‘শর্তপূরণ’, ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’, ‘রিকনসিলিয়েশন’—শব্দগুলো যতই মার্জিত হোক, শব্দের সৌন্দর্য দিয়ে মানুষের হারানো অধিকার ফিরে আসে না। গুম হওয়া মানুষ ফিরে আসে না, হত্যার বিচার সম্পন্ন হয় না, নির্যাতিত পরিবারের ক্ষত শুকিয়ে যায় না, লুণ্ঠিত অর্থনীতির ক্ষতি পূরণ হয় না। রাজনৈতিক অভিধানে নতুন শব্দ যোগ করলেই ইতিহাসের দায় মুছে যায় না। বরং জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়ার আগেই পুনর্মিলনের আলোচনা সামনে এলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—এটা কি সত্য ও ন্যায়বিচারের পথে অগ্রযাত্রা, নাকি অতীতের দায়কে রাজনৈতিক দর-কষাকষির টেবিলে সরিয়ে নেওয়ার আয়োজন?
১৭ বছর পর একটা ভঙ্গুর রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা অবস্থায় দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অস্পষ্ট বক্তব্য, পুনর্মিলনের তাত্ত্বিক আলোচনা কিংবা নতুন পরিচয়ে ফিরে আসার সম্ভাবনা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হবে কেন? তবে কি সরকার গোপনে পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে?—তা না হলে বিচার নিশ্চিত করার আগে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের আলোচনা কেন প্রাধান্য পাবে? জনগণের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা পূরণে সরকারের দৃশ্যমান অঙ্গীকার কোথায়?
প্রশ্নটি কে কোন দলকে ভালোবাসে, কে কোন দলকে অপছন্দ করে—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্নটি হলো, যেসব গুরুতর মানবতাবিরোধী ঘটনার দায়ে যে রাজনৈতিক দল একটা সফল গণ
অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিতাড়িত হয়েছে, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় বিচারের চেয়ে পুনর্বাসনের ভাষা কেন বেশি শোনা যায়? অতীতের ক্ষত নিরাময় না করেই যদি রাজনৈতিক পুনর্মিলন বা প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা সামনে আসে, তাহলে তার নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি কোথায়?
দেড় দশকের শাসন: ক্ষমতার হিসাব নয়, জবাবদিহির প্রশ্নঃ
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামল বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্নে এক গভীর সংকটের অধ্যায়। এ সময়ে বিরোধী মত দমন, গুম, খুন, নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক হয়রানি, ভোটাধিকার হরণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করা এবং ‘আয়নাঘর’-কেন্দ্রিক গোপন আটক ও নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ আজ প্রমাণিত সত্য। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা, দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং ধর্মীয় অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও একইভাবে প্রতিষ্ঠিত। এসব অভিযোগ কোনো বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক বিতর্ক নয়; এসব অভিযোগের ব্যাপ্তি, পরিসর এতই গভীর ও গুরুতর যে, সেগুলোকে যেমন রাজনৈতিক আলোচনায় গৌণ করে দেখার সুযোগ নেই, তেমনি বিচারিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতার আড়ালে দায়মুক্তির পথ তৈরি করারও অবকাশ নেই।
উন্নয়নের প্রচার দিয়ে ভোটাধিকার হরণের অভিযোগ মোছা যাবে না; অবকাঠামোর সাফল্য দেখিয়ে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়া যাবে না; আর দলীয় আনুগত্যের অজুহাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগকে তুচ্ছ করারও সুযোগ নেই। রাষ্ট্র পরিচালনার নামে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যদি ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ রক্ষার কবজ হয়ে ওঠে, তবে সেটি কেবল সরকারের ভাবমূর্তির সংকট নয়—তা আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্যও গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
