আমার বয়স তখন ৭/৮ বছর। এক জ্যোৎস্না রাতে বাবা আমাকে নিয়ে এলাকায় ঘুরতে বের হলেন। আমি তখন চট্টগ্রামের স্বনামধন্য একমাত্র ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল "সেন্ট প্লাসিডস হাই স্কুল"- এর ক্লাস টু বা থ্রির স্টুডেন্ট। বাবা চেয়েছিলেন আমি এলাকার গরীব অসহায় মানুষদের অবস্থা স্বচক্ষে দেখে তাদের দুঃখ কষ্ট ও যন্ত্রনা কিছুটা যেন অনুধাবন করতে পারি।
বাবার এফজে-25 ল্যান্ড ত্রুজার জীপ-টিতে আমাকে পাশে বসিয়ে নিজে ড্রাইভ করে বাড়ী থেকে বের হলেন। কিছুক্ষণ চলার পর রাস্তার একপাশে গাড়ী থামিয়ে আমাকে নিয়ে নেমে গেলেন।
পূর্ণিমা চাঁদের মধুর আলোয় আমাদের মফস্বল এলাকার মেঠো পথ ধরে বাবা আমাকে নিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলেন। তিনি আমাকে নদীর আশেপাশের ৪/৫ টি খুবই অসহায় গরীব পরিবারের বাড়ীতে নিয়ে গেলেন। বাবা তাদের সাথে বিভিন্ন কূশল বিনিময় করলেন ও তাদের পরিবার-পরিজনের খোঁজ খবর নিলেন এবং আসার সময় তাদের অনেকের হাতে কিছু কিছু টাকাও দিচ্ছিলেন। আমরা তাদের সাথে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে বাড়ীর দিকে ফিরে আসছিলাম।
ফেরার সময় বাবা বললেন,
“দেখেছো বাবা, তারা কত গরীব…।। কত কষ্ট করে তাদের জীবন চলে..." ইত্যাদি ইত্যাদি.. !!
বাবা আবার বললেন, "দেখি বলতো বাবা, তাদের দেখে তুমি কি বুজলে ??
আমি তখন স্বভাবতই শিশু সুলভ কন্ঠে বাবাকে বললাম-
"তাদের ৫/৬ টি কুকুর আছে, আমাদেরতো মাত্র ১ টি কুকুর।
আমদের Swiming Pool (সুইমিং পুল) ছোট, তাদের সুইমিং পুলটা আমাদের সুইমিং পুলের চেয়ে অনেক বড়।
আমাদের সুইমিং পুলে নৌকা চলেনা কিন্তু তাদেরটাতে নৌকা চলে।
আমাদের বাড়ীতে রাতে মাত্র কয়েকটা লাল সবুজ বাতি জলে, তাদের বাড়ীর উপরে অনেক নীল নীল বাতি জ্বলে।
আমাদের বাতিগুলো সুইস অন করে জ্বালাতে হয়, তাদের বাতিগুলো অটোমেটিক জ্বলে এবং সেগুলো আমাদের বাতিগুলোর চেয়ে অনেক সুন্দর!
আমাদের জন্যেতো খাবার কিনে আন, তারাতো দেখছি খাবার বানিয়ে খায়, আমাদেরকে কি মজার লেমন জুস বানিয়ে দিল!
আমাদের ঘরেতো চারিদিকে দেয়াল। তুমি আর মা ছাড়া কেউ নাই, কোনো খেলার সাথী নাই।
তাদের আশেপাশে অনেক বন্ধু (প্রতিবেশী) আছে, যারা তাদেরকে সাহায্য করে, তাদের বাবুগুলো অনেকের সাথে খেলতে পারে। তুমিতো সারাদিন অফিসে থাক। অনেক রাতে বাড়ীতে আস। তাদের বাবারা তো সারাদিন তাদের বাবুদের সাথে থাকে এবং খেলা করে।
আমাদের বুক সেলফে বিভিন্ন Famous (ফেমাস) লেখকের বই আছে, কিন্তু তাদের ঘরে দেখলাম Quran, Gita, Bible (কুরআন, গীতা, বাইবেল) ইত্যাদি।
তুমিতো বলেছ তারা অনেক গরীব, আমার মনে হয়, তারা আমাদের চেয়েও অনেক বড় লোক! তাদের কাছেতো অনেক কিছু আছে যা আমাদের নেই !!
কেন জানিনা; সেদিন বাবার দু'চোখের কোনে খানিকটা জল দেখেছিলাম। বাবা তখন লম্বা.. করে একটা নিঃশ্বাস ফেললেন, তারপর আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
"হ্যাঁ বাবা, তুমি ঠিক বলেছো, আসলে সৃষ্টিকর্তা ও মনের দিক থেকে তারাই বড় লোক।"
এতদিন পরে এসে বুজলাম তোমার কথাই ঠিক বাবা।
অসংখ্য ধন্যবাদ বাবা তোমাকে, ধনী-গরীবের আসল পার্থক্যটা সেই ছোট্ট বেলা থেকেই খুব সুন্দর করে বুজিয়ে দেয়ার জন্যে। অনেক ভালোবাসি বাবা তোমাকে। মহান সৃষ্টিকর্তা যেন তোমাকে স্বর্গের উচ্চ স্থানে জায়গা করে দেন; এই কামনা করি।
-আলী ইউছুফ
০৯/০৫/২০ ইং
👉 👉 [এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রায় সকল পোস্ট-ই ফেসবুক থেকে সংগৃহীত। উক্ত লেখার বক্তব্য ও দায়-দায়িত্ব লেখকের একান্ত নিজস্ব। তাই প্রকাশিত লেখার বিষয়ে কোনো মতামতের জন্য এডমিন দায়ী নয়।]
Subscribe to:
Post Comments
(
Atom
)
Post Top Ad
ফেসবুকের গল্প তে আপনাকে স্বাগত। এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কোনো লেখা বা মতামতের জন্য 'ফেসবুকের গল্প' কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।
Post Bottom Ad

বাবার গল্পটা পড়ে অনেক ভাল লাগল, ধন্যবাদ।
ReplyDelete