ইশান সিকদার, মায়াবী মুখের এক কিশোর, যার অমলিন চাহনিতে একদিন ভেসে উঠেছিল অগণিত স্বপ্ন। টঙ্গীর সিরাজ উদ্দিন বিদ্যা নিকেতনের সপ্তম শ্রেণির এই ছাত্র মা-বাবার সঙ্গে উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের ছোট্ট বাসায় থাকত। তাদের গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠির উত্তর মানপাশা গ্রামে। কিন্তু সময়ের নির্মম আঘাতে ইশানের জীবনের সেই স্বপ্নময় দিনগুলো অন্ধকারে নিমজ্জিত হলো।
৫ আগস্ট ২০২৪—এই দিনটি যেন নতুন বাংলাদেশের ইতিহাসে রক্তের অক্ষরে লেখা এক দিন।
উত্তরা পূর্ব থানার সামনে বিজয় মিছিলে পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণের শিকার হয় ইশান। একটি ছররা গুলি তার নাক ভেদ করে বাঁ চোখে গিয়ে লাগে। ব্যথায় মাটিতে লুটিয়ে পড়া ইশান সেদিন শুধু তার চোখ হারায়নি; হারিয়েছে এক কিশোরের স্বপ্ন, তার পরিবার হারিয়েছে শান্তি।
ইশানের বাবা, বাবুল সিকদার, একজন স্যানিটারি মিস্ত্রি। ছেলের চিকিৎসার জন্য তিনি তার সঞ্চিত সব পুঁজি শেষ করে এখন ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েছেন। ঢাকার বাসাভাড়া দিতে পারছেন না, পেশায় সময় দিতে পারছেন না। ইশানের মা পাপিয়া বেগম দিনের পর দিন ছেলের অসহ্য যন্ত্রণা দেখে বাকরুদ্ধ। তারা জানেন, ছেলের চোখ আর কখনো ভালো হবে না। তবুও বুক ভরা আশা নিয়ে বেঁচে আছেন—যদি এই অন্ধকার দিনগুলোতে কেউ তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়।
৩০ নভেম্বর ঝালকাঠি জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে স্মরণসভায় কালো সানগ্লাস পরা ইশানকে দেখে মনে হয়েছিল যেন সে এক অদৃশ্য যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছে। স্মরণসভায় বক্তারা জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে শহীদদের আত্মত্যাগের কথা বলছিলেন। কিন্তু ইশান—শহীদ না হলেও, সে আজকের নতুন বাংলাদেশের এক জীবন্ত গাজী।
সেদিনের মিছিলে পানির তৃষ্ণায় কাতর তিনজনকে সাহায্য করতে গিয়ে ছররা গুলিতে দৃষ্টিশক্তি হারালেও ইশান তার মনোবল হারায়নি। হয়তো সে আর বাঁ চোখে দেখতে পারবে না, হয়তো তার পরিবারের আর্থিক অবস্থার অবনতির কোনো শেষ নেই। কিন্তু ইশান বেঁচে আছে, গাজী হয়ে। সে প্রমাণ করে দিয়েছে, ত্যাগের মাধ্যমে একটি নতুন সকাল উঁকি দিতে পারে।
ইশান সিকদার শুধু একটি নাম নয়; সে হলো সাহস, ত্যাগ আর নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নের প্রতীক। একদিন এই অন্ধকার কেটে যাবে। হয়তো তখন ইশানের নাম উচ্চারিত হবে সেই উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো, যিনি শহীদ না হয়েও অমর হয়েছেন ত্যাগের মহিমায়।
(
ফেসবুকের গল্প-Facebooker Golpo -এর ফেসবুক গ্রুপ থেকে সংগৃহীত )
👉 👉 [এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পোস্টগুলো ফেসবুক এবং ইমেইল থেকে সংগৃহীত। উক্ত লেখার বক্তব্য ও দায়-দায়িত্ব লেখকের একান্ত নিজস্ব। তাই প্রকাশিত লেখার বিষয়ে কোনো মতামতের জন্য এডমিন দায়ী নয়।]
No comments