মিরপুরের একটি ছোট্ট বাসায় সামিরের হাসির শব্দ যেন সবসময়ই বাতাসে মিশে থাকত। ১১ বছরের এই ছেলেটা ছিল তার বাবা-মায়ের একমাত্র আশার আলো। সামিরের জানালার পাশে রাখা পড়ার টেবিল, তার ছোট্ট বইখাতা আর রঙিন প্লাস্টিকের খেলনাগুলো বলত, এই ঘরে একটি শিশুর শৈশবের স্বপ্ন বাস করে। কিন্তু সেই স্বপ্ন এক বিকেলেই চিরতরে থেমে গেল।
১৯ জুলাইয়ের বিকেল। কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে উত্তপ্ত পরিস্থিতি ছড়িয়ে পড়েছিল মিরপুরের কাফরুল থানার সামনের সড়কে। বাইরে পুলিশের লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, আর গুলির শব্দে পরিবেশ ছিল রক্তাক্ত। সামির তখন তার ঘরে, জানালার পাশে বসে বই পড়ছিল। হঠাৎ কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়া জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল। সামির ছুটে গিয়ে জানালা বন্ধ করতে চেষ্টা করছিল। আর তখনই একটি গুলি জানালার বাইরে থেকে ছুটে এসে তার ছোট্ট শরীর ভেদ করে বেরিয়ে গেল।
সামিরের মা ফারিয়া ইবনাত ছেলেকে বাড়িতে রেখে পাশের ঘরে ছিলেন। শব্দ শুনে দৌড়ে এসে দেখেন, সামির মেঝেতে রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছে। তার ছোট্ট শরীর নিস্তেজ, নিথর। বাবা সাকিবুর রহমান তখন পাশের বকুলতলা মাঠে ছিলেন। প্রতিবেশীর ফোন পেয়ে দৌড়ে বাসায় এসে দেখেন, তার একমাত্র সন্তান রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। তিনি ছেলেকে কোলে তুলে পাশের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে ছুটলেন। কিন্তু চিকিৎসকের একটি বাক্যই সবকিছু শেষ করে দিল, “আপনার ছেলে আর নেই।”
নানাবাড়িতে দাফন সম্পন্ন হলেও ফারিয়া ইবনাত মিরপুরে ফিরতে পারেননি। তিনি ছেলের শেষ স্মৃতিগুলো আঁকড়ে ধরে সেখানেই রয়ে গেলেন। আর সাকিবুর, তার ছোট্ট বাসার প্রতিটি কোণে ছেলের স্মৃতি খুঁজে বেড়ান। পড়ার টেবিল, রঙিন খেলনা, ছোপ ছোপ রক্তের দাগ—সব যেন তাকে তাড়া করে ফিরছে।
সেদিন রাতেই স্থানীয় মুরব্বি ইসমাইল হোসেন হাজির হন। তিনি সাকিবুরকে বোঝান, “মামলায় না গিয়ে দ্রুত দাফন করাই ভালো। তদন্তে সময় লাগবে, হয়তো সন্তানের কবর দিতেও দেরি হবে।” বাবা হিসেবে সেই রাতে সাকিবুর সব হারিয়েও শান্তি চেয়েছিলেন। তাই কোনো অভিযোগ না করে, কোনো মামলা না করেই সন্তানের দাফন সম্পন্ন করেন।
তবু সাকিবুরের প্রশ্ন থেমে নেই, “আমরা তো ঘরেই ছিলাম। কারফিউ জারি হলে ঘরেই থাকতে বলা হয়েছিল। ঘরেও যদি নিরাপদ না থাকি, তাহলে নিরাপত্তা কোথায়? আমি আওয়ামী লীগ করি, তাদের সমর্থন করি। তাহলে আমাদের সঙ্গে কেন এমন হলো? আমার সামির কী অপরাধ করেছিল?”
সাকিবুরের কান্নাভেজা কণ্ঠ যেন এক বিষাদের কাব্য রচনা করে। সামিরের রক্তে ভিজে যাওয়া ঘর, তার রঙিন খেলনা, জানালার পাশে পড়ে থাকা বইখাতাগুলো চিৎকার করে বলে, "এটা কোনো শিশুর ভাগ্য হতে পারে না।"
একটি গুলি সামিরকে কেবল হত্যা করেনি, এটি তার পরিবার থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে তাদের পৃথিবী। জানালার পাশে পড়ে থাকা সেই গুলিটা যেন শুধুই একটা ধাতব টুকরো নয়, এটা এক ভাঙা স্বপ্ন, এক নির্দোষ শিশুর শৈশবের মৃত্যুর প্রতীক।
(
Ali Yousuf Ctg -এর ফেসবুক আইডি থেকে সংগৃহীত)
👉 👉 [এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পোস্টগুলো ফেসবুক এবং ইমেইল থেকে সংগৃহীত। উক্ত লেখার বক্তব্য ও দায়-দায়িত্ব লেখকের একান্ত নিজস্ব। তাই প্রকাশিত লেখার বিষয়ে কোনো মতামতের জন্য এডমিন দায়ী নয়।]
No comments