বিগত শাসনামলের ফ্যাসিবাদী প্রবণতার গুরুতর অভিযোগগুলো ইতিমধ্যে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, রাজনৈতিক দল ও ধর্মীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রমাণিত বিষয় হিসেবে বারবার এসেছে। বিশেষ করে গুম-খুন, শাপলা চত্বরের ঘটনা, ওয়াজ মাহফিলসহ ধর্মীয় সভা-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপের অভিযোগ, আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যু, যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে প্রখ্যাত আলেম, রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীদের ‘জুডিশিয়াল কিলিং’-এর অভিযোগ এবং পিলখানা হত্যাকাণ্ড—এসব ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়, গভীর রাজনৈতিক সংকট ও দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। এসব গুরুতর অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি কেবল অতীতের হিসাব চুকানোর বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক আস্থা পুনরুদ্ধারের অপরিহার্য শর্ত। কারণ, রাষ্ট্র কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, ক্ষমতা কোনো শাসকের দায়মুক্তির দলিল নয়, আর ন্যায়বিচার কোনো রাজনৈতিক অনুগ্রহ নয়—এটি নাগরিকের অধিকার এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
আয়নাঘর: রাষ্ট্রের অন্ধকারে ডুবে থাকা অমানবিকতার ভয়ংকর অধ্যায়ঃ
বিগত শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে ‘আয়নাঘর’ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, গোপন আটক ও নির্যাতনের অভিযোগে চিহ্নিত এক ভয়ংকর অধ্যায়। এটি ছিল এমন এক অন্ধকার বাস্তবতা, যেখানে মানুষের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিয়ে গভীর প্রশ্ন উঠেছে। স্বজন হারানো পরিবারের দীর্ঘ প্রতীক্ষা, নিখোঁজ ব্যক্তিদের আর্তনাদ, ভাগ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা, পরিবারের আহাজারি এবং বন্দিদশা থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের বর্ণনা সেই সময়ের দমনমূলক শাসনচর্চার ভয়াবহতা সামনে এনেছে। ক্ষমতার দম্ভে মানুষের অধিকার পদদলিত হলে রাষ্ট্রের দেয়াল যত উঁচুই হোক, সত্যকে চিরকাল বন্দি রাখা যায় না। আয়নাঘরের প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিচার এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই বিএনপি সরকারের অঙ্গীকার হোক।
পিলখানা: মৃত্যুর মিছিল, রক্তের দাগ, স্বজনদের কান্না ও অমীমাংসিত প্রশ্নঃ
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত ক্ষত, যার বেদনা আজও বহন করে অসংখ্য পরিবার। ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনের প্রাণহানি কেবল কিছু মানুষের মৃত্যু নয়; এটি ছিল জাতির নিরাপত্তাবোধ, সামরিক শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধের ওপর এক ভয়াবহ আঘাত।
সেদিনের স্বজনহারা কান্না, হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন এবং অনিশ্চয়তার ভার কোনো রায় কিংবা সময়ের প্রবাহে সম্পূর্ণ মুছে যাওয়ার নয়। অপরাধীদের বিচার যেমন অপরিহার্য, তেমনি বিচারপ্রক্রিয়ায় নির্যাতন, অন্যায্যতা কিংবা নিরপরাধ ব্যক্তির শাস্তির অভিযোগ থাকলে তারও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি জরুরি। কারণ, ন্যায়বিচার কখনো এক পক্ষের বেদনা স্বীকার করে অন্য পক্ষের অধিকার অস্বীকার করতে পারে না।
পিলখানাকে ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থা, গোয়েন্দা তৎপরতা, সংকট মোকাবিলার সিদ্ধান্ত এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের প্রশ্ন আজও গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। বিদেশি ষড়যন্ত্রসহ নানা অভিযোগের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন অনুমান নয়, নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও স্বচ্ছ তদন্ত।
পিলখানার শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা শুধু শোক প্রকাশে নয়—সত্য উদ্ঘাটন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি রোধ করার মধ্যেই নিহিত। ইতিহাসের রক্তাক্ত বেদনাবিধুর অধ্যায়কে হয়তো সাময়িক চেপে রাখা যায়; কিন্তু কবর দেওয়া যায় না। নীরবতার চাদরে ঢাকা পড়লেই প্রশ্নের মৃত্যু হয় না, ন্যায়বিচারের দাবিও শেষ হয় না। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার এখন সময়ের অন্যতম দাবি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান: রক্তের হিসাব কি রাজনৈতিক ভাষণে হারিয়ে যাবে?
