রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ছোট্ট গ্রাম বাবনপুর। এখানেই জন্ম হয়েছিল এক স্বপ্নবাজ ছেলের—আবু সাঈদ। বাবা মকবুল হোসেন আর মা মনোয়ারা বেগমের নয় সন্তানের মধ্যে কনিষ্ঠ হলেও সাঈদের ছিল সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। ছোটবেলা থেকেই সে ছিল পড়াশোনায় অনন্য। ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে, গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি ও এইচএসসি সম্পন্ন করে। তার জীবন যেন এক আলোকিত পথের দিশারী। ২০২০ সালে সে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়, শুরু হয় তার নতুন অধ্যায়।
২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন দেশের ইতিহাসে নতুন মোড় আনল। যা অল্প সময়ের মধ্যেই সরকার পতন আন্দোলনে রূপ নেয়। এই আন্দোলনে আবু সাঈদ হয়ে উঠল অসীম আত্মত্যাগ ও অনুপ্রেরণার মূর্তপ্রতীক। এক ঝাঁক সসস্ত্র পুলিশ বাহীনীর সামনে বিশাল হিমালয়ের মত বুক চেতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এবং তার সাহসী কণ্ঠ, নির্ভীক মনোভাব, আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান সেদিন সবাইকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। ১৫ জুলাই, একদিন আগেই, সে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেয়—এক অন্তর্দৃষ্টি যেন। ঊনসত্তরের শহীদ শিক্ষক মোহাম্মদ শামসুজ্জোহাকে স্মরণ করে লিখেছিল, “মেরুদণ্ড নিয়ে বাঁচুন। মৃত্যুর পরও যদি বেঁচে থাকতে চান, তবে ‘শামসুজ্জোহা’ হয়ে মরে যান।” কে জানত, এই পোস্ট যেন তার নিজের জীবনের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠবে?
১৬ জুলাই। সেই মর্মান্তিক দিন। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর আকাশ-বাতাস কাঁপাচ্ছে। অন্যায় কোটা পদ্ধতির সংস্কার চাই—এই দাবিতে মুখরিত মিছিল। পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাসেও পিছপা হয়নি সাঈদ। বুক চিতিয়ে, লাঠি হাতে ছেলেটি যেন এক জীবন্ত প্রতিরোধ।
আচমকা গুলির শব্দে চারপাশ স্তব্ধ হয়ে গেল। পুলিশের ছোড়া ছররা গুলি একের পর এক বিদ্ধ করল সাঈদের দেহ। ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই সাহসী তরুণ একসময় মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তার চারপাশে সহপাঠীরা ছুটে এলো, কেউ তার নাম ধরে ডাকছে, কেউ অসহায়ভাবে কাঁদছে। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই সাঈদ চিরতরে নিথর হয়ে গেল।
সাঈদের মৃত্যুর খবরে আন্দোলনকারীদের হৃদয় বিদীর্ণ হলো, কিন্তু তাদের মনোবল আরও শক্ত হলো। তাকে "২৪-এর প্রথম শহীদ" হিসেবে আখ্যা দেওয়া হলো। তার রক্তে রঞ্জিত মাটি যেন নতুন ইতিহাসের ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে দাঁড়াল। তার আত্মত্যাগের গল্প প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে গেল।
আজ, সাঈদের সেই মানবপ্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মুহূর্তের কথা কেউ ভুলতে পারে না। তার সাহস, তার নেতৃত্ব, তার আত্মত্যাগ—সবই একটি জাতিকে দেখিয়ে দিয়েছে যে স্বপ্নবাজ তরুণেরা অন্যায় আর অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে ইতিহাস বদলে যায়। আবু সাঈদ এখনো বেঁচে আছেন—প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো মানুষের সাহসে, প্রেরণায়, আর স্বাধীনতার প্রতিটি কণ্ঠস্বরের মাঝে।
তার গল্প মনে করিয়ে দেয়, স্বপ্নবাজ তরুণেরা যদি আত্মত্যাগ করতে রাজি থাকে, তবে পৃথিবী বদলে দিতে পারে আর বদলেও গিয়েছিল সেদিন।
মূলত আবু সাঈদের শহীদ হওয়ার মধ্য দিয়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের যাত্রা শুরু হয়। তার আত্মত্যাগ আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বিপ্লবের চেতনায় নতুন প্রজ্বলন সৃষ্টি করে। অবশেষে ৫ আগস্ট, ক্রমবর্ধমান গণআন্দোলনের চাপে ফ্যাসিস্ট হাসিনা দেশে ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এই দিনটি বাংলাদেশের ২য় স্বাধীনতা'র প্রতীক হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
(
Ali Yousuf Ctg -এর ফেসবুক আইডি থেকে সংগৃহীত)
👉 👉 [এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পোস্টগুলো ফেসবুক এবং ইমেইল থেকে সংগৃহীত। উক্ত লেখার বক্তব্য ও দায়-দায়িত্ব লেখকের একান্ত নিজস্ব। তাই প্রকাশিত লেখার বিষয়ে কোনো মতামতের জন্য এডমিন দায়ী নয়।]
No comments