দিতে চেয়েছিল বলে তার মৃত্যু হলো? তারও তো বেঁচে থাকার অধিকার ছিল।”
    সীমান্ত হত্যা শুধু ফেলানীর কাহিনী নয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান জানায়, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিএসএফের হাতে ৬০৭ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। প্রতিবারই আত্মরক্ষার অজুহাতে ধামাচাপা দেওয়া হয় এই হত্যাগুলো।
    ফেলানীর বাবার বাড়ি ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। সে ফিরে গেল আকাশের তারা হয়ে। কিন্তু সেই তারা আজও সীমান্তে ঝুলে আছে।
    এমন একটি দেশ, যা নিজেদের বন্ধুরাষ্ট্র দাবি করে, তার এমন নিষ্ঠুর আচরণ মেনে নেওয়া যায় না। সীমান্ত হত্যা বন্ধের জন্য শুধু ন্যায়বিচারই নয়, দরকার কার্যকর নীতিমালা। ফেলানীর মতো আর কোনো কিশোরীকে যেন এভাবে প্রাণ দিতে না হয়।
    যে ছবি সারা দুনিয়ার বিবেক নাড়া দেয়-
    সীমান্তে এই নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু ফেলানী নয়, প্রতিটি বিবেকবান মানুষের হৃদয়ে ক্ষত তৈরি করেছে। আজও ন্যায়বিচার অধরা, সীমান্ত হত্যা বন্ধে কার্যকর নীতিমালা অনুপস্থিত। ফেলানীর কান্না সারা বিশ্বকে মনে করিয়ে দেয়, মানবতার চেয়ে বড় কোনো সীমান্ত হতে পারে না--মানবতার চেয়ে বড় কোনো সীমান্ত নেই। তার মৃত্যু একটি প্রতিবাদ, একটি আহ্বান—আর কোনো ফেলানী যেন এভাবে প্রাণ না হারায়।

    বিচারের দাবী ও প্রত্যাশা -
    ফেলানীর মতো কিশোরীদের মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়টিকে আরও জোরালো করে তোলে। তার বাবা নুর ইসলামের বুকফাটা আর্তি, “আমার মেয়ের কী দোষ ছিল?”—এই প্রশ্ন কেবল সীমান্তে নয়, প্রতিটি বিবেকবান মানুষের হৃদয়ে গেঁথে আছে। আমরা কি সত্যিই এমন একটি পৃথিবী গড়ে তুলতে পারি, যেখানে সীমান্ত মানে হবে না মৃত্যু? ন্যায়বিচারের জন্য যে দীর্ঘ লড়াই, তা শুধু ফেলানীর জন্য নয়, সীমান্তে ঝরে পড়া প্রতিটি প্রাণের জন্য। দুই দেশের সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা, তারা এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেবে। সীমান্ত হত্যা বন্ধে একটি শক্তিশালী নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে, যাতে আর কোনো শিশু, আর কোনো নিরপরাধ মানুষকে জীবন দিতে না হয়। ফেলানীর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা মানে হলো ভবিষ্যতের প্রতিটি ফেলানীকে রক্ষা করা, মানবতার প্রকৃত জয়গান গাওয়া।
    -আলী ইউছুফ
    ৭/০১/২০২৪ইং

    Ali Yousuf -এর ফেসবুক আইডি থেকে সংগৃহীত)




    👉 👉 [এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পোস্টগুলো ফেসবুক এবং ইমেইল থেকে সংগৃহীত। উক্ত লেখার বক্তব্য ও দায়-দায়িত্ব লেখকের একান্ত নিজস্ব। তাই প্রকাশিত লেখার বিষয়ে কোনো মতামতের জন্য এডমিন দায়ী নয়।]

    No comments

    Post Top Ad

    ad728

    Post Bottom Ad

    ad728

    আমরা আপনাকে বিনামূল্যে আমাদের আপডেট গুলি পাঠাতে যাচ্ছি। প্রথমে আপনার অনুলিপি সংগ্রহ করতে, আমাদের মেইলিং তালিকায় যোগ দিন। আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, অকেজো তথ্য প্রেরণ করে আপনাকে বিরক্ত করবো না। সুতরাং কোনও আপডেট মিস করবেন না, সংযুক্ত থাকুন!