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি সরকারের পতনের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল নাগরিক অধিকার, ভোটের অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির দাবিতে মানুষের ব্যাপক প্রতিরোধ। শিক্ষার্থী, তরুণ, শ্রমজীবী মানুষ, অভিভাবক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে, তার সঙ্গে যুক্ত ছিল একটি মৌলিক প্রত্যাশা—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আর কখনো নাগরিকের অধিকার কেড়ে নেওয়ার অবাধ হাতিয়ার হবে না।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে প্রায় ১,৪০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে থাকতে পারে বলে অনুমান করা হয়। প্রতিবেদনে তৎকালীন সরকার ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কাঠামোর বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিবরণ তুলে ধরা হয় এবং সম্ভাব্য মানবতাবিরোধী অপরাধের বিষয়ে আরও তদন্তের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়। এই অনুমান প্রতিটি ঘটনার চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত না হলেও, প্রাণহানির ব্যাপকতা ও অভিযোগের গুরুত্বকে উপেক্ষা করারও কোনো অবকাশ নেই।
এখানে মূল প্রশ্ন রাজনৈতিক সমঝোতার পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া নয়; প্রশ্ন হলো, সমঝোতার ভিত্তি কী—সত্য ও জবাবদিহি, নাকি বিচার এড়িয়ে যাওয়ার সুবিধা?
যে পরিবার সন্তান হারিয়েছে, যে মা সন্তানের লাশের অপেক্ষায় থেকেছেন, যে তরুণ গুলিবিদ্ধ হয়ে জীবনের স্বাভাবিক গতি হারিয়েছেন—তাঁদের কাছে রাজনৈতিক পুনর্মিলনের তাত্ত্বিক আলোচনা তখনই অর্থবহ হবে, যখন সত্য প্রকাশ ও ন্যায়বিচারের বাস্তব অগ্রগতি দেখা যাবে। অন্যথায় ‘সমঝোতা’ শব্দটি তাঁদের কাছে ন্যায়বিচার পিছিয়ে দেওয়ার আরেক নাম হয়ে উঠতে পারে।
যুদ্ধাপরাধের বিচার, নাকি ‘জুডিশিয়াল কিলিং’?
বাংলাদেশের তথাকথিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের নামে আইনি প্রহসন ও একপেশে বিচারপ্রক্রিয়া দেশের ইতিহাসের এক গভীর বিতর্কিত অধ্যায়। সমালোচকদের দৃষ্টিতে—এসব বিচারের আড়ালে ইসলামপন্থীদের কণ্ঠ রোধ এবং আধিপত্যবাদী ভারতীয় স্বার্থে ‘RAW’ কর্তৃক দেশের মেধাবী নেতৃত্বকে দুর্বল করার ভয়াবহ নীলনকশার অংশ। তথাকথিত এই বিচারপ্রক্রিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গভীর কালো অধ্যায় হিসেবে আলোচিত। সমালোচকেরা এসব মৃত্যুদণ্ডকে ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সে সময় আইনের আড়ালে এসব বেআইনি কর্মকাণ্ড নিয়ে ন্যায়সংগত বিচার ও যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পর্কে উদ্বেগ জানিয়েছিল। সেসব বিতর্কিত বিচারিক রায়ে রাজনৈতিক প্রভাব, যথাযথ আইনের ঘাটতি কিংবা প্রমাণের মান নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠলে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করেনি।
ন্যায়বিচারের মানদণ্ড একটাই; অপরাধী হলে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে বিচার, আর অভিযুক্ত হলে ন্যায়সংগত বিচার পাওয়ার অধিকার। অতীতের বিচারপ্রক্রিয়া যদি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকে, তবে বর্তমানেও সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি চলতে পারে না। বিচার হোক প্রমাণের ভিত্তিতে—প্রতিহিংসার নয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায়।
‘রিফাইন্ড’ ও ‘রিকনসিলিয়েশন’ ও গরু মেরে জুতা দান—দায় স্বীকারের বিকল্প?
‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’—অর্থাৎ পরিশীলিত বা সংস্কারকৃত আওয়ামী লীগের ধারণা সামনে এলে প্রশ্ন ওঠে, সংস্কার বলতে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে? নাম, প্রতীক, নেতৃত্ব কিংবা বক্তব্য পাল্টে দেওয়াই কি রাজনৈতিক সংস্কার? নাকি দলীয় কর্তৃত্ববাদ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংস্কৃতি থেকে বাস্তব বিচ্ছেদ ঘটানোই সংস্কারের প্রকৃত অর্থ?
পুরোনো বোতলে নতুন লেবেল লাগালে ভেতরের তরল বদলে যায় না। একইভাবে, পুরোনো নেতৃত্ব বা কাঠামো নতুন নামে হাজির হলেই অতীতের দায় বিলুপ্ত হয় না। ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা রিহ্যাবিলিটেশন (Reconciliation or Rehabilitation) কোনো জাদুমন্ত্র নয়। প্রকৃত পুনর্মিলনের ভিত্তি হলো অপরাধীর জবাবদিহি ও বিচার, ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতিকার এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। এসব না করে ক্ষমা বা অনুশোচনার ভাষণ গরু মেরে জুতা দান-এর মতো বৈকি। পর্দার আড়ালে নাটকের স্ক্রিপ্ট চূড়ান্ত করে জাতির সামনে এসব আগাম ট্রেলার দেখানো হচ্ছে কি না, তা ভেবে দেখার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।
বিএনপি সরকারের কাছে প্রশ্ন: জনগণের প্রত্যাশা, নাকি রাজনৈতিক সুবিধা?
বিএনপি সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা—তারা কি অতীতের নিপীড়নের শিকার মানুষদের পাশে দাঁড়াবে, নাকি আওয়ামী লীগ প্রশ্নে এমন ভাষা ব্যবহার করবে, যা পুনর্বাসনের সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ বাড়ায়? যে পরিবার গুমের শিকার হয়েছে, যে পরিবার জুলাইয়ের সহিংসতায় স্বজন হারিয়েছে, যে বিডিআর সদস্য অন্যায্য বিচারের অভিযোগ তুলেছেন, যে নাগরিক ভোটাধিকার হারানোর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন—তাঁদের কাছে ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা ছাড়া পুনর্মিলনের অর্থ কী?
সরকারের দায়িত্ব কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি ব্যক্তিগত দরদ দেখানো নয়; দায়িত্ব হলো আইনের সমান প্রয়োগ, নাগরিকের অধিকার রক্ষা এবং অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। বিএনপি যদি আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের কোনো পরিকল্পনা না করে থাকে, তাহলে তার সবচেয়ে কার্যকর প্রমাণ হবে স্বচ্ছ নীতিমালা, স্বাধীন তদন্ত ও দৃশ্যমান বিচার।
বিরোধী দলে থেকে যে দল গণতন্ত্র ও জবাবদিহির দাবি তুলেছে, ক্ষমতায় এসে সেই দাবির বাস্তবায়ন দেখানোর দায়িত্বও তাদের। পুরোনো শাসকের বিরুদ্ধে অভিযোগের তীব্রতা ক্ষমতা বদলের সঙ্গে কমে গেলে জনগণ জানতে চাইবে—নীতির পরিবর্তন হয়েছে, নাকি কেবল রাজনৈতিক অবস্থান বদলেছে? অতএব, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা সরকারের দায়িত্ব; অস্পষ্টতা দিয়ে সেই দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
শেষ কথা: দায়মুক্তির আড়ালে পুনর্বাসন নয়, আগে বিচার ও জবাবদিহিঃ
