• সাম্প্রতিক

    আমারও একজন বাবা ছিলো

     


    আমিও বাবার মেয়ে!!

    আমারও একজন বাবা ছিলো।
    বাবা বেঁচে থাকতে বাবা দিবস শব্দটা আমার কাছে অপরিচিত ছিল। এখন ফেসবুকে দেখি বাবা দিবস হয়। বাবাদেরকে কতশত ভাবে শ্রদ্ধা ভালবাসা জানানো হয়। ইশ! আমার বাবা যদি বেঁচে থাকতো তবে কিছু একটা নিয়ে গিয়ে বলতাম, Happy Father's Day. অনেক খুশি হতো! বার বার করে মানুষ ডেকে দেখাতো, হাসতো আর মা'কে বলতো 'মজা করে কিছু পিঠা পায়েস রান্না করো তো '। আমি আমার এই জীবনে পৃথিবীর কোনো বাবাকে আমার বাবার মত করে ভালবাসতে দেখিনি। বাবা বাসায় আসলে ছেলেমেয়েরা ভয় পায়, চুপচাপ থাকে, পড়তে বসে, আস্তে আস্তে কথা বলে এগুলো দেখতাম। অথচ আমরা পাঁচ ভাইবোন বাবা আসার সময় হলে বারান্দায়, দরজায় উঁকিঝুঁকি দিতাম। কখন আসবে, কখন দৌড় দিয়ে গিয়ে এগিয়ে নিয়ে আসবো। প্রতিবেশিরা মজা করে বলতো, এই তোদের বাবা কি বিদেশ থেকে আসছে! মা অভিযোগ করে বলতো, পড়া শুনা বাদ দিয়ে কেন তোমার ছেলেমেয়ে তুমি আসলে এমন পাগলামি করে। আমার বাবা তখন আমাদের পক্ষে উত্তর করে দিত।
    " এখন বাজে রাত প্রায় দশটা!এতক্ষন কি করছো? আমি ঘরে আসলে আমার ছেলেমেয়ে একজনও দূরে থাকবেনা।" আব্বা খাওয়ার সময় সাথে খাওয়া বা চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে থেকে সবার সারাদিনের গল্প করা, গল্প শুনা এগুলোই ছিল নৈমিত্তিক ব্যাপার। এরপর যার পরীক্ষা বা পড়ার প্রেশার থাকতো সে উঠতে চাইলেও আব্বা বলতো,
    "আসো তো আমাদের এত পড়ার দরকার নেই। আমাকে ঘুম পাড়ায় দিয়ে তারপর তোমরা যাবা।" কত যে কথা, কত যে স্মৃতি কেমন করে লিখি বলো তো!! একবিন্দু শাসন না করেও যে সন্তান ভালোভাবে মানুষ করা যায় এটা আমি আমার বাবার কাছে শিখেছি। একবার কলেজ থেকে ফিরে এক বান্ধবীর নামে একগাদা নালিশ করছিলাম আব্বার সাথে। হঠাৎ খেয়াল করলাম সে অন্যদিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছে। আমি তখন ক্ষেপে গিয়ে বললাম, আশ্চর্য! আমি হাসির কি বললাম!! আব্বা তখন তার হাসি বাড়িয়ে দিয়ে বললো, 'আসলে নিজের মেয়ের দোষের কথা নিজের মুখে কিভাবে বলি! লজ্জা শরম আছে তো আমার! এটা মনে করে হাসি পাচ্ছে'। মা তখন বললো এখান থেকে যা,দোষটা তোর গল্প শুনে আমরা তাই বুঝলাম। খুব লজ্জা পেয়েছিলাম সেদিন বুঝেছিলাম তাই তো আমি এভাবে কেন ভাবলাম। আব্বা প্রায়ই গল্পের ছলে বলতো, জানো মিথ্যেবাদি মানুষ, অন্যায়কারী মানুষের চেহারা নষ্ট হয়ে যায়। সামনে এসে দাড়ালে কেমন যেন অস্বস্তি লাগে, শান্তি লাগেনা। সুন্দর থাকলেও চোখ জুড়ানো সুন্দর লাগেনা। আমি এমন বাবার কথা গল্পতেও শুনি নাই। বাপের বাড়ি ছাড়ার পরে আব্বা শর্ত দিয়েছিল, প্রতিদিন বিকাল পাঁচটায় অফিস থেকে ফিরে যেন সে আমাদের দেখতে পায়। যথাযথ নিয়ম পালন করছিলাম। তো একবার একটা বিষয়ে অভিমান করে তিনদিন যাইনি। চতুর্থদিন আব্বা মা'কে বলেছিল, " যাও,এখনি গিয়ে আমার নামে কিছু দুর্নাম বদনাম বলে, বুঝিয়ে সুঝিয়ে আমার মেয়ে এনে দাও। আমি আর থাকতে পারছিনা"। গত বাইশ বছরে বাবার শূণ্যতা একবিন্দু মলিন হয়নি। জীবনে চলার পথে বাবার মত কাউকে দেখলে বাবার স্নেহ খুঁজেছি কিন্তু তা তো দুর্লভ। একজন চাচা ছিলেন, তাঁর কাছে মাঝে মাঝে পিতৃস্নেহ পেতাম, তিনিও ২০১৮ সালে মারা গেলেন। অনেক দোয়া করি আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুন। কেউই অভিভাবক এর মত আচরণ করেন না, মাথায় হাত রাখেন না। দুটো ভালো কথা বলেন না। এখন অবশ্য খুঁজিনা।কারণ এটা আমি পাবো না বরং কষ্ট পাবো। এখন মনে হয়, কি দরকার! আমিই এখন অভিভাবক, আমিই সন্তানদের বা সন্তান তুল্য ছেলেমেয়েদের মাথায় হাত রাখবো। পরম আদর স্নেহে জানতে চাইবো তাদের ভালো -মন্দ, আনন্দের কথা। সাহস দেবো বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে বাঁচবার।
    বাবা দিবসে পৃথিবীর সকল বাবাদের প্রতি রইলো এক মেয়ের অসীম শ্রদ্ধা- ভালবাসা আর শুভকামনা।
    বি:দ্র: আমার মা ফেসবুকে তার ছবি দিতে না করেছেন। আব্বা বেঁচে থাকলে কি বলতো জানা নেই। নিজের ছবি দিলাম কারন আমারই তো বাবা, আমিই তো বাবার মেয়ে।
    পরের জনম যদি থাকে, তবে আমাদের বাবাই যেন শুধু আমাদেরই বাবা হয়।

    (Sabina Khandaker Zharna 

    No comments

    Post Top Ad

    ad728

    Post Bottom Ad

    ad728

    আমরা আপনাকে বিনামূল্যে আমাদের আপডেট গুলি পাঠাতে যাচ্ছি। প্রথমে আপনার অনুলিপি সংগ্রহ করতে, আমাদের মেইলিং তালিকায় যোগ দিন। আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, অকেজো তথ্য প্রেরণ করে আপনাকে বিরক্ত করবো না। সুতরাং কোনও আপডেট মিস করবেন না, সংযুক্ত থাকুন!