একটি দলকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া আর তার শাসনসংস্কৃতির অবসান ঘটানো এক কথা নয়। সরকার বদলেছে, ক্ষমতার কেন্দ্র বদলেছে; কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ এবং অতীতের দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা টিকে থাকলে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকবে। গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা শেষ পর্যন্ত “নতুন বোতলে পুরোনো মদ”-এর মতো নতুন মোড়কে পুরোনো রাজনীতির কাছেই জিম্মি হয়ে পড়ে।
স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব কোনো দলের একক সম্পত্তি নয়; জনগণের অধিকারও কোনো সরকারের দয়া নয়। ‘শর্তপূরণ’, ‘রিফাইন্ড’ কিংবা ‘রিকনসিলিয়েশন’—কোনো শব্দই সত্য, বিচার ও জবাবদিহির বিকল্প হতে পারে না। বাংলাদেশের মানুষ নতুন কোনো রাজনৈতিক অভিধান চায় না; তারা চায় অধিকার, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার। তারা চায় না, ‘শর্তপূরণ’-এর অস্পষ্টতায় অপরাধের দায় হারিয়ে যাক; ‘রিফাইন্ড’-এর মোড়কে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফিরে আসুক; কিংবা ‘রিকনসিলিয়েশন’-এর নামে বিচারপ্রক্রিয়া ও ভুক্তভোগীদের দাবি গৌণ হয়ে পড়ুক।
গুমের শিকার পরিবারের কাছে পুনর্মিলনের অর্থ কী, যদি স্বজনের ভাগ্য অজানা থাকে? পিলখানায় নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের কাছে সমঝোতার মূল্য কী, যদি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সেই বিপর্যয়ের প্রশ্নগুলোর উত্তর না মেলে? জুলাই গণঅভ্যুত্থানে স্বজন হারানো মানুষের কাছে সহাবস্থানের প্রতিশ্রুতিই বা কী অর্থ বহন করবে, যদি হত্যার বিচার অনিশ্চিত থাকে?
সরকার যদি সত্যিই কোনো গোপন বা প্রকাশ্য পুনর্বাসন-সমঝোতার পথে না থাকে, তবে তার সবচেয়ে কার্যকর প্রমাণ হবে স্বচ্ছ নীতি, স্বাধীন বিচার, প্রকাশ্য ও দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য, দৃশ্যমান জবাবদিহি। অতীতের অপরাধের বিচার এবং ভবিষ্যতের গণতন্ত্র—এই দুইয়ের কোনো একটিকে অন্যটির বিনিময়ে বিসর্জন দেওয়া যাবে না।
সম্প্রতি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল, জামায়াত-বিএনপির পারস্পরিক অভিযোগ এবং ইতিহাসের বিতর্ক—সবকিছুই বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দুর্নীতি, অপশাসন ও জুলাইয়ের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত না করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের পথ তৈরি হলে তা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক হবে। একই সঙ্গে জামায়াত-এনসিপির দ্বিচারিতা এবং বিএনপির রাজনৈতিক উদাসীনতা নিষিদ্ধ শক্তিকে ফিরে আসার সুযোগ করে দিতে পারে।
অতএব, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নয়—আইনের শাসন, ঐতিহাসিক সত্য, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও জবাবদিহিই হোক রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্বশীল, প্রকৃত জাতীয়তাবাদ ও গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারের পরিচয় দেবেন—এটাই সকলের কাম্য। (সমাপ্ত)
👉 👉 [এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পোস্টগুলো ফেসবুক এবং ইমেইল থেকে সংগৃহীত। উক্ত লেখার বক্তব্য ও দায়-দায়িত্ব লেখকের একান্ত নিজস্ব। তাই প্রকাশিত লেখার বিষয়ে কোনো মতামতের জন্য এডমিন দায়ী নয়।]
No comments